kalerkantho

বুথ জালিয়াতিতেও ‘হিডেন কোবরা’

এস এম আজাদ   

৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বুথ জালিয়াতিতেও ‘হিডেন কোবরা’

অর্থনৈতিক সেক্টরে কুখ্যাত উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গ্রুপ ‘হিডেন কোবরা’ই বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে ব্যাংকের অটোমেটেড টেলার মেশিনে (এটিএম) জালিয়াতি করে বুথ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মিশনে নেমেছে। এই অপকর্মকে তারা ‘ফাস্ট ক্যাশ ক্যাম্পেইন’ নাম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে হিডেন কোবরার এই পরিকল্পনার ব্যাপারে আগাম তথ্য পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এক সপ্তাহেরও আগে এই তথ্য পেয়ে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার নজরদারি জোরদার করে। পাশাপাশি ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষকেও জালিয়াতির ব্যাপারে সতর্ক করে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকারও বেশি রিজার্ভ চুরিতে হিডেন কোবরার নাম উঠে আসে।

এদিকে ডাচ্-বাংলার ঘটনার পর অন্য সব ব্যাংকের এটিএম বুথেও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নতুন করে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ওই ঘটনার আগেই ঈদের ছুটির সময় এটিএম বুথে নিরাপত্তা বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একযোগে কয়েকটি বুথ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল হ্যাকারদের। তারা যে ডিজিটাল কার্ডটি ব্যবহার করে, সেখানে ম্যালওয়ারের বিশেষ প্রযুক্তি আছে, যা মেশিনে প্রবেশ করালে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে ভেরিফিকেশন বন্ধ হয়ে যায়। তখন মেশিনটিকে যে অর্ডার করা হয়, সেটি তা-ই করে। আগাম তথ্য থাকায় খিলগাঁওয়ে বুথ থেকে টাকা তুলতে গিয়ে ধরা পড়ে ইউক্রেনের এক নাগরিক। এরপর আটক হয়েছে আরো পাঁচ ইউক্রেনীয়। এতে থামানো গেছে বড় ধরনের জালিয়াতি। আদালতের নির্দেশে গ্রেপ্তারকৃত ইউক্রেনের ছয় নাগরিককে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি।

জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোল্ল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি বিদেশি গোয়েন্দা সূত্রে আমরা এটিএম বুথে জালিয়াতির আগাম তথ্য পাই। এটি নিয়ে তদন্ত করার পাশাপাশি আমরা ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে আগেই সতর্ক করি। এ কারণেই চক্রটি ধরা পড়ে। এখন তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে পাচারের নেটওয়ার্কের ব্যাপারে তদন্ত করা হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য পেয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের সিস্টেম হ্যাক করে সেখান থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচারের পাঁয়তারা চলছিল বলে তথ্য পায় তদন্তকারীরা। গত বুধবার ডাচ্-বাংলা ব্যাংককে প্রাথমিকভাবে সতর্ক করে সিআইডি। জালিয়াতি প্রতিরোধে করণীয় ঠিক করতে সিআইডি পরদিন ডাচ্-বাংলার সঙ্গে বৈঠকও করে। ব্যাংকের হেড অব অল্টারনেট ডেলিভারি চ্যানেল (এডিসি) মশিউর রহমান ও হেড অব আইটি সিকিউরিটি ডিভিশন শেখ শাকিল আহম্মেদ ওই বৈঠকে ছিলেন। গত শনিবার ডাচ্-বাংলা ব্যাংক সিআইডিকে জানায়, আগের দিন ৩১ মে (শুক্রবার) রাতে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতচক্রের দুই সদস্য এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নিয়ে গেছে। সিআইডির পরামর্শ অনুযায়ী সারা দেশে ডাচ্-বাংলার বুথগুলোতে ফের সতর্কতা জারি করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার রাতে খিলগাঁওয়ের তালতলা মার্কেটের সামনের বুথে মুখোশ আর টুপি পরে টাকা তুলতে গিয়ে ধরা পড়ে দুই বিদেশি। নিরাপত্তাকর্মী জালাল দুজনকে আটকানোর চেষ্টা করলেও একজন পালিয়ে যায়। পরে ইউক্রেনের অপর নাগরিক দেনিশ ভিতোমস্কিকে আটক করেন তিনি। খবর পেয়ে সেখানে যায় স্থানীয় থানার পুলিশ ও গোয়েন্দা পুুলিশের দল। ধরা পড়া ব্যক্তির দেওয়া তথ্যে পান্থপথের ওলিও ড্রিম হ্যাভেন হোটেলে অভিযান চালিয়ে ভালেনতিন সোকোলোভস্কি, ভালোদিমির ত্রিশেনস্কি, নাজারি ভজনোক, সের্গেই উইক্রাইনেৎস ও আলেগ শেভচুক নামে পাঁচজনকে আটক করা হয়। আর ভিতালি ক্লিমচাক নামে আরেকজন পালিয়ে যায়। তাদের কাছ থেকে ম্যাগনেটিক কার্ডসহ কিছু ডিভাইস জব্দ করা হয়। হোটেল কর্তৃপক্ষ জানায়, ৩০ মে ইউক্রেনের সাত নাগরিক হোটেলের অষ্টম তলার ৮০৫ ও ৮০৭ নম্বরের দুটি কক্ষ ভাড়া নেয়। তারা দিনের বেলা ঘন ঘন বাইরে বের হতো ও প্রবেশ করত।

সিআইডির তদন্তকারীরা বলছেন, বিশেষ কার্ডটির ম্যালওয়ার দিয়ে মেশিনটি হ্যাক করে চক্রটি। এর ফলে মূল সার্ভার থেকে মেশিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর কোনো তথ্য মূল সার্ভারে যায় না। আগে কার্ড ক্লোন করে জালিয়াতি করা হলেও এভাবে হ্যাকিংয়ের ঘটনা দেশে আগে ঘটেনি।’

ডিবি ও সিআইডির সূত্র জানায়, গতকাল ইউক্রেনের ছয় নাগরিকের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন ঢাকা মহানগর হাকিম ধীমান চন্দ্র মণ্ডল। ইউক্রেনের এই নাগরিকরা ভালো ইংরেজি বলতে পারে না। এই গ্রুপে সাতজনই ছিল। সূত্র জানায়, গ্রুপ হিডেন কোবরায় বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিক আছে। তারা এক শর বেশি দেশে এটিএম বুথে জালিয়াতির জন্য হ্যাকিং কার্ড তৈরি করেছে।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুবুল আলম বলেন, ‘এরা ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে ঢুকেছে মূলত ব্যাংকের বুথ থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিতে। বাংলাদেশে এদের কোনো সহযোগী আছে কি না সে ব্যাপারে তদন্ত চলছে।’

সব ব্যাংকের বুথে নিরাপত্তা জোরদার

গতকাল সোমবার সকাল থেকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বন্ধ রাখা এটিএম বুথগুলো সচল করার কাজ শুরু হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে রবিবার বিকেল থেকে এসব বুথ বন্ধ রাখা হয়েছিল। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদের ছুটির কারণে এটিএম বুথগুলো শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ডাচ্-বাংলার জনসংযোগ কর্মকর্তা এইচ এম সাগির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই ঘটনার পর এটিএম বুথ দুই ঘণ্টার মতো বন্ধ রাখা হয়। এর পরই বিভিন্ন জায়গায় তা চালু করে দেওয়া হয়েছে। যেগুলো বাকি ছিল সেগুলোও আজকের (সোমবার) মধ্যে চালু করা হবে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল রাত পর্যন্ত অনেক স্থানেই ডাচ্-বাংলার বুথ বন্ধ ছিল। আবার কিছু বুথে নেটওয়ার্ক সমস্যার কথাও জানিয়েছে গ্রাহকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথে যেটি ঘটেছে, তা এক ধরনের দুর্ঘটনা। এর জন্য ব্যাংকগুলোকে আলাদা নির্দেশনা দেওয়ার কিছু নেই। ঈদের ছুটি উপলক্ষে আমরা আগেই ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছি।’  

ডাচ্-বাংলার ঘটনার পর এটিএম বুথগুলোর নিরাপত্তা বাড়িয়েছে কমবেশি সব ব্যাংকই। সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ঘটনার কারণে নয়, নিয়মিত কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে আমাদের সব এটিএম বুথে নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা