kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

অপরিকল্পিত নগরায়ণ এখনই বন্ধ হোক

নিয়ামুল কবীর সজল ময়মনসিংহ    

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অপরিকল্পিত নগরায়ণ এখনই বন্ধ হোক

আজকের ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ২৩২ বছর আগে, ১৭৮৭ সালে। দিনে দিনে সেই শহর সম্প্রসারিত হয়েছে। ১০ বছরে বেড়েছে ঝড়ের গতিতে। এই গতির পালে আরো হাওয়া লেগেছে শহরকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করায়। কিন্তু নগরবাসীর ভয় অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে।

১০-১৫ বছরে শহরে ইচ্ছামাফিক ভবন গড়ে উঠছে। ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। পুকুর জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে। যেখানে-সেখানে গড়ে উঠছে বিপণিবিতান। মার্কেটের ওপর গড়ে উঠছে বসতবাড়ি। সারি সারি দোকানপাটের আকার-আয়তনের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। একই অবস্থা বাড়িঘরেরও। অলিগলিতে নেমে এসেছে বাসার সিঁড়ি। পাকা দোকানপাট বসছে ছোট-বড় নালার ওপর।

নগরায়ণের প্রভাবে শহরের ফাঁকা জায়গাগুলোয় এখন আর এলাকার শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ নেই। একইভাবে হারিয়ে গেছে শহরের পাড়া-মহল্লার বিরাটাকার পুকুরগুলোও। পুকুরের এই শহরে এখন পুকুরের সংখ্যা হাতে গোনা।

শহরের সচেতন নাগরিকরা এমন অপরিকল্পিত নগরায়ণে উদ্বিগ্ন। তাঁদের মতে, এখনই এ প্রবণতা বন্ধ হওয়া দরকার। তাঁদের প্রত্যাশা আগামী দিনে যিনি নগরপিতা হবেন তিনি অবশ্যই পরিকল্পিত নগরায়ণের দিকে নজর দেবেন।

পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রত্যাশা :  সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য মতে, পৌরসভা থেকে নকশা অনুমোদন করালেও সেটা মানেননি অনেক বাড়ির মালিকই। প্রভাবশালীদের তদবির, লোকবলের অভাবের কারণে পৌর কর্তৃপক্ষও আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেনি তাদের বিরুদ্ধে।

পৌরসভা ও সড়ক বিভাগের সড়কগুলোর দুই পাশ দখল হচ্ছে বেপরোয়াভাবে। অনেক সড়ক অপ্রশস্ত হয়ে গেছে। অনেক মোড় সংকীর্ণ হয়ে গেছে। অনেক ফুটপাত দখল হয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো প্রশস্তও করা হয়নি। রাস্তাঘাট এখন একেবারেই চলাচলের অনুপযোগী। দখলবাজির কারণে পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা পুরোপুরি বেহাল। শহরতলিতেও ব্যাপকভাবে নির্মিত হচ্ছে বাড়িঘর। এসব বাড়িঘরও নির্মিত হচ্ছে মালিকদের ইচ্ছা মতো। রাস্তা নেই, নালা নেই। হ-য-ব-র-ল অবস্থা সেখানে।

ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমীন কালাম মনে করেন, অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ একসময় শহরে বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দেবে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সকলের ভালোর জন্য একটি পরিকল্পিত শহর গড়ে তোলা দরকার। নইলে ভূমিকম্প বা অন্য কোনো দুর্যোগে আমাদের বড় ধরনের মাশুল দিতে হবে।’

জানা গেছে, শহর পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে ময়মনসিংহ স্ট্রাটেজিক ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান নামের মহাপরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে জরিপ চালানোর পর তৈরি হয় এ মহাপরিকল্পনা। তিন বছর আগে সেটা প্রকাশ করা হয়। মহাপরিকল্পনাটি এখন গেজেট হওয়ার অপেক্ষায়। ২০৩১ সালের মাঝে এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা। তবে সংশয়ও আছে সেই মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে।

পুকুর আর খেলার মাঠ যেন হারিয়ে না যায় : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, একসময়ে ময়মনসিংহে পাড়াভিত্তিক ক্লাব ছিল। সকাল-বিকেল ছেলেরা এলাকার ক্লাবের সামনে বা কাছাকাছি খোলা জায়গায় খেলাধুলা করত। এখন কোনো পাড়াতেই আর খালি জায়গা নেই। নতুন নতুন ভবন গড়ে উঠেছে। তাই খেলাধুলার সুযোগও আর নেই।

ময়মনসিংহের একজন পুরনো ক্রীড়া সংগঠক হলেন বিপ্লব কুমার গুহ মানিক। তিনি থাকেন শহরের মহারাজা রোডে। আশপাশে বড় মাঠ না থাকায় তিনি রেলওয়ে সেতুর নিচের ব্রহ্মপুত্র নদের চরে ছেলেদের ক্রিকেট অনুশীলন করান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, এলাকায় বড় ও ভালো মাঠ না থাকায় চরই এখন তাঁর বড় ভরসার জায়গা।

একসময়ে শহরের স্কুল-কলেজগুলোর মাঠ ছিল শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ। ক্লাস শেষে বিকেলবেলা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে স্থানীয় ছেলেরা খেলাধুলা করত। আনন্দ মোহন কলেজ, জিলা স্কুল ছাত্রাবাস ও নাসিরাবাদ কলেজ মাঠে এখনো খেলা হয়। কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠিত বেশির ভাগ স্কুল-কলেজেরই নিজস্ব মাঠ নেই।

ময়মনসিংহ জেলায় খেলাধুলায় গৌরবময় অবস্থানে আছে ময়মনসিংহ মহিলা ডিগ্রি কলেজ। কলেজের ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর রেহেনা আক্তার ডলি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিজেদের মাঠ ছিল বলেই আমরা খেলাধুলায় ভালো করছি।’

শহরের পুরনো বাসিন্দা এবং স্থানীয় ইতিহাস সংশ্লিষ্ট বইপত্র সূত্রে জানা যায়, একসময় প্রতিটি মহল্লাতেই পুকুর ছিল। এমন কি স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত চত্বরেও পুকুর ছিল। স্বাধীনতার পরও আমলাপাড়া পুকুর, গোলপুকুর, হাজিবাড়ী পুকুর, বিদ্যাময়ী স্কুলের পেছনের পুকুর, নওমহল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুকুর, বাসাবাড়ী পুকুর, পচাপুকুর, পণ্ডিতবাড়ী পুকুর, কাচারি পুকুর, সিকে ঘোষ রোড প্রেস ক্লাবসংলগ্ন পুকুর, সেহড়া পুকুর, সুতিয়াখালী লজ পুকুরসহ অনেক পুকুরের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু অনেক পুকুরই বৈধ মালিক অথবা অবৈধ দখলদাররা ভরাট করে ফেলেছে।

এলাকাবাসীর প্রতিবাদও রক্ষা করতে পারেনি—এমন উদাহরণ শহরের কালীবাড়ী রোডের (এস কে হাসপাতালের পেছনে) পুকুরটি। সেটি এখন পুরোপুরি মাঠ। গত কয়েক বছরে প্রশাসনের নাকের ডগায় বেসরকারি ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের সামনের কাচারি পুকুরটির প্রায় অর্ধেক ভরাট হয়েছে। নওমহল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের পুকুরটিও ভরাট করা হয়েছে।

শহরের একাধিক বাসিন্দা বলেন, পুকুরগুলো রক্ষায় সরকারি ভূমি দপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। পুকুর রক্ষায় শহরের সুধীসমাজ ও নাগরিকরাও জোরালোভাবে তৎপর নয়।

‘পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলন’ সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ শাহাব উদ্দিন বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। তাঁরা আশা করেন শহরের পুকুরগুলো রক্ষায় সিটি করপোরেশন প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখবে।

ময়মনসিংহের পরিবেশবাদী সংগঠন ‘প্রেরণা’র সভাপতি ফরহাদ হাসান খান বলেন, ‘শহরের পুকুরগুলো যেভাবে হোক রক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারি জমিতে পুকুর নতুন করে খনন করতে হবে।’

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় মেয়র প্রার্থী ইকরামুল হক টিটু বলেন, ময়মনসিংহ স্ট্রাটেজিক ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান নিয়ে তাঁরা আশাবাদী। সিটি করপোরেশন হওয়ার কারণে পরিকল্পিত নগর গড়ে তুলতে আগের চেয়ে নজরদারি ও তদারকি অবশ্যই বাড়বে।

টিটু বলেন, একটি আধুনিক শহরের জন্য খেলার মাঠ থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় পুকুর থাকতে হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা