kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

প্রাক-বাজেট আলোচনায় সম্পাদকদের দাবি

ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফেরান

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফেরান

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাশাপাশি আর্থিক কেলেঙ্কারির লাগাম টেনে ধরার তাগিদ দিলেন দেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদকরা। ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের অনিয়ম এবং অরাজকতা বন্ধ করে এই দুই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সংবাদপত্র টিকিয়ে রাখতে এই খাতে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন সাংবাদিকরা। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর পাচার হয়ে যাওয়া টাকা ফেরত আনতে অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন একাধিক সম্পাদক। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রের সুদের হার না কমানোর অনুরোধও ছিল অর্থমন্ত্রীর কাছে।

আলোচনায় সম্পাদকদের আশ্বস্ত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পুঁজিবাজারে খেলোয়াড়দের খেলার দিন শেষ। আমরা আর মানুষের গালি শুনতে চাই না। ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে অনাচার ও অবিচার দূর হবে। জনগণ সুবিচার পাবে। জনগণের টাকা সংরক্ষণের অধিকার সরকার পুরোপুরি নিশ্চিত করবে।’ আসছে বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমছে না বলেও সাফ জানিয়ে দেন অর্থমন্ত্রী।

আসছে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট তৈরির আগে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার অংশ হিসেবে গতকাল প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদক, সাংবাদিক, এনজিও নেতারা এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যনির্বাহী কমিটির সঙ্গে আলোচনায় বসেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদারের সঞ্চালনায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম, সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরীসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশে ফ্লাইওভার নির্মাণের প্রতিযোগিতা চলছে। একটা ফ্লাইওভার নির্মাণ করার অর্থ হলো একটা সড়কের অস্তিত্বকে শেষ করা। যে সড়ককে ঘিরে ছিল সংস্কৃতি, যোগাযোগ, বাণিজ্য, বৈভব; একটা ফ্লাইওভার নির্মাণের মধ্য দিয়ে এসব কিছু শেষ হয়ে যায়। যে উদ্দেশ্যে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়, সে উদ্দেশ্য যদি সফল হতো, তাতে কিছু বলার থাকত না। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। যানজট কমছে না বরং বাড়ছে। মগবাজার ও সোনারগাঁও হোটেলের সামনে উড়াল সড়কের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘উড়াল সড়কে ওঠা যায়, কিন্তু নামা যায় না। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে বাংলামোটর যেতে আধাঘণ্টা সময় লাগে।’ সারা দেশে উড়াল সড়ক নির্মাণ নিরুৎসাহী করতে অর্থমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা।

ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, একদিকে বিদেশি চ্যানেলগুলো দেশের বিজ্ঞাপন দেখিয়ে টাকা নিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ই-জিপি (ইলেকট্রনিক প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম) চালুর পর থেকে দরপত্র আহ্বান করতে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে ঠিকই; অন্যদিকে পত্রিকার আয়ও কমে গেছে। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনের আকার ছোট হয়ে গেছে। তিনি পত্রিকার আয় বাড়াতে অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রণোদনার দাবি জানান।

প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, সংবাদপত্রশিল্প সংকটের মধ্য দিয়ে পার করছে। বিজ্ঞাপন থেকে আয় কমে যাচ্ছে। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সংবাদপত্রের পাঠক কমে যাচ্ছে। ফলে আয় কমছে। অনলাইনেও এখনো তেমন আয় হচ্ছে না। মতিউর রহমান বলেন, ‘১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনে সংবাদপত্র ভ্যাটমুক্ত থাকলেও এই খাতে আমরা ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিয়ে যাচ্ছি। এটা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংবাদপত্রের জন্য এই হারে ভ্যাট প্রযোজ্য হতে পারে না।’ করপোরেট কর কমানোর দাবি করেন তিনি। মতিউর রহমান বলেন, পোশাকশিল্পে করপোরেট কর যেখানে ১০ শতাংশ, সেখানে সংবাদপত্রশিল্পের জন্য ৩৯ শতাংশ। এটা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না।

মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই টাকা বাংলাদেশে ফেরত আনার উদ্যোগ গ্রহণ করতে অর্থমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ করেন তিনি। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রের সুদের হার না কমানোরও দাবি করেন। পাশাপাশি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি যেসব পরামর্শ দেয়, সেগুলোর সমালোচনা না করে তা গ্রহণ করা যায় কি না, তা ভেবে দেখার কথাও বলেন মতিউর রহমান চৌধুরী।

বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম অভিযোগ করেন, বর্তমান ব্যাংকিং খাতে কোনো দায়বদ্ধতা নেই। মনে হচ্ছে কিছু মানুষকে সুবিধা দেওয়া ও নেওয়ার জন্য ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এখানে যাকে ইচ্ছা তাকে ঋণ দেওয়া হয়। পরে আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। নঈম নিজাম বলেন, পুঁজিবাজারে এখন সংকট চলছে। সেখান থেকে ইউটার্ন নেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রচুর বড়লোক আছে। কিন্তু তারা কর দেয় না। যারা কর দেয়, তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাদের আতঙ্ক দূর করতে হবে।’ এ ছাড়া বিমানবন্দরে শ্রমিকদের নানা হয়রানির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধে বিকল্প চিন্তা করতে হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে রাশেদা কে চৌধুরী শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান। বদিউল আলম মজুমদার ব্যাংক খাতে দুর্নীতি বন্ধের দাবি করেন।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য

সবার বক্তব্য শুনে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, ‘আমাদের ব্যাংক খাত খুব ভালো আছে সেটা বলব না। আবার খুব খারাপও আছে সেটাও বলব না। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে আমরা বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, নতুন করে আর খেলাপি ঋণ দেখবেন না।’ অর্থমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশ খুঁজে পাবেন না যেখানে ঋণের সুদের হার ১০ থেকে ১৬ শতাংশ। এই কারণে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনেকে শোধ করতে পারেন না। ফলে তিনি হয়ে যান ঋণখেলাপি। এত বেশি সুদে ঋণ নিয়ে কেউ শিল্প করতে পারে না। তাঁর মতে, সুদের হার কমলে এমনতিই খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমে যাবে।

পুঁজিবাজার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজারে অনিয়ম তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই করে। সামনে বাজেট। শেয়ারের দাম এখন বাড়ার কথা। উল্টো কমছে। এখানে একটা পার্টি আছে, যারা সিংহ। আরেক পার্টি ছাগলের বাচ্চা। পুঁজিবাজার হয় নিজে থেকে ঠিক হবে, না হয় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, এখানে না বুঝে অনেকে বিনিয়োগ করে। শেয়ারবাজার সম্পর্কে না বুঝে আসবেন না। আসলেও লম্বা সময়ের জন্য আসুন। বিদেশে টাকা পাচার সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘টাকা যেখানে আপ্যায়ন পাবে, সেখানেই যাবে। কে টাকা পাচার করছে তা আমরা জানি না।’ সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমবে না বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তবে সংস্কার করা হবে। যাদের জন্য এই সুযোগ তারাই পাবে। যারা অন্যায়ভাবে সঞ্চয়পত্র থেকে সুবিধা নিচ্ছে, সেটা বন্ধ করা হবে।

 

মন্তব্য