kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৬ জুলাই ২০১৯। ১ শ্রাবণ ১৪২৬। ১২ জিলকদ ১৪৪০

ছাড়িয়ে নিচ্ছেন না আমদানিকারকরা

২০০০ কোটি টাকার পণ্য আড়াই বছর ধরে বন্দরে

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২৬ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



২০০০ কোটি টাকার পণ্য আড়াই বছর ধরে বন্দরে

আড়াই বছর আগে বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্যগুলো এনে চট্টগ্রাম বন্দরে ইয়ার্ডে রাখা হয়েছে। পরে পণ্যগুলো ছাড়ের জন্য চট্টগ্রাম কাস্টমসে অ্যাসেসমেন্টও করা হয়। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত রহস্যজনক কারণে এসব পণ্য বন্দর থেকে ছাড় করেননি আমদানিকারকরা। আটকে পড়া এই পণ্যের মূল্য দুই হাজার কোটি টাকা।

যথাসময়ে বন্দর থেকে পণ্যগুলো ছাড় না করায় সরকার বঞ্চিত হচ্ছে এক হাজার ১০০ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে। আর দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল পরিমাণ পণ্যবোঝাই কনটেইনার বন্দরের ইয়ার্ড আটকে রাখায় বন্দর পরিচালনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন কাস্টমস কমিশনার যোগদানের পর এসব পণ্যের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

কী কারণে এসব পণ্য বন্দর থেকে ছাড় হচ্ছে না জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পণ্য এনে বন্দরের ইয়ার্ডকে গুদাম বানানোর একটা বাজে অভ্যাস তৈরি হয়েছে কিছু আমদানিকারকের। বন্দরকে তারা ওয়্যারহাউস বানানোয় এসব কনটেইনার আটকে আছে। আর সন্দেহজনক কিছু চালান আমরা আটকে রেখেছি। সেই সংখ্যা খুবই কম।’

কাস্টমস কমিশনার বলেন, ‘গত আড়াই বছরে তিন হাজারের বেশি চালানের পণ্য বন্দরে আটকা আছে। এসব পণ্য অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছে, কিন্তু কাস্টমসে শুল্ক পরিশোধ করা হয়নি। এতে সরকার যেমন রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, বন্দরে কাজেরও সমস্যা হচ্ছে।’

জানা গেছে, আটকে পড়া চালানের মধ্যে ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমসে অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছে এক হাজার ২৩৩টি আমদানি পণ্যের চালান। সঠিক সময়ে ছাড় হলে এতে কাস্টমস শুল্ক পেত ২১ কোটি টাকা। এরপর আড়াই বছরেও পণ্যগুলো ছাড় করাননি আমদানিকারকরা। আর ২০১৮ সালে আমদানি করা ৩১৪টি চালান বন্দরের ইয়ার্ডে পড়ে আছে। এতে সরকারের শুল্ক আটকা পড়েছে ৯২ কোটি টাকা। আর ২০১৯ সালে আমদানি করা বিপুল পণ্যের চালানও আটকা আছে। জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত এক হাজার ৫২০টি পণ্যের চালান আটকে আছে বন্দরের ইয়ার্ডে। এসব পণ্যের শুল্ক প্রায় হাজার কোটি টাকা।

আমদানিকারকরা হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য বন্দরে ফেলে রাখেন কেন জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানি রিগ্যান বলেন, ‘পণ্য নির্ধারিত মানসম্পন্ন না হওয়া, বাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া, শুল্ক স্টেশনগুলোতে শুল্কায়নে মূল্যবৈষম্য, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনা এর অন্যতম কারণ।’

কাস্টমসের নিয়মানুযায়ী, প্রতিটি আমদানি পণ্যের চালান জাহাজ থেকে নামিয়ে চার দিন পর্যন্ত মাসুল ছাড়া ইয়ার্ডে রাখা যায়। এরপর বিভিন্ন হারে মাসুল গুনতে হয়। ফলে ২০১৭ সাল থেকে যেসব পণ্য বন্দরে আটকে আছে, গত আড়াই বছরে এর মাসুলের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে লাখ লাখ টাকা। এই বিপুল মাসুল আগে পরিশোধ করে কনটেইনার বন্দর থেকে ছাড় করতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ইয়ার্ড। সেই গুরুত্বপূর্ণ ইয়ার্ডে বছরের পর বছর এসব কনটেইনার পড়ে থাকায় বন্দর পরিচালনায় সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। পণ্য বেশিদিন পড়ে থাকলে বন্দরের আয় বাড়ে। কিন্তু আমরা এভাবে আয় বাড়াতে চাই না। আমরা চাই মাসুল পরিশোধের আগে চার দিনের মধ্যেই কনটেইনার বন্দর থেকে ডেলিভারি হোক।’

কনটেইনারগুলো মাসের পর মাস বন্দরে পড়ে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিপিং লাইনগুলো। জাপানভিত্তিক কে লাইন শিপিংয়ের নির্বাহী পরিচালক সাহেদ সারোয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্নভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। কনটেইনারের যত ট্রিপ হবে তত আয় হয়। আমরা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এ থেকে উত্তরণের উপায়, কাস্টমস নিলামের আইন সঠিকভাবে কার্যকর করা।’

গত সপ্তাহে কাস্টমসের গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কাস্টমস অ্যাক্ট ১৯৬৯-এর সেকশন(৮২)(১ )-এর বিধান অনুযায়ী সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে আমদানি করা পণ্য বন্দরে অবতরণের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে, বিমান অবতরণের পরবর্তী ২১ দিনের মধ্যে অথবা উভয় ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত অতিরিক্ত সময়সীমার মধ্যে শুল্ক-কর পরিশোধ করে খালাস করতে হবে। না হলে ওই পণ্যের নিলাম বা আইনানুগ উপায়ে নিষ্পত্তি করা হবে।

 

 

মন্তব্য