kalerkantho

ধর্ষণের পর গলায় রশি পেঁচিয়ে শিশু সায়মাকে হত্যা

ধর্ষণকারীর পরিচয় আড়াল করতেই শিশুটিকে হত্যা করা হয় : পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ধর্ষণের পর গলায় রশি পেঁচিয়ে শিশু সায়মাকে হত্যা

ফুটফুটে শিশুসন্তানটি আর নেই। তার ওপর যে বর্বরতা চালানো হয়েছে তা কিভাবে সইবেন মা। ইনসেটে ধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধে হত্যার শিকার সায়মা। গতকাল দুপুরে ওয়ারীতে সায়মাদের বাড়িতে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুটিকে এই বর্বর কায়দায় হত্যা করল কারা, আমরা তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। পুরান ঢাকার ওয়ারীর বনগ্রামে আটতলা ভবনের ওপর বাড়তি অংশের ফাঁকা ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা শিশু সামিয়া আফরিন সায়মা (৭) হত্যার বিচার চেয়ে এভাবে বিক্ষোভ করছিল এলাকাবাসী। গতকাল শনিবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত ওই এলাকায় অবস্থান করলে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য চোখে পড়ে। এ সময় শিশুটির লাশবাহী গাড়ি ভবনের সামনে রাখা ছিল। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ছয়জনকে আটক করা হলেও এখনো আসল হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

অন্যদিকে শিশুটিকে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ। গতকাল দুপুরে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে কালের কণ্ঠকে তিনি এ কথা জানান।

তিনি বলেন, ‘দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে শিশুটির মৃতদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। বাহ্যিকভাবে শিশুটির গলায় রশি দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তার ঠোঁটে কামড়ের চিহ্ন রয়েছে এবং যৌনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তা ছাড়া শিশুটির শরীরে ক্ষতচিহ্ন, মুখে রক্ত ও আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ ব্যাপারে আরো স্পষ্ট হতে ‘হাই ভ্যাজাইনাল সোয়াবের’ জন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সব নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। এসব প্রতিবেদন পাওয়া গেলে শিশুটির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরো নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নুরুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ঘটনায় নিহত শিশু সায়মার বাবা আব্দুস সালাম বাদী হয়ে ওয়ারী থানায় নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনে অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এ পর্যন্ত মামলায় ভবন মালিকসহ ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। ধর্ষকের পরিচয় আড়াল করতেই মূলত শিশুটিকে হত্যা করা হয়।’

আদালত সূত্র জানায়, এ মামলার এজাহার গতকালই আদালতে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা মহানগর হাকিম আতিকুর রহমান আগামী ২৪ জুলাই মামলার শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন।

গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে শিশু সায়মার খোঁজ পাচ্ছিল না তার পরিবার। রাত ৮টার দিকে নবনির্মিত ভবনটির ফাঁকা ফ্ল্যাটের ভেতর মৃত অবস্থায় দেখতে পায় পরিবারের সদস্যরা। খবর পেয়ে রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে। ওয়ারী সিলবারডেল স্কুলের নার্সারিতে পড়ত সায়মা। ওই ভবনের ছয়তলায় শিশুটি পরিবারের সঙ্গে থাকত। শিশুটির বাবা আব্দুস সালাম নবাবপুরের একজন ব্যবসায়ী। তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সায়মা সবার ছোট।

নিহত সায়মার বাবা আব্দুস সালাম কালের কণ্ঠকে জানান, মাগরিবের আজানের সময় তিনি নামাজ পড়তে মসজিদে যান। পরে মসজিদ থেকে ফেরার সময় সন্ধ্যার নাশতা কিনে বাসায় এসে দেখেন মেয়ে সায়মা নেই। পরে স্ত্রীসহ সায়মাকে খুঁজতে বের হন। এরপর আটতলা ভবনের ওপর বাড়তি অংশের রান্নাঘরে মেয়ের লাশ পান তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি তো কারো কোনো ক্ষতি করিনি। তবে কেন আমার এত বড় ক্ষতি করা হলো। আমি এর বিচার চাই।’

পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিশুটি শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার মাকে বলেছিল, সে ওপরে পাশের ফ্ল্যাটে খেলতে যাচ্ছে। এভাবে সে প্রতিদিনই ফ্ল্যাটের অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলা করতে যেত। ফ্ল্যাটের নিচেও যেত। সবাই শিশুটিকে আদর করত।’

গতকাল দুপুরে বাসার সামনে লাশের গাড়ির চারপাশে ছিল মানুষের ভিড়। সবার চোখ ভেজা। কেউ বলছিল, মানুষরূপী পশু ছাড়া এ কাজ কেউ করতে পারে না। যে-ই এ শিশুকে হত্যা করে থাকুক, তাকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

ভবনটির ছয়তলায় উঠে দেখা গেল, ‘শিশু সায়মার মা খাটের ওপর আহাজারি করছেন। ‘তোমরা আমার সোনামণি রে এনে দাও। আমার বুক খালি করেছে যারা, তাদের যেন শাস্তি হয়।’

স্থানীয় মুরব্বি বশির উদ্দিন বলেন, ‘যারা এই শিশুকে এভাবে হত্যা করতে পারে, তারা সমাজের আরো অনেক বড় ক্ষতি করতে পারে। এদের ধরে বিচারের আওতায় আনতে হবে।’

নির্মাণাধীন ভবনটির ছয়তলার ফ্ল্যাটটি কেনার পর তিন মাস ধরে সেখানে থাকছে শিশু সায়মার পরিবার। ভবনের নিচতলায় থাকে বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীর পরিবার। ঘটনায় নিরাপত্তাকর্মী ও তাঁর এক ছেলেকে সন্দেহের মধ্যে রেখেছে পুলিশ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা