kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

নাজুক রেলপথে বৃষ্টি বন্যায় ঝুঁকি বেড়েছে

♦ ৪০২ সেতু ঝুঁকিতে ♦ ঝুঁকিতে ঢাকা, জয়দেবপুর, নেত্রকোনা, সৈয়দপুর, হবিগঞ্জ, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলার রেলপথ ♦ জরুরি সংস্কারে ১৫ সদস্যের টাস্কফোর্স

পার্থ সারথি দাস   

১৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নাজুক রেলপথে বৃষ্টি বন্যায় ঝুঁকি বেড়েছে

কোথাও দেবে গেছে রেল সেতু। বাঁশ দিয়ে স্লিপার আটকে রাখার ঘটনাও প্রকাশ্যে এসেছে। রেলপাত দুর্বল, স্লিপারের অবস্থা সঙ্গিন, ফিশপ্লেট নেই কোথাও কোথাও। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই চলছে রেল। দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ। সাম্প্রতিক বৃষ্টি-বন্যা পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করেছে, ঝুঁকি আরো বেড়েছে। বিপদ এড়াতে বিভিন্ন রেলপথে কম গতিতে ট্রেন চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে চালকদের। রেলপথের উন্নয়নে সোয়া লাখ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও পুরনো রেলপথের এ অবস্থা ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে। যা কাজ হচ্ছে তা-ও বিশেষ তহবিল না থাকায় এবং সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিতে সম্পন্ন হচ্ছে না।

বাংলাদেশ রেলওয়ের হিসাবে, অপেক্ষাকৃত বড় আকারের ৪০২ রেল সেতুই পুরনো, ৭৫ শতাংশ রেলপথের মান যাচ্ছেতাই। খোদ ঢাকার বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর রেলপথে স্থানে স্থানে পাথর উঠে গেছে। ফিশপ্লেট নেই স্থানে স্থানে। ১৮ কিলোমিটার এ রেলপথে ট্রেন নিচ্ছে আধাঘণ্টা বা তার চেয়েও বেশি সময়। বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, প্রতি প্রায় আড়াই কিলোমিটার রেলপথ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে ‘গ্যাং’ বাহিনী কাজ করে থাকে।

রেলপথে হেঁটে নাটবল্টু, ক্লিপ, ফিশপ্লেট ঠিকঠাক আছে কি না পরীক্ষা করে এ বাহিনীর কর্মীরা। পাথর ঠিকমতো আছে কি না তা দেখেন ওয়েম্যানরা। তবে ওয়েম্যানরা মাঠে থাকে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরাও গা-ছাড়া। ফলে মাঠের সঠিক চিত্র ওপরের কর্মকর্তারা ঠিকমতো জানতেও পারেন না বা জানার চেষ্টাও নেই।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় গত ২৩ জুন রাতে সিলেট থেকে ঢাকামুখী উপবন এক্সপ্রেস ট্রেন দুর্ঘটনা তদন্ত করে আঞ্চলিক কমিটি প্রকৌশলীদের গাফিলতি ও রেলপথের দুরবস্থার প্রমাণ পেয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলেছে, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় রেলপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। রেলপথের মৌলভীবাজার-কুলাউড়া অংশের উপসহকারী প্রকৌশলী জুলহাস ও গ্যাং ইনচার্জ সাইফুল আলমকে এ জন্য দায়ী করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে স্থায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

একইভাবে গত বুধবার রাজশাহীর চারঘাটে তেলবাহী ট্রেনের আটটি বগি লাইন থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় রেলকর্মীদের গাফিলতিকেই দায়ী করা হচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চল রেল সূত্রে জানা গেছে, পুরনো স্লিপার পরিবর্তন করে রেলপথে পাথর দেওয়া হচ্ছিল। সংস্কারকাজ চলাকালে স্লিপারের সঙ্গে লাইন আটকানো হয় পিন (ডগ স্পাইক) দিয়ে। তদন্তে দেখা যায়, সেখানকার লাইনে অনেক পিনই লাগানো হয়নি। পাথর দেওয়ায় সেগুলো ঢেকে যায় বলে দেখা যাচ্ছিল না। তেলবাহী ৩১টি বগি নিয়ে ট্রেনটি চলছিল। পিন খোলা থাকায় অতিরিক্ত চাপে রেলপথ সরে যাওয়ায় ওই দুর্ঘটনা ঘটে। সংস্কারকাজে নিয়োজিত সহকারী প্রকৌশলী আবদুর রশিদকে ওই ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রেলপথের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকৌশলীদের গাফিলতিতে এভাবে রেলপথে ঝুঁকি ও দুর্ঘটনা বাড়ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যানুসারে, ২০১৪ থেকে চলতি বছর জুন পর্যন্ত ৮৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটে রেলপথে। এতে প্রাণ হারায় ১১১ জন। একই সময় ৬৩৯টি ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটে। এ বছর একের পর এক লাইনচ্যুতি ঘটছে।

বন্যাকবলিত জেলায় দিন-রাত পাহারা : দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় রেলসচিব মোফাজ্জেল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন বন্যাকবলিত বিভিন্ন জেলার রেলপথে দিনের বেলা হেঁটে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা। রাতেও পেট্রলিং চলছে। পুরনো রেলপথে বছরে ৫ শতাংশ ব্যালাস্ট (পাথর) ফেলার কথা। তা করা হয়নি। আমাদের প্রায় ৪০০ রেল সেতুর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। পূর্ব ও পশ্চিম রেলে তা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর এ প্রক্রিয়া আরো জোরালো হয়েছে। তিনি জানান, রেলপথ ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণে আলাদা বাজেট রাখার চেষ্টা চলছে। আমরা পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল রেলের সংশ্লিষ্টদের দুটো উন্নয়ন প্রকল্প ছক-ডিপিপি তৈরি করতে বলেছি। এখন রাজস্ব বাজেট থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন, জ্বালানিসহ পথ ও সেতু সংস্কারের অর্থের সংস্থান করা হচ্ছে। তবে সওজ অধিদপ্তরের মতো আলাদা বাজেট রেখে ঠিকাদার নিয়োগ করে আমরা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করব। কারণ রেলে এখনো প্রয়োজনীয় জনবল নেই।

১৫ সদস্যের টাস্কফোর্স : বাংলাদেশ রেলওয়ের নতুন মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান জানান, রেলের ঝুঁকিপূর্ণ পথ, সেতু ও অন্যান্য স্থাপনার অবস্থা খতিয়ে দেখতে গত বৃহস্পতিবার ১৫ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। গত শনিবার থেকে এই টাস্কফোর্স কাজ শুরু করেছে। আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত স্থাপনার অবস্থা পরীক্ষা ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এই টাস্কফোর্স কাজ করবে। এরই মধ্যে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাস্থল মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও রাজশাহীতে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে। টাস্কফোর্সে রেলওয়ের প্রকৌশল, সংকেতসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে।

এদিকে, বাংলাদেশ রেলওয়ের জরিপে দেখা গেছে, তিন হাজার ১৪৩টি ছোট-বড় সেতুর মধ্যে অপেক্ষাকৃত বড় আকারের ৪০২টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ। স্বাভাবিকভাবে রেল সেতুর ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫-৭০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন পরিচালনা করা যায়। তবে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুতে ট্রেন চলছে ৭ থেকে ১৫ কিলোমিটার গতিতে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জয়দেবপুরে রেলস্টেশনের ৩৭৭/৯ পিলারের কাছে রাজশাহী রুটে সবগুলো কাঠের স্লিপারের অবস্থা নাজুক। কোথাও স্লিপারের জয়েন্ট প্রায় খুলে গেছে. কোথাও দুটো ফিশপ্লেটের মধ্যস্থলের সংযোগ ঢিলা হয়ে গেছে। ট্রেন চললে কিছুটা হেলে যায়, ফিশপ্লেট দুটো তিন ইঞ্চি পর্যন্ত দেবে যায়। পার্বতীপুর-সৈয়দপুর রেলপথে তেল ডিপোর কাছে অপরিকল্পিত পুকুর খননে রেলপথ হুমকিতে পড়েছে। ঢাকা-সিলেট রেলপথের হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পশ্চিমে ঝুঁকিপূর্ণ রেল সেতুর ৪০টি স্লিপারের ১৫টি নষ্ট হয়ে গেছে। ৪০টি স্লিপারের উভয় পাশে রেল ট্র্যাকের সঙ্গে সঙ্গে ৮০টির মধ্যে নাট সংযুক্ত আছে ৩৫টিতে। বাঁশ বা কাঠ দিয়ে স্লিপারগুলোকে অস্থায়ীভাবে আটকে রাখা হয়েছে। সৈয়দপুর গোলাহাট কবরস্থান হয়ে বধ্যভূমি রেলপথে স্থানে স্থানে ক্লিপ নেই। ঢাকা-মোহনগঞ্জ রেলপথে ঠাকুরকোনা ও মোহনগঞ্জ সেতু চরম ঝুঁকিতে আছে। ঠাকুরকোনা রেলসেতু স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হলে মেরামত করা হয়েছিল। তবে ৪০ বছর ধরে চলছে নাজুক সেতুটি। ভারি বর্ষণে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা পুংলী রেল সেতুর উত্তর পাশের সংযোগ দেবে গেছে। গত শুক্রবার সকাল থেকে ওই অংশ মেরামতের কাজ শুরু করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, দুর্ঘটনা এড়াতে সেতুটি দিয়ে ১০ কিলোমিটার গতিবেগে ট্রেন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা