kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ জুলাই ২০১৯। ৮ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৯ জিলকদ ১৪৪০

উপজেলা নির্বাচন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর বাড়িতে হামলা

আরো কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ, ব্যালট ছিনতাই, জাল ভোট আহত ১৬, আটক ১৪। আ. লীগ ৬ উপজেলায় বিজয়ী

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৯ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর বাড়িতে হামলা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র নারী চেয়ারম্যান প্রার্থী নাছিমা লুৎফর রহমানের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তারা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে একজন আহত হয়েছে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। এর আগে যুবলীগের এক নেতার ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

এ ছাড়া জাল ভোট ও ব্যালট ছিনতাইয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে ফেনীর ছাগলনাইয়া, মাদারীপুর সদর ও হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায়। আটক করা হয়েছে ৯ জনকে। সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে সংঘর্ষ হয়েছে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে।

রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছেন।

গতকাল মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাচনের পঞ্চম ধাপ দেশের ২০টি উপজেলায় ভোটগ্রহণ হয়। এর মধ্যে আদালতের স্থগিতাদেশ ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় দুটি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ভোট হয়নি। কেন্দ্রগুলোয় ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। কয়েকটি ঘটনা ছাড়া উপজেলার শেষ ধাপের ভোট সুষ্ঠু হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন সচিব মো. আলমগীর।

এদিকে গত রাতেই ভোটের ফল ঘোষণা শুরু হয়েছে। গাজীপুর সদর উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী রীনা পারভীন। রাজশাহীর পবায় বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুনসুর রহমান। শায়েস্তাগঞ্জে আওয়ামী লীগের আব্দুর রশিদ তালুকদার ইকবাল, বরগুনার তালতলীতে একই দলের রেজবি-উল-কবির ও শেরপুরের নকলায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী শাহ মো. বোরহান উদ্দিন বিজয়ী হয়েছেন। নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায় নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের আসাদুজ্জামান আসাদ। খুলনার ডুমুরিয়ায় বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী গাজী এজাজ আহমেদ। মাদারীপুর সদরে নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ওবাইদুর রহমান। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের আশরাফুল আলম সরকার।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর—

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর বাড়িতে হামলা : গতকাল দুপুরে বিজয়নগর উপজেলার সাতগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ইভিএমের একাধিক মনিটর ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। বড়পুকুর পার এলাকায় হামলার শিকার হন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) ও যুবলীগ নেতা হাসান সারোয়ারসহ কয়েকজন। স্বতন্ত্র প্রার্থী নাছিমা লুৎফুর রহমানের লোকজন এ হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আহত হাসান সারোয়ারকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। এ ঘটনার পরপরই স্বতন্ত্র প্রার্থী নাছিমা লুৎফুর রহমানের ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর সদরের বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে।

নাছিমার নির্বাচন তদারকির দায়িত্বে থাকা মো. আজিম সাংবাদিকদের জানান, দুপুরে একদল হামলকারী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হালদারপাড়ার লুৎফুর টাওয়ারে হামলা চালায়। তারা বাড়িতে ঢুকে নিচতলার একাধিক কক্ষে ভাঙচুর চালায়। এ ছাড়া বাড়ির তিনতলা পর্যন্ত জানালার কাচ ভাঙচুর করে। বেইজমেন্টে থাকা তিনটি দামি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। পুলিশ কর্মকর্তার আরেকটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়, যিনি ওই বাড়িতে ভাড়া থাকেন। হামলায় বাড়ির দারোয়ান আলী আহমেদ আহত হন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা পরিষদে নির্বাচনে ভাঙচুর করা স্বতন্ত্র প্রার্থী নাছিমা লুৎফর রহমানের গাড়ি।     ছবি : কালের কণ্ঠ

নাছিমা লুৎফুর রহমান অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী তানবীর ভূঁইয়ার লোকজন এ হামলা চালিয়েছে। তিনি লুটপাটেরও অভিযোগ আনেন।

তবে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন সরকার বলেন, ‘হাসান সারোয়ারের ওপর হামলার সঙ্গে নাছিমা লুৎফুর রহমানের বাড়ি ভাঙচুরের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সোমবার রাতে নাছিমা লুৎফুর রহমানের এক আত্মীয় টাকাসহ গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা ধামাচাপা দিতেই তারা নিজেরা বাড়িতে হামলার নাটক সাজিয়েছে।’   

সদর থানার ওসি মো. সেলিম উদ্দিন জানান, ঘটনার পরপরই সদর থানা পুলিশ সেখানে ছুটে যায়। পরে জহিরুল ইসলাম জুম্মানসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়।

সংঘর্ষ : সকালে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চৌবাড়ি ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর (ঘোড়া প্রতীক) সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আইনজীবীসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। এ ঘটনায় ভোটকেন্দ্র সাময়িক বন্ধ করে রাখা হয়। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে নৌকা প্রতীকের সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

আহতদের মধ্যে জেলা যুবলীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এপিপি  অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম ভুট্টো (৪৫) ও রায়দৌলতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা টগরকে (৩৬) আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিরাজগঞ্জ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

কামারখন্দ থানার ওসি মো. হাবিবুল ইসলাম জানান, ভোটারদের স্লিপ দেওয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।

রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মাজবাড়ী ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে অন্তত একজন আহত হয়েছেন।

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার কাজিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী আলী আহমদ খান ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুর রশিদ তালুকদার ইকবালের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে তিনজন আহত হয়।

জাল ভোট, ব্যালট ছিনতাই : ফেনীর ছাগলনাইয়া নির্বাচনে ব্যালট ছিনতাই ও জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগে সাতজনকে আটক করেছে পুলিশ। সকালে উপজেলার চারটি কেন্দ্র থেকে তাঁদের আটক করা হয়েছে। ছাগলনাইয়া থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মাদারীপুর সদর উপজেলার দুটি কেন্দ্র থেকে দুজনকে আটক করা হয়েছে।

দুই প্রার্থীর নির্বাচন প্রত্যাখ্যান : রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলায় আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী কাজী সাইফুল ইসলাম নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভোটকেন্দ্রে এজেন্টদের ঢুকতে না দেওয়া এবং রাতে ভোটার ও এজেন্টদের বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি হামলা, বাড়ি-ঘর ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটানোর অভিযোগ এনে নির্বাচন স্থগিত চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।

তবে রিটার্নিং অফিসার ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, প্রার্থী কাজী সাইফুল ইসলামের অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। তাঁর দাবি মেনে নেওয়ার কোনো কারণ তিনি পাননি।

ভোট কারচুপি ও ভোটকেন্দ্রে শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ তুলে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছেন হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী) আলী আহমদ খান। বিকেলে শায়েস্তাগঞ্জ প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।

‘দুষ্টুরা চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পারেনি’ : কয়েকটি ঘটনা ছাড়া উপজেলার শেষ ধাপের ভোট সুষ্ঠু হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন সচিব মো. আলমগীর। গতকাল ভোটগ্রহণ শেষে নির্বাচন ভবনে নিজের কক্ষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।

ইসি সচিব বলেন, ‘সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হয়েছে প্রতিটি কেন্দ্রেই। সামান্য একটু সমস্যা হয়েছিল। কয়েকটি ঘটনা ছাড়া বাকি উপজেলাগুলোতে ভোট মোটামুটি সুষ্ঠু হয়েছে। দু-একটা কেন্দ্রে সামান্য একটু গণ্ডগোল করার চেষ্টা করেছে দুষ্টু লোকজন। কিন্তু তারা সফল হয়নি। যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি কেন্দ্রে ইভিএম ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, সেটা পারেনি। তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর অল্প কিছুক্ষণের জন্য ভোটগ্রহণ স্থগিত ছিল। ইভিএম রি-ইনস্টল করে আবার ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে।’

সচিব আরো বলেন, ‘একটা উপজেলায় কিছু লোকজন জোর করে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তারা পাঁচটা ব্যালট পেপারে জোর করে সিল দিয়েছিল। ওই পাঁচটা ভোট বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।’

মন্তব্য