kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

ঋণখেলাপিদের গণসুবিধা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের অভিমত

খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বাড়বে

খেলাপিদের সঙ্গে ব্যাংকের মালিকরাও লাভবান হবেন
বিনা পরিশ্রমে ব্যাংক মালিকদের পকেটে ঢুকবে ৮০ হাজার কোটি টাকা

জিয়াদুল ইসলাম   

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বাড়বে

ঋণখেলাপিদের গণসুবিধা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতিমালা জারি করেছে সেটাকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট কয়েকজন অর্থনীতিবিদ। তাঁদের মতে, খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্দেশ্যে এ ধরনের সুবিধা দেওয়া হলেও বাস্তবে খেলাপি ঋণ না কমে বরং বাড়তে পারে। এর ফলে ঋণখেলাপি ও ব্যাংকের মালিক উভয়ই লাভবান হবেন। আর ঝুঁকিতে পড়বে আমানতকারীরা। এতে ব্যাংকের ঋণ-সংস্কৃতি ও ঋণ-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। পাশাপাশি মানুষের ব্যাংকে আমানত রাখার অভ্যাসেও ভাটা পড়তে পারে। এ ছাড়া ভালো ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা আইওয়াশ ছাড়া কিছুই নয় বলেও মন্তব্য করেন তাঁরা।

খেলাপিদের গণসুবিধা দিয়ে গত বৃহস্পতিবার ঋণ পুনঃ তফসিলের একটি বিশেষ নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আওতায় ছোট, মাঝারি ও বড় সব খেলাপিই ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ পাবেন। আগামী ১০ বছর মেয়াদে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবেন খেলাপিরা। আগের অনারোপিত সব সুদও মাফ করে দেওয়া হবে।  সুবিধা গ্রহণকারীরা ব্যাংক থেকে আবার নতুন করে ঋণ নিতে পারবেন। এ সুবিধা নিতে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে খেলাপিদের আবেদন করতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো গ্রাহকদের প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে আলাদা সার্কুলারে। তাতে বলা হয়েছে, ভালো ঋণগ্রহীতাদের পরিশোধিত সুদের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ রিবেট বা মওকুফ করা হবে। এ ছাড়া পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে সনদ, প্রকাশ করা হবে তাঁদের ছবি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেস্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের সুবিধা কোনো সুখবর বয়ে আনবে না। এর ফলে খেলাপি ঋণ না কমে বরং বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আওতায় ঋণখেলাপিরা ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছর ঋণ পরিশোধের সময় পাবেন। এই দীর্ঘ সময় দেওয়াটার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।’ তিনি আরো বলেন, প্রচলিত যে আইন আছে তার আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া এবং সেই ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব যেন না খাটানো হয় সেটি নিশ্চিত করা দরকার।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের সুবিধা দেওয়ার ফলে ঋণখেলাপি ও ব্যাংকের মালিক উভয়ই লাভবান হবেন। কারণ বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে মন্দমানের ঋণ রয়েছে ৮০ হাজার কোটি টাকা। যখনই সার্কুলার বাস্তবায়িত হবে তখন এই ৮০ হাজার কোটি টাকা নিয়মিত করা হবে। এর ফলে ব্যাংকের যে লাভ হবে তা হলো—এই ৮০ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে সংরক্ষিত প্রভিশন মুনাফার খাতে নিয়ে যাওয়া হবে, যা ব্যাংক মালিকদের পকেটেই ঢুকবে। বিনা পরিশ্রমে ৮০ হাজার কোটি টাকা তাঁরা লাভ করে নেবেন। অন্যদিকে ঋণগ্রহীতাদের যে লাভ হবে তা হলো—তাঁরা ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে নিয়মিত গ্রাহক হয়ে যাবেন। এরপর ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে অসুবিধা হবে না। ১০ বছরে অন্তত পাঁচ থেকে ১০ গুণ বেশি নতুন ঋণ নেবেন তাঁরা। এই নতুন ঋণ অ্যাকাউন্টে আসা মাত্রই ডাউনপেমেন্টের ২ শতাংশ অর্থ তাঁরা তুলে নেবেন। এরপর তাঁরা ব্যবসার নামে নতুন ঋণের টাকা হজম করতে শুরু করবেন। এভাবে ১০ বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা বের করে নেবেন এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আবার খেলাপি হয়ে যাবেন। এর ফলে আবার বিপদে পড়বে ব্যাংকগুলোই। তবে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে সাধারণ আমানতকারীরা। ব্যাংক ফাঁকা হয়ে গেলে তাদের আমানত ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। শুধু তা-ই নয়, এটা করতে গিয়ে আমানতের সুদহারও কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। এর ফলে ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি কমবে। এতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে টানাপড়েন সৃষ্টি হবে, যার প্রভাব পড়বে সার্বিক অর্থনীতিতে।’  

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে তা হলো খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা। কিন্তু এর ফলে খেলাপি ঋণ কমবে বলে মনে হয় না। পূর্বের অভিজ্ঞতা তাই বলে। ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিয়ে ঋণখেলাপি কমানো—এটা কোনো স্ট্র্যাটেজির মধ্যে পড়ে না। পুরোপুরি অবাস্তব ব্যাপার।’ তিনি বলেন, ‘এর আগেও ঋণখেলাপিদের সুবিধা ও ছাড় দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালে যেসব খাত পুনর্গঠন সুবিধা নিয়েছিল, ওই সব খাতকে এবারও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো অবস্থায়ই পুনরায় তাঁদের এ ধরনের সুবিধা দেওয়া কাম্য হতে পারে না। একই সঙ্গে আবার ভালো ঋণগ্রহীতাদের পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমি বলব, এটা আইওয়াশ ছাড়া কিছুই নয়। যাতে ভালো ঋণগ্রহীতারা বলতে না পারেন, আমরা ঠিকমতো ঋণ শোধ করেও কিছুই পেলাম না। তবে আমার মনে হয়, ঋণখেলাপিদের গণসুবিধা দেওয়ার ঘোষণার কারণে ভালো ঋণগ্রহীতারা রিবেট সুবিধা রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হতে উৎসাহিত হবেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শুনতে পেয়েছি, ঋণের টাকা ফেরত আসছে না। কারণ তারাও দেখছে, ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ৯ শতাংশ সুদে পরিশোধের সুযোগ মিলছে। এই সুবিধা নিতে তখন ভালোরাও ঋণখেলাপি হতে চাইবে। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা যেটি হবে তা হলো—এর ফলে ঋণ-সংস্কৃতি ও ব্যাংকের ঋণ-শৃঙ্খলা একদমই ভেঙে পড়বে। কারণ ব্যাংকের টাকা নিয়ে ফেরত না দিলে ব্যাংকই একসময় ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেবে। এর ফলে মানুষের ব্যাংকে আমানত রাখার অভ্যাসও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। উল্টো আজকের সমস্যাটাকে আগামীকালের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ সুবিধা দেওয়ার ফলে হয়তো ব্যাংকের প্রভিশন রাখতে হবে না। এতে তাঁদের তারল্য সংকট কিছুটা কাটবে। কিন্তু খেলাপির সমস্যা তো রয়েই যাবে, যারা বছরের পর বছর ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়নি। অর্থাৎ সমাধানের মধ্যে সংকট অন্তর্নিহিত থেকে যাবে। তাই এটা সমাধানের অংশ না হয়ে সংকটের অংশ হয়ে যাবে। কাজেই খেলাপি সংস্কৃতি কমাতে সংশ্লিষ্ট যে আইন আছে সেগুলো যুগোপযোগী করে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’  

মন্তব্য