kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

ফের আলোচনায় খুলনার টিপু সুলতান

এবার বিডিবিএলের ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ!

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এবার বিডিবিএলের ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ!

খোলাবাজার থেকে গম কেনা সংক্রান্ত সরকারের সঙ্গে চুক্তির ভুয়া কাগজ দেখিয়ে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) থেকে ২৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন খুলনার মেসার্স ঢাকা ট্রেডিং হাউসের কর্ণধার টিপু সুলতান। বিডিবিএলের কয়েক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে তিনি এ কাজ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর আগে চিনির এলসি জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে টিপু সুলতানকে গ্রেপ্তার করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর আগে নানা কৌশলে ঋণের নামে ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়েছেন এই ব্যবসায়ী। খুলনা, ঢাকা ও বগুড়া মিলে তাঁর ব্যাংকঋণের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।

বিডিবিএলের ২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে নেমে সত্যতা পাওয়ায় টিপু সুলতান ও বিডিবিএলের তিন কর্মকর্তাসহ মোট চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছে দুদক। কমিশনের সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দুদক মামলাটি করতে যাচ্ছে। মামলায় প্রধান আসামি করা হচ্ছে ব্যবসায়ী টিপু সুলতানকে। আসামির তালিকায় আরো থাকছেন— বিডিবিএলের প্রিন্সিপাল শাখার এসপিও দীনেশ চন্দ্র সাহা, এজিএম দেওয়ান মোহাম্মদ ইসহাক ও জেনারেল ম্যানেজার (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ রহমান কাদরী।

সাধারণভাবে খোলাবাজার থেকে গম বা ধান কেনার জন্য কোনো বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের কোনো ধরনের চুক্তি হয় না। সরকারি কর্মকর্তারা নিজেরা সরাসরি এই গম বা ধান কেনার কাজটি করেন।

দুদকের অনুসন্ধান-পরবর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় বাজার থেকে ১৫ হাজার টন গম সংগ্রহের জন্য খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যবসায়ী টিপু সুলতান স্বাক্ষরিত এমওইউর কাগজ দেখিয়ে ব্যাংকের কাছে ঋণের আবেদন করা হয়। ২০১২ সালের ২১ মার্চ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৬৭তম সভায় প্রস্তাবিত এলটিআর ফ্যাসিলিটির ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ জামানত হিসেবে ও সমপরিমাণ অর্থের এফডিআর লিয়েন রাখার শর্তে ১৫ শতাংশ মার্জিনে ৩০ কোটি টাকার লোকাল এলসি লিমিট অনুমোদন করা হয়। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ হিসাবে ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার এলটিআর ঋণ মঞ্জুর করা হয়। একই বছরের ৪ জুন মঞ্জুরিপত্র ইস্যু করা হলে পরদিন ৫ জুন বিডিবিএলে এলসি স্থাপন করা হয়। এলসি নেগোসিয়েশন ব্যাংক হিসেবে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের বিজয়নগর শাখায় ৬ জুন ফরওয়ার্ডিং শিডিউলসহ শিপিং ডকুমেন্টস দাখিল করা হয়। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ওই দিনই তা বিডিবিএলে পাঠানো হয়। বিডিবিএলের নোটিংয়ে উল্লেখ করা হয়, ঢাকা ট্রেডিং হাউস ৬ জুন পত্রের মাধ্যমে এলসিতে উল্লিখিত মালপত্র বুঝে পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ডকুমেন্ট ছাড় করার অনুরোধ করা হয়েছে।

এদিকে এলসি স্থাপনের পরদিনই ১৫ হাজার টন গম বুঝে পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দলের সন্দেহ হয়। পরবর্তী সময়ে বিডিবিএলের নিয়োগ করা অডিট ফার্ম জি কিবরিয়া অ্যান্ড কম্পানি কর্তৃক প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চের গ্রাহক মেসার্স ঢাকা ট্রেডিংয়ের ঋণ বিতরণ বিষয়ে নিরীক্ষা করা হয়। তাতে দেখা যায়, আপ টু ডেট ইনকাম ট্যাক্স সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা হয়নি। কেওয়াইসিতে টিন নম্বর সংযোজন করা হয়নি। কেওয়াইসির পরিচয়দানকারীর তথ্য সঠিক নয়। কেওয়াইসির গ্রাহক টিপু সুলতানের বাবার নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রে টিপু সুলতানের বাবার নাম এক নয়। ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল ঢাকা ট্রেডিং হাউসের এলটিআর অ্যাকাউন্ট খোলা হয়, ৯ এপ্রিল ঋণসংক্রান্ত ২৫ কোটি টাকা অনুমোদিত হয় এবং ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। ঋণটি গ্রাহকের পরিশোধ প্রক্রিয়া, দক্ষতা ও সক্ষমতা যাচাই না করেই খুব দ্রুত অনুমোদন করা হয়। যে এমওইউর জন্য ঋণটি দেওয়া হয় তা ভুয়া। উপরন্তু এলটিআরের বিপরীতে কোনো টাকা পরিশোধ হয়নি এবং ঋণটি বর্তমানে শ্রেণীকৃত অবস্থায় আছে, যার বিপরীতে মর্টগেজ একেবারেই অপ্রতুল এবং এটা পরিশোধ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

খাদ্য অধিদপ্তরের বণ্টন ও বিতরণ বিভাগের পরিচালক বদরুল হাসান স্বাক্ষরিত ইউও নোটের নম্বর ৩-এর কপি ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি অনুযায়ী, বদরুল হাসান টিপু সুলতানের সঙ্গে কোনো এমওইউ স্বাক্ষর করেননি। এ ছাড়া একই বছরে ২৬ জানুয়ারি জি কিবরিয়া অ্যান্ড কম্পানির চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের বিশেষ অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঋণটি প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।

এ ব্যাপারে খুলনাস্থ ঢাকা ট্রেডিং লিমিটেডের টিপু সুলতানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। সরেজমিনে তাঁর প্রতিষ্ঠানে গেলেও ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

প্রসঙ্গত, এর আগে রূপালী ব্যাংক খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর করপোরেট শাখা থেকে ঢাকা ট্রেডিংয়ের নামে ১৫০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। সরকারের কাছ থেকে একটি প্রেস হাউস ২৩ কোটি টাকায় কিনে তিনি ওই সম্পত্তি ব্যাংকে জামানত রেখে ৮৫ কোটি টাকা ঋণ নেন, যা সুদে-আসলে ১৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। পাট রপ্তানিকারকদের জন্য প্রযোজ্য ব্যাংকঋণ ব্লক সুবিধার আওতায় তিনি এই খেলাপি ঋণ ব্লক করে রেখেছেন। খুলনা, ঢাকা ও বগুড়া মিলে এই টিপু সুলতানের ব্যাংকঋণের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।

 

 

মন্তব্য