kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

তিন কারণে বাড়ছে আদা রসুন পেঁয়াজের দাম

প্রভাব পড়তে পারে কোরবানির মসলার বাজারে

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তিন কারণে বাড়ছে আদা রসুন পেঁয়াজের দাম

তিন কারণে বেড়েছে এবং বাড়ছে আদা, রসুন ও পেঁয়াজের দাম। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আদা ও রসুনের উৎপাদন মৌসুম শেষ হওয়ায় দাম বেড়ে গেছে। নতুন করে ৫ শতাংশ উেস আয়কর আরোপ করায়ও এসব পণ্যের দামে প্রভাব পড়েছে। সর্বশেষ এসব পণ্য আমদানিতে ব্যাংক সুদের হার সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে আদা ও রসুনের দাম বাড়ছে স্থানীয় বাজারে। আর ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি করায় বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। এর সঙ্গে নগরে জলাবদ্ধতা ও গ্রামে বন্যা যোগ হওয়ায় এসব পণ্যের সরবরাহ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থায় আগামী কোরবানির ঈদে এই তিন গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্যের বাজারে আরো অস্থিরতার শঙ্কা দেখছে ব্যবসায়ীরা।

এসব পণ্যের বাজার অবস্থা জানতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের নিয়ে গত ১১ জুলাই বৈঠক করেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ওই বৈঠকে এসব পণ্যের মূল আমদানিকারকরা উপস্থিত ছিল না। আর এতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদেরও ডাকা হয়নি। ফলে আদা, রসুন ও পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণগুলো চিহ্নিত হয়নি; সমাধানও আসেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক কেজি রসুন চট্টগ্রাম বন্দর থেকেই কেনা পড়ছে ১৪০ টাকায়। সেই রসুন খাতুনগঞ্জে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। আর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ টাকায়। গত মাসে খুচরাতেই এই রসুনের কেজি ছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকা।

টানা ২০ বছর ধরে আদা ও রসুন আমদানি করছেন চট্টগ্রামের ফরহাদ ট্রেডিংয়ের মালিক নুর হোসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা কেমন বিচার। যে দেশগুলো থেকে রসুন আমদানি করা হয় সেখানে উৎপাদন শেষ হওয়ায় টনপ্রতি ৮০০ ডলারের রসুন কিনতে হচ্ছে এক হাজার ৪০০ ডলারে। কাস্টমসে এসেসমেন্ট হচ্ছে এক হাজার ৪০০ ডলারের ওপর; ফলে দামও বেশি পড়ছে। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ করা হয়েছে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি)। গতকাল দুই কনটেইনার রসুনের শুল্ক দিতে হয়েছে সাত লাখ টাকা; আগে ছিল তিন লাখ টাকা। সর্বশেষ যোগ হয়েছে বাড়তি ব্যাংক সুদের হার। আগে ব্যাংক সুদের হার ছিল ১২ শতাংশ এখন নেওয়া হচ্ছে সাড়ে ১৪ শতাংশ।’

তিনি বলেন, ‘সব কিছু বাড়তি দিয়ে আমি নয়, কেউই পণ্য আমদানি করবে না। আর আমি তো আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম নই যে ব্যাংকের চড়া সুদে ঋণ নিয়ে লোকসান দিয়ে পণ্য বিক্রি করব। আবার ঋণখেলাপি হয়ে জেলে যাব!’

তিনি পরামর্শ দেন, ‘আমি পণ্য না আনলে আমার ক্ষতি এড়ানো যাবে, কিন্তু কিছু অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে বাজারটা অস্থিতিশীল হলে সরকারের দুর্নাম হবে। এটার জন্য দ্রুত বৈঠকে বসা উচিত।’

জানা গেছে, পেঁয়াজ, রসুন ও আদার মতো নিত্যভোগ্যপণ্যের বাজার ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকার অনেক আগে থেকেই কাস্টমস ডিউটি ছাড়া বাকি সব শুল্কহার প্রত্যাহার করেছে। এই কারণে এত দিন ধরে বাজার স্থিতিশীল ছিল। এমনকি গত রমজানেও বাজার অস্থির হয়নি। কিন্তু নতুন বাজেটে হঠাৎ করেই ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হয়েছে এই আদা-রসুন আমদানিতে।

আদার আমদানিকারক আজাদ ট্রেডিংয়ের কর্ণধার রেজাউল করিম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, টনপ্রতি এক হাজার ২৫০ ডলারে আদা কিনে চীন থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পৌঁছতে খরচ পড়ছে কেজিপ্রতি ১১৯ টাকা, কিন্তু গতকালও বন্দরে আদা বিক্রি হয়েছে ১০৫ টাকায়। অর্থাৎ কেনা দামের চেয়ে কেজিতে ১৪ টাকা লোকসান হচ্ছে। ৫ শতাংশ আয়কর যোগ হওয়ায় কেজিতে বাড়তি খরচ হচ্ছে ছয় টাকা।

বাংলাদেশ এগ্রি কমোডিটি ইমপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আজাদ বলছেন, নিত্যপণ্যের ওপর বাড়তি আয়কর, ব্যাংকঋণের বাড়তি সুদ এগুলোর নেপথ্যে কী হচ্ছে খতিয়ে দেখা উচিত। কারণগুলো চিহ্নিত করে পদক্ষেপ না নিলে বাজারে স্বস্তি আসবে না। 

এসব ঝামেলার কারণে খাতুনগঞ্জের অনেক বনেদি ও মূল ব্যবসায়ী এখন আদা-রসুন আমদানি কমিয়ে দিয়েছে, আবার অনেকেই বন্ধ করে দিয়েছে। ফুলকলি গ্রুপ আগে প্রতি সপ্তাহে পাঁচ কনটেইনার আদা-রসুন আমদানি করত; এখন প্রতিষ্ঠানটি ১৫ দিনে তিন কনটেইনার আমদানি করেছে।

ফুলকলি গ্রুপের এক কর্মকর্তা বলছেন, ‘অব্যাহত লোকসান এড়াতে এসব পণ্য আনা কমানো ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। এখন এগুলো বাদ দিয়ে অন্য পণ্য আমদানি করছি।’

জানা গেছে, খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে গতকাল আদা বিক্রি হয়েছে কেজি ১১০ টাকায়। আর কাজীর দেউড়ি খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে কেজি ১৩৫ টাকায়।

খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সভাপতি সোলায়মান বাদশা মনে করছেন, কোরবানি ঈদের পণ্য বেচাকেনার এখনই মূল সময়, কিন্তু গ্রামে বন্যা ও নগরে জলাবদ্ধতার কারণে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এখন পাইকারি বাজারে আদা, রসুন ও পেঁয়াজের বেচাকেনা একেবারে কমে গেছে। আমদানি কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব এখন বাজারে নেই। কিন্তু বেচাকেনা শুরু হলে বাজারে সংকট সৃষ্টি হবে, তখন আর বাজার সামাল দেওয়া যাবে না। এখনই সময় বৈঠকে বসে সমাধানে করণীয় ঠিক করা।

এদিকে রমজানজুড়ে স্থিতিশীল থাকলেও এখন দেশে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা চলছে। পেঁয়াজ রপ্তানি বাড়াতে ভারত সরকার কৃষকদের জন্য দেওয়া ১০ শতাংশ প্রণোদনা প্রত্যাহার করেছে এবং বাজেটে আমদানির ওপর ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আরোপ করায় দেশে পেঁয়াজের বাজারে দাম বেড়েছে।

তবে পেঁয়াজ আমদানির ওপর থেকে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করায় বাজার কিছুটা সহনীয় হয়েছে দাবি করে খাতুনগঞ্জ কাঁচাপণ্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস কালের কণ্ঠকে বলেন, সে সময় এক সপ্তাহ বাজারে অস্থিরতা ছিল, এখন কিছুটা কমেছে। তবে বন্যার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ট্রাকের সংকট রয়েছে, ভাড়াও বেড়েছে, এই কারণে দাম এখনো বাড়তি।

খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে গত ১৫ জুন ভারতীয় নাসিক জাতের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে কেজি ২৬ টাকায় আর গতকাল বিক্রি হয় ৩০ টাকায়। অবশ্য নগরীর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকা কেজি দামে।

 

 

মন্তব্য