kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

সচিবালয়ে নির্মাণাধীন ভবনে আইন ভেঙে অফিস চালু

দ্বিতীয় তলা যেন ‘মৃত্যুকূপ’

বাহরাম খান   

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




সচিবালয়ে নির্মাণাধীন ভবনে আইন ভেঙে অফিস চালু

বাংলাদেশ সচিবালয়ের ১১ নম্বর ভবনের নির্মাণকাজ শেষ না হতেই সেখানে অফিস করছেন কর্মীরা। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

পাশের ভবনটি ৭ নম্বর। এ ভবনের তিন ও চারতলা থেকে ফুট ওভারব্রিজ ধরনের দুটি সিঁড়ি যুক্ত হয়েছে নির্মাণাধীন ১১ নম্বর ভবনের সঙ্গে। নতুন এ ভবনটি হবে ২০ তলা। ৭ নম্বর ভবন থেকে নতুন ভবনের তিনতলায় যাওয়ার পর দোতলায় নামতে গিয়ে আর সিঁড়ি পাওয়া গেল না। জানা গেল, দোতলায় যাওয়ার একমাত্র উপায় লিফট। ওই ফ্লোরে অর্থ বিভাগের ফিন্যানশিয়াল সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের (এফএসএমইউ) অফিস।

নির্মাণাধীন এ ভবনটি হলো বাংলাদেশ সচিবালয়ের, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ। মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অফিস সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। দোতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত পাঁচটি ফ্লোরে ইতিমধ্যে অফিস চালু হয়ে গেছে। প্রায় তিন শ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন সেখানে। চলতি মাসের শেষের দিকে সাততলায় অফিস শুরু হবে বলে জানিয়েছেন ভবন প্রকল্পের পরিচালক ও ইডেন ভবন গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হাসান ইবনে সিরাজ।

কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, বহুতল ভবন তৈরির পর তাদের ছাড়পত্র ছাড়া ভবনে কাজ শুরু করার নিয়ম নেই।

উল্লেখ্য, গত ২৮ মার্চ এ ভবন থেকে পড়ে একজন শ্রমিক মারা গেছে। একই দিন বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ আগুনের ঘটনার কারণে বিষয়টি তেমন আলোচনায় আসেনি। কিন্তু তদন্ত করার জন্য কমিটি করা হয়েছে।

গত ১১ এপ্রিল সচিবালয়ে গিয়ে নতুন এ ভবনে সরেজমিন ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে। ভবনের দোতলায় এফএসএমইউর সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট আবদুল বাতেনের কক্ষে গিয়ে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বনানীর আগুনের ঘটনার পর থেকে খুব উদ্বেগে দিন পার করছি। বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যেও আলোচনা করেছি আমরা।’

পাশের কক্ষে গিয়ে কথা হয় তিন কর্মকর্তার সঙ্গে। তাঁরা কেউ নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তিনজনই বলছিলেন, ‘খুব আতঙ্কে’ আছেন জানিয়ে তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করেছেন। একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘আপনি ঘুরে দেখলেই বুঝবেন এ ভবন একটা বদ্ধ খোঁয়াড়। মৃত্যুকূপ তৈরি হচ্ছে। বারান্দা নেই, হাঁটা-চলার পর্যাপ্ত জায়গা নেই—আধুনিক যুগে এমন ভবন হয় নাকি।’ তিনি জানালেন, বাথরুমগুলোতে কোনো ভেন্টিলেশন নেই, সব কল দিয়ে ঠিকমতো পানি আসে না।

সরেজমিনে জানা গেছে, ভবনটির তিনতলা থেকে সাততলায় যাওয়ার জন্য সিঁড়ি আছে। কিন্তু কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সাততলা থেকে সরাসরি বের হওয়ার সুযোগ নেই। প্রথমে তিনতলা বা চারতলায় নেমে আসতে হবে। এরপর পাশের ভবনের সঙ্গে যুক্ত ‘ফুট ওভারব্রিজ’ হয়ে বেরিয়ে আসতে হবে।

নির্মাণাধীন ভবনে কাজ শুরু করার বিষয়ে জানতে চাইলে ইডেন ভবন গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সচিবালয়ে

বসার জায়গার খুব সমস্যা। তাই নিয়ম না থাকার পরও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী নির্মাণাধীন ভবনে অফিসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ তিনি জানান, প্রতিটি ফ্লোরে ৫০-৬০ জন কাজ করছেন। একেকটি ফ্লোরের আয়তন ১১ হাজার বর্গফুট।

এরপর দোতলা থেকে লিফটে সাততলায় যাওয়ার পর কথা হয় একজন যুগ্ম সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা শিল্পী বড়ুয়ার সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত সপ্তাহে ফাইল সিল করার জন্য পাশের কক্ষে সিসা গলানো হচ্ছিল। আমার নাকে পোড়া গন্ধ আসতেই আগুন আতঙ্কে অফিস সহকারী ফারুকসহ দ্রুত বের হয়ে যাই। পরে বুঝতে পারি এটা সিসা পোড়ার গন্ধ। তখন যেন প্রাণ ফিরে পেলাম।’

পাঁচতলায় গিয়ে কথা হয় অর্থ বিভাগের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা (অতিরিক্ত সচিব) সামীম আহমদ খানের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এটা তো খুবই আধুনিক ভবন হচ্ছে। সব কাজ শেষ হলে দেখবেন খুব সুন্দর লাগবে।’

নতুন এ ভবনে কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা রয়েছে। দোতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত ঘুরে তিনটি ফ্লোরে ফায়ার এস্টিংগুইসারের দেখা মিলেছে। দুইটি ফ্লোরে নেই। প্রতিটি ফ্লোরে সিঁড়ি ও লিফটের সঙ্গে সামান্য একটু খালি জায়গা রাখা হয়েছে। সচিবালয়ের বহুতল আরেকটি ভবন ৬-এ বাইরের দিকে বারান্দা না থাকলেও ভেতরে হাঁটা-চলার লম্বা পথ আছে, যা সবগুলো সিঁড়ির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু নতুন এই ভবনটিতে কক্ষ বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে ঘুর-পেছানোর পথে বিভিন্ন কক্ষে যেতে হয়। কোনো দুর্ঘটনায় দ্রুত বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনো ফ্লোরেই দেখা যায়নি ফায়ার এক্সিটের দিকনির্দেশনা।

২০০৩ সালের ‘অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ’ আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী যেকোনো ভবন নির্মাণ শেষে আনুষ্ঠানিক ব্যবহার শুরুর আগে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। ইডেন ভবন গণপূর্ত বিভাগের একাধিক প্রকৌশলী দাবি করেছেন, এ আইন সরকারি সংস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক সালেহ্্উদ্দিন বললেন, আইনের কোথায়ও সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করা হয়নি।

অর্থ বিভাগের সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বিদেশে থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ) তাহমিনা বেগম গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভবনটির সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বারবার প্রকৌশলীদের সঙ্গে বৈঠক করছি, তাগিদ দিচ্ছি।’ দোতলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটা সিঁড়ি আছে, শিগগিরই সেটা খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা নেব আমরা।’

 

মন্তব্য