kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশ

শুল্কমুক্ত ও ঋণ সুবিধা অব্যাহত চায় বাংলাদেশ

আরিফুর রহমান, নিউ ইয়র্ক থেকে   

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শুল্কমুক্ত ও ঋণ সুবিধা অব্যাহত চায় বাংলাদেশ

আফ্রিকার দেশ কেপ ভার্দে ২০০৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার পর বেশ বিপাকেই পড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে কম সুদে ঋণ পাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাও হারিয়েছে। দেশটির অর্থনীতি এখন টালমাটাল অবস্থা। কেপ ভার্দের মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশের যাতে না হয় সে জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উন্নত বিশ্বের কাছে জোর দাবি জানানো হয়েছে, যাতে উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার পরও বাংলাদেশের জন্য সব ধরনের সুবিধা অব্যাহত থাকে। জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের বছর অর্থাৎ ২০৩০ সাল পর্যন্ত সব ধরনের সুযোগ সুবিধা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) চতুর্থ ‘উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন’ (এফএফডি) ফোরামের অধিবেশনে এ দাবি জানানো হয়।

গতকাল দুপুরে নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ প্লাজার মিলেনিয়াম হিল্টনে ‘এলডিসি থেকে উত্তরণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামো ও এসডিজি বাস্তবায়ন’ শিরোনামে একটি সেমিনারের আয়োজন করে যৌথভাবে বাংলাদেশ, কেপ ভার্দে স্থায়ী মিশন, অরগানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) এবং ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আংকটার্ড)। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মনোয়ার আহমেদের সঞ্চালনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন জাতিসংঘে নিযুক্ত কেপ ভার্দের স্থায়ী প্রতিনিধি হোসে লুইস ফিয়ালহো রোচা, আংকটার্ডের মহাসচিব মুখিসা কিটুয়ি, ওইসিডির পরিচালক জর্জ মরিরা দ্য সিলভা এবং জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির প্রধান রোনাল্ড মোলেরাস।

মূল প্রবন্ধে নজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে বিশ্বব্যাংকের মতো বহুজাতিক সংস্থাগুলো থেকে কম সুদে ঋণের পরিমাণ কমে যাবে। উন্নত দেশ থেকে সরকারিভাবে দেওয়া সহযোগিতা (ওডিএ) কমে যাবে। অথচ বাংলাদেশ এসডিজি বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। উন্নত বিশ্ব থেকে সহযোগিতা কমে গেলে বাংলাদেশের জন্য এসডিজি বাস্তবায়ন বেশ কঠিনই হবে। তিনি উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশের জিডিপির ২ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও আমাদের জন্য আর্থিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা জরুরি।

সেমিনার শেষে নজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত বিশ্বে আমরা এখন যেসব বাণিজ্য সুবিধা পাই, উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে আমরা সেসব সুবিধা হারাব। এসব সুবিধা যাতে আমাদের জন্য অব্যাহত থাকে, আমরা সেই অনুরোধ  করেছি। তারা বিষয়গুলো বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে।

গতকালের সেমিনারে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে বড় আঘাত আসবে। জিএসপি সুবিধা হারাবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে রপ্তানিতে বিশেষ ভর্ভূকি দেওয়ার যে সুযোগ পেয়ে আসছে বাংলাদেশ, সেটি আর থাকবে না। রপ্তানি করা পণ্যে অতিরিক্ত ৬.৭ শতাংশ শুল্ক বসবে। এতে বছরে রপ্তানি কমবে ২৭০ কোটি ডলার বা প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ এখন যেমন মেধাস্বত্বের মাধ্যমে বিদেশ থেকে ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করে সেটি বিদেশে রপ্তানি করে, সে সুবিধাও আর থাকবে না। ২০২১ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশও রপ্তানি শুল্কমুক্ত সুবিধা, কম সুদে ঋণসহ সব ধরনের সুযোগ সুবিধা হারাবে।

ইআরডি সচিব মনোয়ার আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, একটা দেশ বহু কষ্ট করে সব ধরনের যোগ্যতা অর্জনের পর স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হলো। তারপর দিন বলে দেওয়া হলো, ওই দেশের জন্য সব সুযোগ-সুবিধা বন্ধ। এটা পুুরস্কারের বদলে শাস্তি।

সেমিনারে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, নিউ ইয়র্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের ইকোনমিক মিনিস্টার ইকবাল আবদুল্লাহ হারুন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম সচিব আনোয়ার হোসেনসহ অন্যরা।

কেপ ভার্দের স্থায়ী প্রতিনিধি নিজ দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে সদ্য উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর উত্তরণ পথ মসৃণ এবং টেকসই করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পদক্ষেপসমূহ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। এক্ষেত্রে জাতিসংঘ, উন্নয়ন অংশীদার ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমন্বয়ে উত্তরণ সময়ের জন্য একটি ‘ট্রানজিশন সাপোর্ট টিম’ প্রণয়নের কথাও তুলে ধরেন তিনি। আংকটার্ডের মহাসচিব মুখিসা কিটুয়ি উত্তরণ টেকসই করতে ডিজিটাল ইকোনমি সৃষ্টির কথা বলেন। দেশগুলোর ই-কর্মাসের প্রস্তুতি, সক্ষমতা বিনির্মাণের ওপর জোর দেন তিনি।

জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির প্রধান রোনাল্ড মোলেরাস উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর জন্য একটি কনসালটেটিভ মেকানিজম তৈরি করার কথা বলেন। এই কনসালটেটিভ মেকানিজম সংশিষ্ট দেশ, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামোর সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে, যা ওই দেশগুলোর উন্নয়ন চাহিদা নিরূপণ করে এর সঠিক তথ্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরবে।

মন্তব্য