kalerkantho

৯ মাসেও চালু হয়নি যমুনা সার কারখানা

মোস্তফা মনজু, জামালপুর   

২৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



৯ মাসেও চালু হয়নি যমুনা সার কারখানা

অ্যামোনিয়া প্লান্টের কনভার্টার হিটারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া দানাদার ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী দেশের বৃহত্তম রাসায়নিক শিল্প প্রতিষ্ঠান যমুনা সার কারখানা গত ৯ মাসেও চালু হয়নি। এ অবস্থায় কারখানা আওতাভুক্ত ১৯ জেলায় বিপণনের জন্য আমদানি করা বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সার খোলা আকাশের নিচে জমাট বেঁধে ও রোদ-বৃষ্টিতে গলে নষ্ট হচ্ছে। একে তো কারখানা বন্ধ, অন্যদিকে আমদানি করা সার এভাবে নষ্ট হওয়ায় বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। আবার এসব সার নিতে কৃষকদের অনীহার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিসিআইসির ডিলাররা।

কারখানা সূত্রে জানা গেছে, জামালপুরের সরিষাবাড়ীর তারাকান্দিতে দানাদার ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী যমুনা সার কারখানায় ২৭ নভেম্বর ভোর পৌনে ৬টার দিকে অ্যামোনিয়া প্লান্টের কনভার্টার হিটারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে অ্যামোনিয়া প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রধান যন্ত্র প্রি-হিটার ও এর সব কেবল এবং আশপাশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দামি যন্ত্রাংশ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় কারখানার উৎপাদন। দুর্ঘটনায় ২০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়। প্রায় ৯ মাস হয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে কারখানার ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিটটি মেরামত হয়নি।

কারখানাটি শুরুর দিকে দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা এক হাজার ৭০০ টন থাকলেও পুরনো হয়ে আসায় তা এক হাজার ৬০০ টনে নেমে এসেছে। সেই হিসাবে গত ৯ মাসে এখানে মোট উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে চার লাখ ৩২ হাজার টন। ডিলারদের কাছে প্রতিটন ১৪ হাজার টাকা মূল্যে বিক্রির হিসাবে কারখানা বন্ধ থাকার এই সময়ে মোট উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে ৬০৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর চাহিদার জোগান দিতে এই সময়কালে বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে তিন লাখ ৫৫ হাজার আট টন ইউরিয়া সার। তবে কী দরে আমদানি করা হয়েছে সে-সংক্রান্ত তথ্য দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রাজি হয়নি।

এই প্রতিবেদক গত সোমবার সরেজমিনে কারখানার গুদাম এলাকা পরিদর্শন করতে চাইলে কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয়নি। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কারখানা বন্ধ থাকায় বিদেশ থেকে আমদানি করা ইউরিয়া সার আওতাভুক্ত ১৯টি জেলায় ডিলারদের মাঝে বিপণন করা হচ্ছে। এর মধ্যে জামালপুর, শেরপুর ও টাঙ্গাইল এবং উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলায় এই কারখানা থেকে ইউরিয়া সার সরবরাহ হয়ে থাকে। যমুনা সার কারখানা গত বছরের নভেম্বর মাসে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে কারখানার ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার বাল্ক স্টোরে মাত্র ১২৭ টন গুটি ইউরিয়া মজুদ রয়েছে। এই বাল্ক স্টোরে আবার সারের বস্তা রাখার নিয়ম নেই।

বস্তাভর্তি ইউরিয়া সার মজুদ রাখার দুটি গুদামে মাত্র ১২ হাজার টন সার মজুদ রাখা যায়। কারখানায় বর্তমানে ৫৬ কোটি ১১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা মূল্যের আমদানি করা ৪০ হাজার ৮১ টন ইউরিয়া সার মজুদ রয়েছে। বাকি ২৮ হাজার ৮১ টন সার গুদামের বাইরে খোলা আকাশের নিচে রাস্তায়, মূল কারখানার ভেতরে এবং প্রশাসনিক ভবনের সামনের রাস্তায় রাখা হয়েছে। বস্তাগুলো ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হলেও রোদ আর বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে। আবার টানা তিন মাসের অধিক সময় ধরে মজুদ রাখায় বেশির ভাগ বস্তায় সার জমাট বেঁধে গেছে।

বিসিআইসির সার ডিলার ওসমান গনী অভিযোগ করে বলেন, ‘আমদানীকৃত ইউরিয়া সারের বহু বস্তার সার জমাট বেঁধে গেছে। বরাদ্দের সার উত্তোলনের সময় কারখানা কর্তৃপক্ষ এগুলোই নিতে বাধ্য করছে ডিলারদের। এই সার কৃষকরা নিতে চাচ্ছে না। ফলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

একই অভিযোগ করেন জামালপুর জেলা ট্রাক ও ট্যাংকলরি মালিক সমিতি তারাকান্দি শাখার সভাপতি আশরাফুল আলম মানিক। তিনি বলেন, ‘আমদানীকৃত এসব ইউরিয়া সারের মান অত্যন্ত খারাপ। ট্রাকে তোলার সময় অনেক বস্তা থেকে পানি ঝরে। সেগুলো পরিবর্তন করে দিতে বললেও কর্তৃপক্ষ অনীহা প্রকাশ করে। এই সার ডিলারদের গুদামে নিলে তারা নিতে চায় না। কারখানা চালু থাকার সময়ে প্রায় ৪৫০টি ট্রাক সব সময় এখানে থাকে। বেশির ভাগ ট্রাকচালক ও শ্রমিক বেকার বসে আছে।’

যমুনা সার কারখানার ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) ওয়ায়েছুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গুদামে ও বাইরে খোলা স্থানে এক সারিতে ওপর থেকে নিচে ৩২টি করে বস্তা রাখা হয়। টানা কয়েক মাস ওভাবে রাখা হলে নিচের দিকে কিছু বস্তা নষ্ট হতে পারে। সার জমাট বেঁধে গেলেও এর গুণগত মান নষ্ট হয় না। ডিলার বা ট্রাক মালিকদের ঢালাও অভিযোগ সঠিক নয়। বস্তা নিয়ে অভিযোগ করলে সেগুলো সরিয়ে রাখা হয়।’ তিনি জানান, চলতি আমন মৌসুমের মিনি পিক সিজনের জন্য কারখানার আওতাভুক্ত ১৯ জেলার জন্য চাহিদার ১৪ হাজার ১৮৮ টন ইউরিয়া সার মজুদ রয়েছে। ফলে কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়া সার নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।

কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক খান জাভেদ আনোয়ার বলেন, ‘গুদামে স্থান সংকুলান না হওয়ায় বাইরে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে ত্রিপল ও পলিথিন দিয়ে ঢেকে সার মজুদ করা হয়। সেগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই।’

কারখানা চালু করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই সার কারখানার প্রতিষ্ঠাকালীন মূল কম্পানি জাপানের মিত্সুবিশির সঙ্গে বিসিআইসির চুক্তি ও যোগাযোগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ওই কম্পানির একটি টিম কিছুদিন আগে কারখানা পরিদর্শন করে গেছে। আশা করা হচ্ছে আগামী নভেম্বর মাসে ওই কম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিট মেরামতের কাজ শুরু হবে এবং ডিসেম্বরেই কারখানা উৎপাদনে যাবে।’

 

 

মন্তব্য