kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

বায়োমেট্রিক প্রতিবেদন ধরবে চিকিৎসক কর্মচারীর ফাঁকি

তৌফিক মারুফ   

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বায়োমেট্রিক প্রতিবেদন ধরবে চিকিৎসক কর্মচারীর ফাঁকি

চিকিৎসকসহ সরকারি সব চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সরকার এবার নয়া কৌশল প্রয়োগ করছে। এই কৌশলের আওতায় এখন থেকে চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিকসসহ সংশ্লিষ্ট অন্য সহযোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিসংশ্লিষ্ট সব কাজে কর্মস্থলের বায়োমেট্রিক উপস্থিতি প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিশেষ করে ওই প্রতিবেদন ছাড়া কারো বদলি, পদোন্নতি, ছুটি, চাকরি স্থায়ীকরণ, নিয়মিতকরণ, প্রেষণ, বিদেশে প্রশিক্ষণ-কনফারেন্সে যাওয়ার আবেদন করা যাবে না বা অনুমোদনও মিলবে না।

স্বাস্থ্যসচিব আসাদুল ইসলাম সম্প্রতি নিজেই এসংক্রান্ত এক পরিপত্র জারি করেছেন। এতে বলা হয়েছে, দেশের জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর। এ জন্য চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিকসসহ অন্য সহযোগী কর্মচারীদের আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, চাকরি স্থায়ীকরণ, নিয়মিতকরণ, প্রেষণ, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ-কনফারেন্সে অংশগ্রহণ, অর্জিত ছুটি অনুমোদনের ক্ষেত্রে আবেদন দাখিল ও অগ্রগামী করার (ফরোয়ার্ডিং) জন্য বায়োমেট্রিক হাজিরার তথ্য উল্লেখ করতে হবে। এ ছাড়া

বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রেও বায়োমেট্রিক হাজিরা বিবেচনায় নেওয়া হবে। সেই সঙ্গে আবেদনকারীর এইআরআইএস হালনাগাদ ডাটা আবেদনের সঙ্গে দাখিল করতে হবে।

এদিকে এর আগে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দফায় দফায় বিভিন্ন কৌশল নেওয়া হয়েছিল, যার কোনোটিই ফলদায়ক বা টেকসই হয়নি। এমনকি মাঠপর্যায়ে বিপুল টাকা খরচ করে বায়োমেট্রিক যন্ত্র স্থাপন করা হলেও অনেক জায়গায়ই ওই যন্ত্র ভেঙে ফেলা, নষ্ট করে ফেলা, এমনকি না লাগানোরও অভিযোগ আসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে।

স্বাস্থ্যসচিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চিকিৎসাকেন্দ্রে কোনো অবস্থায়ই কোনো চিকিৎসক-নার্স কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের অননুমোদিত কোনো অনুপস্থিতি গ্রহণ করা যাবে না। আমরা এটাকে এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মনিটর করছি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার এইচপিএনএসডিপির (স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা, পুষ্টি খাত উন্নয়ন কর্মসূচি) অর্থ থেকে দেশের সব উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে একটি করে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বায়োমেট্রিক মেশিন স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এরপর প্রতিটি যন্ত্র ৩০০ ডলার করে কেনা হয়। বিশেষ সেন্সরযুক্ত ওই মেশিনগুলো ব্যবহার করে তাত্ক্ষণিকভাবে ঢাকায় বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে কোন ডাক্তার কখন তাঁর কর্মস্থলে উপস্থিত হয়েছেন তা শনাক্ত করা সম্ভব।

সব ডাক্তারের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রবেশ করেই প্রথমে ওই যন্ত্রের নির্দিষ্ট সেন্সরে নিজের আঙুল স্পর্শ করতে হবে এবং কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও একই কাজ করতে হবে। এ ছাড়া চুরি ঠেকাতে লোহার খাঁচার নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতর প্রতিটি যন্ত্র রাখা হয়। তবে এক দিক থেকে যন্ত্র বসানো এবং আরেক দিক দিয়ে তা নষ্ট করে ফেলার ধারাবাহিক কিছু ঘটনার পটভূমিতে শেষ পর্যন্ত সব উপজেলায় ওই মেশিন স্থাপন করা হয়নি।

কোথাও দেখা গেছে, যে স্থানটুকু দিয়ে আঙুল পুশ করে সেন্সর স্পর্শ করা হয় ঠিক ওই অংশটুকুই ভেঙে বা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে—এমন প্রমাণও মিলেছে তদন্তের সময়। এমনকি কেবল মেশিন নষ্ট করাই নয়, যেসব স্থানে এখনো ওই যন্ত্র স্থাপন করা হয়নি সেগুলোতে যাতে স্থাপন করা না হয় সে জন্যও নানা তৎপরতা চালানো হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে অভিযানের পর চিকিৎসকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়টি বেশ আলোচিত হয়। দুদকের মতে, প্রায় ৪০ শতাংশ চিকিৎসক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। এর আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টান্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনেও উঠে আসে এমন চিত্র।

স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করা সরকারেরই একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, নিয়োগের কিছুদিন যেতে না যেতেই বেশির ভাগ চিকিৎসক নানা কৌশলে উপজেলা পর্যায়ের কর্মস্থল ছেড়ে ছুটে যান ঢাকা কিংবা আশপাশের এলাকায়। ফলে গ্রামের ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়ে চিকিৎসকের অভাবে।

পরিস্থিতির মুখে নতুন চিকিৎসকদের নিয়োগ-পরবর্তী কর্মস্থলে যোগদান অনুষ্ঠানগুলোতে রীতিমতো গ্রামে থাকার জন্য শপথ করানো হয়। আবার নিজ জেলায় নিয়োগের পদ্ধতিও চালু করা হয়েছিল উপস্থিতি সহজীকরণের জন্য। চাকরির প্রথম দুই বছর গ্রামে থাকার ক্ষেত্রেও বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। আরো নানা রকম কৌশল করেও খুব একটা লাভ হচ্ছিল না। সর্বশেষ গত ২৭ জানুয়ারি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে চিকিৎসকদের মাঠপর্যায়ে অনুপস্থিতির বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করে কঠোর ভাষায় নির্দেশ দেন। এর পরই নতুন কৌশল খুঁজতে শুরু করেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, গত কয়েক মাসে ডাক্তারদের উপস্থিতির অনেক উন্নতি ঘটেছে। মনিটরিং ব্যবস্থা আগের তুলনায় কঠোর করার সুফল দেখতে পাচ্ছি।

মন্তব্য