kalerkantho

বাজেটের আকার বাড়লেও সরকারের ব্যয় কম

আরিফুর রহমান   

১৮ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাজেটের আকার বাড়লেও সরকারের ব্যয় কম

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি খাতের ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির তুলনায় বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে সবার তলানিতে। দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের বাজেট বা সরকারি ব্যয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। সীমিত সম্পদের মধ্যে সরকারি ব্যয়ের আকার বাড়ানো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে সরকার। বৃহস্পতিবার সংসদে উপস্থাপিত মধ্য মেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানা গেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে সরকারি ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের জিডিপি যদি হয় ১০০ টাকা, তার মধ্যে মাত্র ১৮ টাকা খরচ হয় বাজেটে। বাংলাদেশের ওপরে থাকা ভারতে সরকারি ব্যয় হয় ওই দেশের জিডিপির ২৮ শতাংশ। মালয়েশিয়ায় ২৩ শতাংশ, নেপালে ৩২ শতাংশ, ভিয়েতনামে ২৮ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ২২ শতাংশ। উন্নত দেশের মধ্যে সরকারি ব্যয় জিডিপির অনুপাতে সবচেয়ে বেশি ফ্রান্সে। ওই দেশের জিডিপির ৫৬.১৬ শতাংশ খরচ হয় সরকারি ব্যয়ে। অর্থাৎ ওই দেশে ১০০ টাকা জিডিপি হলে বাজেট তথা সরকারি ব্যয়ে খরচ করা হয় ৫৬.১৬ টাকা। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ব্যয় হয় বাজেটের ৩৫ শতাংশ। এ ছাড়া বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে সরকারি ব্যয় হয় জিডিপির ৫০ শতাংশের ওপরে।

বাংলাদেশে সরকারি ব্যয় তথা বাজেটের আকার কম কেন—এর কারণ জানতে একাধিক অর্থনীতিবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানান, বাংলাদেশে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা কম। টাকা বরাদ্দ দিয়েও খরচ করতে পারে না মন্ত্রণালয়গুলো। বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকার কারণে সরকারি ব্যয়ে বরাদ্দ কম। তাই স্বচ্ছতার সঙ্গে যদি বাজেট বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে সরকারি ব্যয় না বাড়ানোই উচিত বলে মত তাঁদের। সরকারি ব্যয় না বাড়ার পেছনে অর্থনীতিবিদরা আরো বলেছেন, বাংলাদেশে কর আদায়ের হার বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় কম। জিডিপির অনুপাতে কর আদায়ের হার এখানে ১০ শতাংশের মধ্যে। কর আদায়ের হার যদি কম হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাজেটের আকারও কম হবে।

অবশ্য বাংলাদেশে বাজেটের আকার আরো বড় হওয়া জরুরি বলে মত দেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ অবকাঠামো ও সামাজিক খাতে কখনো বেসরকারি খাত বিনিয়োগ করে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ সামান্য। তাই সরকারি ব্যয় বাড়ানো জরুরি। তার আগে বাজেট বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মত দেন অর্থনীতিবিদরা।

বৃহস্পতিবার আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি ব্যয়ের আকার বাড়িয়ে জনগণের জন্য উন্নত সরকারি সেবা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুণগত মানোন্নয়নের জন্য আবর্তক ব্যয় বা পণ্য ও সেবা ক্রয়ের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সরকারি বিনিয়োগের ক্রমবর্ধনশীল চাহিদা মেটাতে মূলধন খাতের ব্যয় তথা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় বাড়ানোও প্রয়োজন। ফলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির অর্থনৈতিক ধারা বজায় রাখতে প্রক্রিয়ায় আবর্তক ব্যয় ও মূলধন ব্যয়ের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, আমাদের বাজেট বাস্তবায়ন তথা সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতার যথেষ্ট ঘাটতি আছে। যদি বাস্তবায়নে ঘাটতি দূর ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, তখন সরকারি ব্যয় বাড়ানো যেতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে সরকারি ব্যয় অন্য অনেক দেশের তুলনায় কম। অথচ এটি বাড়ানো জরুরি অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা শিক্ষায় বিনিয়োগ  বাড়ানোর জন্য। কিন্তু আমাদের বাস্তবায়ন সক্ষমতার কারণে সরকারি ব্যয় বাড়ছে না। এ জন্য খরচ বাড়ানোর সক্ষমতা ও অপচয় বন্ধের পরামর্শ দেন তিনি।

বাংলাদেশে সরকারি ব্যয়ের মধ্যে মোটা দাগে খরচ হয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির মাধ্যমে। প্রতিবছর বড় আকারের এডিপি ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি খরচ করতে না পারার আশঙ্কায় তা কাটছাঁট করা হয়। চলতি অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল এক লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে এক লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এভাবে প্রতিবছরই উন্নয়ন বাজেট সংশোধন করা হয় মন্ত্রণালয়গুলো খরচ করতে না পারার কারণে। অবশ্য অর্থমন্ত্রী মধ্য মেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে দাবি করেন, সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে সরকার ই-জিপি চালু করেছে। মেগা প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থছাড়ে আমূল সংস্কার আনা হয়েছে। প্রথম কিস্তি থেকে চতুর্থ কিস্তি পর্যন্ত পিডিদের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে দিন দিন এডিপি বাস্তবায়ন বাড়ছে বলে দাবি করেন তিনি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্য মেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর বাজেট বাস্তবায়ন ৮০ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ পাশের দেশ ভারতে এই হার ৯০ শতাংশের ওপরে। ভিয়েতনাম, নেপাল, মালয়েশিয়ায়ও একই চিত্র। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়িত হয়েছিল ৯৩ শতাংশ। এরপর প্রতি অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়নের হার কমেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়িত হয়েছিল ৭৮ শতাংশ। গত পাঁচ অর্থবছর ধরে বাস্তবায়নের হার ৮০ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, বাংলাদেশে বাজেট তথা সরকারি ব্যয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আমাদের এখানে বাজেটে যতটুকু টাকা দেওয়া হয়, ততটা খরচ করা যায় না। ব্যয়টা উৎপাদনশীল খাতে খরচ হয় না। রাজস্ব আদায়ের হারও কম। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ঋণ পাওয়া যায় না। পেলেও খরচ করতে পারে না মন্ত্রণালয়গুলো। এ কারণে বাজেট বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি। সরকারি ব্যয় আরো বাড়ানো উচিত বলেও মত দেন মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ একটি গবেষণায় দেখিয়েছে, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ৯৫ লাখ কোটি টাকা লাগবে। প্রতিবছর বাড়তি প্রায় সাত লাখ কোটি টাকার মতো লাগবে বলে জানিয়েছে জিইডি। অথচ দেশের বাজেট তথা সরকারি ব্যয় এখন পাঁচ লাখ কোটি টাকা। সে হিসেবে এসডিজি বাস্তবায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নত দেশের কাতারে যেতে বাজেটের আকার আরো বাড়ানো উচিত বলে জানান অর্থনীতিবিদরা। তবে তার আগে অবশ্যই বাজেট বাস্তবায়ন তথা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অপচয় বন্ধের পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা