kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস আজ

নির্মূলে বাধা হতে পারে ‘ওষুধ প্রতিরোধী’ ম্যালেরিয়া!

মৃত্যু কমলেও প্রকোপ ১৩ জেলায়। এক দশক ধরে একই ধরনের কর্মসূচিতে ঘুরছে সরকারি কার্যক্রম

তৌফিক মারুফ   

২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নির্মূলে বাধা হতে পারে ‘ওষুধ প্রতিরোধী’ ম্যালেরিয়া!

মৃত্যু কমেছে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে, তবু সময়মতো ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্য পূরণ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। বিশেষ করে ওষুধ প্রতিরোধী ম্যালেরিয়া ঠেকাতে কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না এখনো। একই সঙ্গে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিও কমছে না প্রত্যাশিত হারে। এখনো ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব আছে দাপটের সঙ্গেই। আর ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে আছে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ মানুষ। এক দশক ধরে একই ধরনের কর্মসূচির মধ্যে আটকে আছে ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোতে ম্যালেরিয়া রেজিস্ট্যান্সের মাত্রা দ্রুত বাড়ছে। এর ওষুধ যেমন কাজ করছে না, আবার বাহক মশা তাড়ানো ওষুধেও মশা নিবৃত্ত হচ্ছে না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এর সঙ্গে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া নির্মূলে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে দুর্গম পার্বত্য এলাকাগুলোতে দ্রুত রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা দিতে না পারা এবং আন্তঃ সীমান্ত পারাপারকারীদের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের প্রবণতার বিষয়গুলো। এ ছাড়া কোনো কোনো দেশে পরীক্ষামূলকভাবে ম্যালেরিয়ার ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু হলেও তা নিয়ে বাংলাদেশে এখনো কোনো পরিকল্পনা নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারেই এখনো দেশের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর এবং কুড়িগ্রামে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ রয়েছে বেশি। এ জেলাগুলোর মধ্যে তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি হচ্ছে দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এবং পাহাড় ও বনাঞ্চলবেষ্টিত। এর ফলে এসব অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি। দেশের মোট ম্যালেরিয়া রোগীর ৯১ শতাংশই ওই তিনটি অঞ্চলে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দেশে আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস।

জানতে চাইলে জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির অন্যতম বেসরকারি অংশীদার ব্র্যাকের পরিচালক (সংক্রামক রোগ) ড. আকরামুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রয়েছে, তা একসঙ্গে নির্মূল করা সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি অঞ্চলে জনগোষ্ঠীর ধরন ও মানুষের শরীরের বৈশিষ্ট্য আলাদা। আপাতত আমরা তিন পার্বত্য জেলাকে ম্যালেরিয়া নির্মূলে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যে আমরা কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছি। এ ক্ষেত্রে সমন্বিতভাবে কাজের বিকল্প নেই। এরই মধ্যে সরকারের উদ্যোগে চলমান মশারি বিতরণ, রোগনির্ণয়, মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক স্প্রে, বাড়ি বাড়ি পর্যবেক্ষণ, আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ আরো কিছু কার্যক্রম চলছে। সচেতনতামূলত নানা কর্মসূচি তো আছেই।’ তিনি জানান, ২০০৮ সালের তুলনায় ম্যালেরিয়া রোগীর সংখ্যা এখন ৮৮ শতাংশ কমেছে আর মৃত্যুর হার কমেছে প্রায় ৯৫ শতাংশ। গত বছর (২০১৮ সালে) সর্বমোট ১০ হাজার ৫২৩ জন ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে আর আক্রান্তদের মধ্যে মারা গেছে মাত্র সাতজন।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র-আইসিডিডিআরবি’র ম্যালেরিয়া কার্যক্রমের গবেষক ওয়াসিফ আলী খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ম্যালেরিয়া নিমূর্লে সরকারি-বেসরকারি যেসব উদ্যোগ চলছে তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঠিকই আছে, তবে ভবিষ্যতের পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। কারণ সামনে ম্যালেরিয়ার সবচেয়ে বড় ভয় হচ্ছে দুই ধরনের রেজিস্ট্যান্স। একটা হচ্ছে আক্রান্ত রোগীর শরীরে ওষুধ কাজ না করা, আরেকটি হচ্ছে মশার ওষুধে মশা নিবৃত না হওয়া। আশপাশের দেশগুলোতে এই সমস্যাটি প্রকট। এর সঙ্গে পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যেও এই রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি প্রবল। কারণ প্রচলিত সাধারণ আরডিটি বা মাইক্রোসকপিক টেস্টে রেজিস্ট্যান্ট ম্যালেরিয়া ধরা কঠিন। এ জন্য আরো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্যারাসাইড কালচারে মনোযোগ দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ওই গবেষক বলেন, ‘আমাদের দেশের জলবায়ুর ধরন-ধারণ অনুসারে এর আগেও বহুবার দেখা গেছে কোনো মৌসুমে কোনো রোগের প্রকোপ কম থাকে আবার কোনো বছরে হঠাৎ করেই প্রকোপ বেড়ে যায়। ফলে এখন যে কমে আছে, সেটা যখন তখন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’ তবে জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রগ্রাম ম্যানেজার ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরাও আগে রেজিস্ট্যান্সের কথা শুনেছিলাম। যা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। কিন্তু এর ফলাফলে বাংলাদেশে রেজিস্ট্যান্সের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আর মশারির সঙ্গে যে কীটনাশক থাকে সেটাও ঠিকভাবে কাজ করছে না।’

তিনি জানান, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকার জনগোষ্ঠীর মাঝে ২০০৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত এক কোটি ছয় লাখ ৯ হাজার দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ করা হয়েছে।

কর্মসূচি : জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি সূত্র জানিয়েছে, এবারই প্রথমবারের মতো সারা দেশের ৬৪টি জেলায় একযোগে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস পালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে শোভাযাত্রা, আলোচনাসভা, স্বাস্থ্য ক্যাম্প ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী এবং বেসরকারি ও সরকারি টেলিভিশনে বিশেষ টক শো। বিশেষ করে আজ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সকাল সাড়ে ৮টায় গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট থেকে একটি শোভাযাত্রা শুরু হয়ে সিরডাপ মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হবে। এ ছাড়া সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনাসভা। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-বাংলাদেশ, বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও অন্য সহযোগী সংস্থাগুলো যৌথভাবে এসব আয়োজন করছে।

মন্তব্য