kalerkantho

ক্ষমতাধর-প্রভাবশালীদের দখলে ২২ খাল

সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধ খুলনা মহানগর

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধ খুলনা মহানগর

খুলনা মহানগরীর স্যার ইকবাল রোডের বাইতিপাড়া এলাকা দিয়ে বয়ে গেছে পানি নিষ্কাশনের অনেক বড় একটি নর্দমা। দেখতে একেবারে খালের মতো হলেও সামান্য বৃষ্টিতেই এখানে পানি জমে। আশপাশের সিটি কলেজের মোড়, রয়েলের মোড়, পঞ্চবীথি বা শান্তিধামের মোড় প্রভৃতি এলাকায়ও পানি জমে। আর এই পানি এলাকার পুরনো বাড়িগুলোর নিচতলায় প্রবেশ করে। এ তো গেল শহরের মধ্যাঞ্চলের অবস্থা। রূপসা নদীর কাছাকাছি সাউথ সেন্ট্রাল রোড, টুটপাড়ার দক্ষিণাংশ, শহরের নিচু এলাকায়ও পানি জমে। জোয়ারের সময় বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়। পানি সরে যাওয়ার জন্যে নদীতে ভাটা আসার অপেক্ষায় থাকতে হয়। রূপসা নদীর সঙ্গে বড় যে নিষ্কাশন নালা যুক্ত হয়েছে, বর্ষা মৌসুমে এবং অমাবস্যা-পূর্ণিমায় জোয়ারের সময় ওই নালার মুখে পানি চলে আসে। ফলে পানি নদীতে নামার পরিবর্তে উল্টো নগরীর নালাগুলোয় চলে আসে। 

ভৈরব-রূপসার কূলে অবস্থিত খুলনা মহানগরীর নিষ্কাশনব্যবস্থা একসময় বেশ ভালো ছিল। নিষ্কাশনের জন্য ছিল বড় বড় নালা। শহরের পূর্ব পারে যেমন ভৈরব-রূপসা নদী; তেমনি পশ্চিম পারে ময়ূর নদী। নিষ্কাশন নালাগুলো নদীতে যুক্ত থাকায় অতিসহজেই শহর থেকে পানি নেমে যেত। আশির দশকের পর থেকে নগরীতে বাড়িঘর নির্মাণ বেড়ে যাওয়া এবং নিয়ম অনুসরণ না করার ফলে ঠিকমতো নিষ্কাশন নালা তৈরি হচ্ছে না। এর বিপরীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলে নালাগুলো খুব দ্রুত ভরাট করে ফেলা হয়েছে এবং ২২টি খাল ক্ষমতাধর-প্রভাবশালীরা দখল করে পানি নিষ্কাশনের পথগুলো (আউটলেট) অকার্যকর করে রেখেছে। দখল হওয়া খালগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। ফলে সামান্য বর্ষণেই নগরীর বেশির ভাগ এলাকা ডুবে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিষয়টি দিন দিন প্রকট হওয়ায় সিটি নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হিসেবে দেখা দেয়।

গত নির্বাচনে জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়টি মেয়র পদপ্রার্থীদের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল। আওয়ামী লীগ নেতা, মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকও জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর ময়ূর নদীর দখলদার উচ্ছেদে পদক্ষেপ নেন, কিন্তু মালিকানা স্বত্বের বিষয়টি সামনে চলে আসায় নদীর সীমানা চিহ্নিতকরণে তিনটি কারিগরি কমিটি গঠিত হয়েছে। ওই কমিটি চার মাসের চেষ্টায় জমির সীমানা ও দখলদার চিহ্নিত করেছে।   

নগরবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছয় বছর আগে নগরীর প্রধান সমস্যা ছিল জলাবদ্ধতা। আজও আছে। ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরো প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে একটু বৃষ্টিতে ডুবে যায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও দোকানপাট। কিছু এলাকার ভবনগুলোর নিচতলায় বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে। নগরীর নিম্নাঞ্চলের আবাসিক এলাকাগুলোতে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে দুর্ভোগের শিকার হয় নগরবাসী। বর্তমানে নগরীতে খাল-নালা-নর্দমার পরিমাণ প্রায় বারো শ কিলোমিটার। ময়ূর ও হাতিয়া নদী খননসহ অসংখ্য নর্দমা সংস্কার করা হয়েছে বলে কেসিসির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতিও হয়নি। খাল ও নর্দমাগুলো ময়লা-কাদামাটিতে পূর্ণ হয়ে গেছে। 

সামান্য বৃষ্টিতে নগরীর পিটিআই মোড়, রয়েল মোড়, শান্তিধাম মোড়, শামসুর রহমান রোড, সিমেট্রি রোড, টুটপাড়া, আহসান আহমেদ রোড, নতুন বাজার, স্যার ইকবাল রোড, কেডিএ এভিনিউ রোড, জোড়া গেট, খালিশপুর বাস্তুহারা কলোনি, বয়রা এলাকা, মুজগুন্নী, নেভি স্কুলের সামনের ভাগ, হাউজিং বাজার, নতুন কলোনি, দৌলতপুর, খালিশপুরসহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অলিগলি পানিতে তলিয়ে যায়। নিম্নাঞ্চলের শিক্ষা ও সরকারি প্রতিষ্ঠান, হোস্টেল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতানের আশপাশ বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়। পুরনো ভবনগুলোর নিচতলায় পানি প্রবেশ ঠেকাতে দরজার সামনে ইটের গাঁথুনি দেওয়া হয়েছে আর সামর্থ্যবানরা নিচের তলা উঁচু করেছে। এ ছাড়া নগরীর নিম্নাঞ্চলের আবাসিক এলাকাগুলোতে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়ছে মানুষ। ফলে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে নগরবাসী।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আউটলেট হিসেবে ব্যবহৃত নগরীর ২২টি খাল দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করা গেলে জলাবদ্ধতায় এত খারাপ অবস্থা তৈরি হতো না। এখন প্রয়োজন ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা।’

খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। ওই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা দূরীভূত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর ময়ূর নদীর দখলদার অবিলম্বে উচ্ছেদ করা হবে।’ তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘নগরীর ড্রেনগুলো পরিষ্কার রাখার জন্য নাগরিকদেরও দায়িত্ব পালন করতে হবে, তাদেরও সচেতন হবে। ময়লা-আবর্জনা, বোতল এসব ড্রেনে ফেলা যাবে না, নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। তাহলে আমরা সবাই ভালো থাকতে পারব।’

মন্তব্য