kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

সম্ভাবনার এলপিজিতে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সম্ভাবনার এলপিজিতে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ

কালের কণ্ঠ-এলপিজি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত ‘বাংলাদেশে এলপিজির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

এখন থেকে পাঁচ বছর আগেও দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা ছিল মাত্র ৮০ হাজার টন। এ বছর সেটি বেড়ে আট লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এলপি গ্যাসের চাহিদা বেড়ে ২০ লাখ টনে উন্নীত হবে। কালের কণ্ঠ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এলপিজি বিশেষজ্ঞরা এমন পূর্বাভাস তুলে ধরেছেন।

গতকাল শনিবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় কালের কণ্ঠ মিলনায়তনে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে এখন যত ধরনের জনসম্পৃক্ত খাত আছে, তার অন্যতম এলপি গ্যাস। অবশ্য সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে এলপিজির ওপর এক ধরনের ভীতি তৈরি হচ্ছে, যদিও দুর্ঘটনার জন্য সিলিন্ডারের কোনো ভূমিকাই নেই। তাই সম্ভাবনার এলপি গ্যাস মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হলে অবশ্যই গ্রাহকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার রীতি ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। আর এই দায়িত্ব নিতে হবে এলপিজি বিতরণকারী কম্পানিগুলোকেই।

কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলনের সঞ্চালনায় বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল। বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য নূরুল ইসলাম তালুকদার, এলপিজি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আজম জে চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন, ইন্ডিয়ান অয়েল কম্পানি লিমিটেডের কান্ট্রি ম্যানেজার তোফাজ্জল হক প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (সেলস) প্রকৌশলী জাকারিয়া জালাল।

মূল প্রবন্ধে জাকারিয়া জালাল উল্লেখ করেন, এলপিজি দুর্ঘটনা অনুসন্ধানে বিস্ফোরক অধিদপ্তর যতগুলো প্রতিবেদন তৈরি করেছে তাতে দেখা গেছে, এলপিজির কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। মানুষের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে এলপিজিতে ৫ শতাংশ অগ্রিম কর এবং ৫ শতাংশ মূসক ধরা হয়েছে। এর ফলে এলপিজির দাম পড়ছে অনেক বেশি।

আজম জে চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে এলপিজি ব্যবহার উত্তরোত্তর বাড়ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এলপিজিতে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে গণহারে। এটা দেওয়া দোষের কিছু নয়। তবে বাজারের সক্ষমতা আছে কি না, তা দেখতে হবে। যাঁরা উদ্যোক্তা আছেন, তাঁদের নিরাপত্তা আছে কি না, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ব্যবসার পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এসব দিক বিবেচনা না করে লাইসেন্স দেওয়ায় দেখা যাচ্ছে রাস্তাঘাটে বিভিন্ন জায়গায় পাঁচ কোটি থেকে সাত কোটি টাকা দিয়ে বাল্ক এলপিজি কিনে নিয়ে ফিলিং করা হচ্ছে। এগুলো রাস্তাঘাটে বিক্রি হচ্ছে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হচ্ছে। আজম জে চৌধুরী বলেন, কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে বলা হয় সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে। কিন্তু বলা হয় না কোনটা বিস্ফোরণ হয়েছে। এটা কি এলপিজি, না প্রাকৃতিক গ্যাস।

টোটাল বাংলাদেশের হেড অব মার্কেটিং মুজিবুর রহমানও একই রকম কথা বলেন। তিনি বলেন, যখন কোনো গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনা ঘটে তখন এটা এলপিজি সিলিন্ডার, নাকি সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডার তা বলা হয় না। এতে মানুষের মনে ভয় ঢুকে যায়। এটা নির্দিষ্ট করে বলতে হবে। মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশন, নিউজ পেপার অ্যাসোসিয়েশন ও এলপিজি অ্যাসোসিয়েশন মিলে কাজ করতে পারে। তিনি বলেন, এলপিজি গ্যাসের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে না, বরং হোস পাইপের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ বিস্ফোরক বিভাগ এই হোস পাইপের মান নির্ধারণ করে দিচ্ছে না। তাই অনেক ক্ষেত্রে মানহীন বা কম মানের হোস পাইপ ব্যবহার করা হয়।

বুয়েটের ডিপার্টমেন্ট অব কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, গ্রাহকের অসচেতনতা থাকলে সমস্যা হয়, দুর্ঘটনা ঘটে। এর জন্য ট্রেনিং করাতে হবে। তা ছাড়া দুর্ঘটনা রোধে মানসম্মত হোস পাইপের দিকে নজর দিতে হবে। এলপিজি গ্যাসের দুর্ঘটনা রোধ করতে পারে ‘গ্যাস ডিটেক্টর’। এর দাম অনেক কম, এক হাজার টাকা মাত্র। এটা ব্যবহার করা উচিত। আর দুর্ঘটনা ঘটলেই বলা হয়, সিলিন্ডার ব্লাস্ট হয়েছে। তখন এটা এলপিজির ঘাড়ে এসে পড়ে। এতে ভুল বার্তা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এখন এলপিজিতে অনেক বিনিয়োগকারী। এখানে কে বাঁচবে আর কে মরবে, তা জানি না।’

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এনার্জি অডিট কো-অর্ডিনেটর প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গ্রামে গ্রামে পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাস দেওয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে এলপিজি প্রধান ভরসা হতে পারে। তিনি আরো বলেন, ‘এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হলেই দায় আসে কম্পানির ওপর। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পেছনে কম্পানির কোনো ত্রুটি নেই। গ্রাহকের অসচেতনতার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে। কিভাবে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়, তা জানতে হবে। রান্নাঘরের যে জায়গায় সিলিন্ডার রাখা হয়, সেখানে হতে হবে উন্নত পরিবেশ। আমাদের দেশে বেশির ভাগ রান্নাঘরে ততটা উন্নত পরিবেশ নেই। এ কারণে রান্নাঘরে সিলিন্ডার দুর্ঘটনা ঘটে।’ তিনি বলেন, যারা এলপিজি ব্যবহার করে, তাদের হাতে হাতে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর এই দায়িত্ব নিতে হবে কম্পানিগুলোকেই।

ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অরুণ কর্মকার বলেন, পাঁচ বছর আগে ৮০ হাজার টন চাহিদা ছিল এলপি গ্যাসের। সেটি এখন বেড়ে আট লাখে উন্নীত হয়েছে। আগামী পাঁচ বছর পর এলপি গ্যাসের চাহিদা বেড়ে ২০ লাখে উন্নীত হবে। কারণ, দেশে সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ সবদিকে পরিবর্তন হচ্ছে। মানুষ রান্নার কাজে চুলার পরিবর্তে এলপি গ্যাস ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। তাঁর মতে, ‘পাইপলাইনের সঙ্গে এলপি গ্যাসের তুলনা করা ঠিক হবে না। সবাইকে প্রাকৃতিক গ্যাস দেওয়া যাবে না। গ্যাসের ওপর যদি আমরা ভেসেও থাকি তাতেও সবাইকে প্রাকৃতিক গ্যাস দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, এর অর্থনৈতিক কার্যকারিতা কম। শিল্প ও সারে প্রাকৃতিক গ্যাস দিলে সেটা অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর।’ অবশ্য প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে এলপি গ্যাসের দামের যে বৈষম্য সেটি কমিয়ে আনার তাগিদ দেন তিনি।

লাফস গ্যাস-বাংলাদেশের চিফ অপারেটিং অফিসার রণজিৎ জয়াবর্ধনা বলেন, ‘এলপিজি গ্যাসের মার্কেটে এরই মধ্যে অনেক প্লেয়ার চলে এসেছে। ছোট মার্কেটের জন্য এটি অনেক বেশি। আর এ কারণে আমরা একে অন্যের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা করছি। এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়ার জন্য পরিবহনব্যবস্থা একটা বড় সমস্যা। তা ছাড়া রিটেইলারদের ভূমিকাও একটা বড় ব্যাপার। আর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হোস পাইপও সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. নূরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘এলপিজির নিরাপত্তা সমস্যার ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে গ্রাহকদের দোষ দিলে হবে না। এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার গ্রামের মানুষও ব্যবহার করে। তারা অনেকেই কম জানাশোনা মানুষ। তাই এটার ব্যবহার শেখানোর দায়িত্ব আপনাদের, এলপিজি ব্যবসায়ীদের। এলপিজি গ্যাসের জন্য কেমন ঘর লাগবে, জানালা থাকতে হবে কি না, তা আপনাদেরকেই বলতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘গণসচেতনতা, গণজাগরণের বিকল্প নেই। আপনারা ব্যবসায়ীরা এটার ব্যবস্থা নেন। প্রয়োজনে জনপ্রতিনিধি, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের নিয়ে বসেন। আপনারা লাভ কম করেন, দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখেন, যাতে সবাই এটা ব্যবহার করতে পারে।’

বাংলাদেশ আদানি গ্রুপের গ্রুপ প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড কান্ট্রি হেড সৈয়দ ইউসুফ শাহরিয়ার মনে করেন, ‘বাংলাদেশে এলপিজির দাম কমানোর কিছু সুযোগ আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পরিবহন খরচ। পরিবহনটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কোন জায়গা থেকে এলপিজি আনবেন। এ ছাড়া জাহাজের আকার কত বড়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এলপিজির দাম কমাতে আপনি একটি বড় জাহাজ কতটা কাছে নিয়ে আসতে পারবেন। আপনি যদি পাঁচ হাজার কিংবা ১০ হাজার টনের একটি ভ্যাসেল পাঁচ হাজার মাইল বহন করেন, সেখানে প্রতি ইউনিটে যত টাকা খরচ হবে, ৫০ হাজার কিংবা এক লাখ টন বহন করলে ইউনিট খরচ কমে আসবে।’

এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেন বলেন, এলপিজি খাতটিকে এককভাবে রাষ্ট্রের কে নিয়ন্ত্রণ করবে, তা ঠিক করা যায়নি। বিপিসি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কারণ, সংস্থাটি নিজেই এলপি গ্যাসের ব্যবসা করে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) করা যেত। কিন্তু এলপি গ্যাস নীতিমালায় মন্ত্রণালয়কেও যোগ করা হয়েছে। এতে করে হয়রানি আরো বেড়েছে। এখন লাইসেন্স নবায়ন করা, এলপিজি আমদানির তথ্য দেওয়াসহ নানা কাজের জন্য কম্পানিগুলোকে অনেক হয়রানি হতে হয়। তিনি আরো বলেন, এলপিজির ক্ষেত্রে বিইআরসি কিছুই করে না, তার পরও তার কাছ থেকে ফি দিয়ে অনুমতি নিতে হয়। আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের ফায়ার সার্ভিসের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই ফায়ার সার্ভিস থেকে প্রতিবেদনে বলা হয়, সিলিন্ডার দুর্ঘটনা।’

ইন্ডিয়ান অয়েল কম্পানি লিমিটেডের কান্ট্রি ম্যানেজার তোফাজ্জল হক বলেন, এলপিজির দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হোস পাইপ। তবে দুর্ঘটনা যে কারণেই হোক না কেন, গ্রাহকের সুরক্ষা কম্পানিকেই করতে হবে।

বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাসুদ খান বলেন, ‘বিস্ফোরক দপ্তরের পক্ষে এই খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে আমার মনে হয় না। নিরাপত্তার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ এর ব্যবহারকারীর বেশির ভাগই শহরাঞ্চলের বাইরের। ফলে এই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এ খাতের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তাই এলপিজি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে। জনসচেতনতা গ্রামেগঞ্জে পৌঁছে দিতে হবে। বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ভোক্তার অবহেলার জন্য হয়।’

বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার রুহুল আমিন বলেন, ‘আমরা রেস্তোরাঁ ও শিল্প খাতের ব্যবসা করি। দুই জায়গাতেই এলপিজির ব্যবহার হয়।  একসময় অনেক টাকা খরচ করেও রেস্টুরেন্ট চালাতে পারতাম না গ্যাস লাইনের কারণে। এখন এলপিজির কারণে এ অসুবিধা নেই। যখনই রেস্টুরেন্ট খুলতে চাই এখন পারি। শিল্প খাতেও আমরা এলপিজি ব্যবহার করছি। নিরাপত্তা, সচেতনতা ও প্রচার—এই তিনটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া গেলে এলপিজি নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক অনেকটা কেটে যাবে।’

মন্তব্য