kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

ওভালের যা আছে বাংলাদেশেরই তা নেই

সাইদুজ্জামান, কার্ডিফ থেকে   

৯ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ওভালের যা আছে বাংলাদেশেরই তা নেই

কার্ডিফ স্টেডিয়াম। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশে কিউরেটরকুলের শিরোমণি ফিল রাসেল। ১৯৯৮ সালে ঢাকায় বসবে মিনি বিশ্বকাপের আসর, অনেক বিবর্তনের পর যা এখন আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। এত বড় আয়োজন না পণ্ড হয়ে যায় নিম্নমানের উইকেটের কারণে! তাই দক্ষিণ আফ্রিকার নামি মাঠকর্মী রাসেল এলেন ঢাকায়। মাত্র ছয় মাসে এমন সব উইকেট বানালেন যে বাংলাদেশে এখনো তিনিই কিউরেটরশিপের আইডল।

তখনই পঞ্চাশোর্ধ্ব ভদ্রলোকটির কাছে জানতে চেয়েছিলেন, উইকেট কেমন আচরণ করবে? উত্তরে তিনি গোঁফের ফাঁকে মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘ষোড়শীর মতো রহস্যময়!’ মানে, নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে মিনি ওয়ার্ল্ভ্র কাপের উইকেট প্রশংসিত হয়েছিল সব দলের কাছেই। হাঁটুর নিচে বল থাকত যে উইকেটে, সেটা থেকেই বল পাঁজরেও উঠতে দেখাটা শুদ্ধ ক্রিকেট অনুসারীদের যথেষ্ট বিনোদনই দিয়েছিল। এরপর চেষ্টা করেও রাসেলকে স্থায়ী নিয়োগ দিতে পারেনি, বাংলাদেশের উইকেটও ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। চন্দিকা হাতুরাসিংহের কুশলী নির্দেশনায় তো ‘টেইলর মেড’ উইকেটেই খেলেছেন তামিম ইকবালরা।

তাই ইংল্যান্ডের ছোট্ট ক্রিকেটপাড়া লিস্টারের উইকেট দেখেও চোখ ছানাবড়া বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদের। ওভালে একদিন প্রস্তুতির ফাঁকে বলছিলেন, ‘এই মাঠে কয়টা উইকেট জানেন? ৪৫টা!’ অথচ সারা বাংলাদেশেও ওভাল মানের ৪৫টি উইকেট নেই, এমন দাবির প্রতিবাদ করতে পারেননি বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান। মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে ৮টি উইকেটই যে বিসিবির গর্ব! ১০০-এর ওপর মাঠকর্মী কাজ করেন সেগুলোর ওপর প্রতিদিন। সেখানে ওভালের ৪৫টি পিচ আর বিশাল আউটফিল্ডে জনা দশেকের বেশি কর্মী চোখে পড়েনি। তবু ওভালের ২২ গজে বল ছোটে, সবুজ গালিচাও বিদ্যুত্গতির। অন্যদিকে মিরপুরের উইকেট ধীরগতির, আউটফিল্ড নিয়ে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন! সমস্যাটা যে কোথায়, সেটি বিসিবির এক চাকুরের কথায় সামান্য ইঙ্গিত রয়েছে, ‘দেখেন ওরা হুভার কাভার ব্যবহার করছে। আর আমাদেরটা এমনি এমনি পড়ে আছে।’ ২০১১ বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ড থেকেই কেনা ৮০ লাখ টাকার হুভার কাভারটির ব্যবহার হয়েছে বারদুয়েক। সেই থেকে ওটা শুয়ে আছে প্রেসবক্স প্রান্তের সামনে। একবার নাকি ওটার ভেতর থেকে সাপও বেরিয়েছিল!

যাক, অপচয় তো আমরা নানাভাবেই করি। সে তুলনায় হুভার কাভার যৎসামান্য। পূর্বাচলে যে নতুন স্টেডিয়াম তৈরির পরিকল্পনা হয়েছে, সেটির বাজেট ৮০০ কোটি টাকা। কানাঘুষা শুরু হয়েছে, ওটার বাজেট নাকি আরো বাড়বে। অবিশ্বাস করা কঠিন, কারণ বাংলাদেশে সব কিছুর নির্মাণ ব্যয়ই তো সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে!

এসব দেখেটেখে হাল ছেড়ে একজন অনুনয়ের সুরে বলছিলেন, ‘অপচয় হোক, তবু কাজটা যেন ঠিকভাবে হয়।’ তাঁর মনোভাবটা এমন যে প্রস্তাবিত স্টেডিয়ামের বিস্তর অর্থের অপচয় হলেও যেন উইকেট, আউটফিল্ড এবং প্র্যাকটিস সুবিধাদি বিশ্বমানের হয়। তবে বাংলাদেশের চিরায়ত নিজস্ব একটি ধারা আছে। উইকেট-আউটফিল্ড গোল্লায় যাক, উঁচু গ্যালারি বানাও। দামি বিদেশি চেয়ার বসিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দাও। আরো গুরুত্বপূর্ণ ৫০ হাজার, এক লাখ ধারণক্ষম স্টেডিয়ামের স্বপ্ন দেখিয়ে সরকারের মন ভজাও। তাহলে সরকার সহযোগিতার হাত আরো বাড়িয়ে দেবে। কেউ প্রশ্নও করবে না যে বিসিবি ২৫ হাজার ধারণক্ষমতার মিরপুর স্টেডিয়াম ঠিকঠাক রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে না, তারা ৫০ হাজারের নির্মিতব্য অবকাঠামো কিভাবে সামাল দেবে?

প্রশ্নগুলো আসলে প্রতিটি বিদেশি সফরেই মনে উঁকি দেয়। গরিব আয়ারল্যান্ডের লোকবলও নেই। তবু ডাবলিনের যে দুটি মাঠে ত্রিদেশীয় সিরিজ হয়েছে, সে দুটি মিরপুরের চেয়েও ক্রিকেট উপযোগী। গ্যালারির বাহার নেই, তবে উইকেট-আউটফিল্ডের প্রয়োজনীয় পরিচর্যায় ঘাটতি নেই। আর ক্রিকেটের রাজধানী লন্ডন দেখে মন আরো বেশি করে বিষণ্নতায় আক্রান্ত। আবার অবাকও লাগছিল বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ম্যাচের ‘হাইপ’ দেখে। বিশ্বকাপে আগের দুইবারই ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এবার জিতলে হ্যাটট্রিক!

আরে, এ ভাবনা তো মনেই উঁকি দেওয়ার কথা নয়। ক্রিকেটীয় সামর্থ্যের ব্যবধান তো আর বলে-কয়ে ঘোচানো যায় না। অবকাঠামোগত কারণে যে ব্যবধান সহসা কমারও কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং সেই পুরনো বিস্ময় ফিরে ফিরে আসছে বিশ্বকাপের মাঠ দেখে দেখে।

এই যে বিশ্বকাপে খেলে বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকেও হারিয়ে দিয়েছে—এগুলো আসলে দৈবক্রমে ঘটে যায়। ক্রিকেট অবকাঠামো বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্বমানের ধারেকাছেও নেই। এই জল-হাওয়ায় বেড়ে উঠেও সাকিব আল হাসান বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার, বাংলাদেশও প্রায়ই হারিয়ে দেয় শ্রেয়তর দলগুলোকে। অবিশ্বাস্য!

 

মন্তব্য