kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৭ রবিউস সানি ১৪৪১     

জাগ্রত হোক শুভবোধ

নওশাদ জামিল   

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জাগ্রত হোক শুভবোধ

রাত পোহালেই বাংলা নতুন বছর শুরু। পুরনো দিনের গ্লানি-ব্যর্থতা মুছে সব কিছু নতুন করে শুরুর প্রত্যাশা সবার। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের নেজামপুর ইউনিয়নের টিকইল আদিবাসী গ্রামের দাসু বর্মণের স্ত্রী দেখন বর্মণ নিজ বাড়ির দেয়াল-বারান্দায় নিজের হাতে বিভিন্ন রং দিয়ে আঁকছেন ফুল, পাখি, নদী, প্রকৃতির আলপনা। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : সালাহ উদ্দিন

চারদিকে বড় নৈরাজ্য, অস্থিরতা। আগুন সন্ত্রাসে কাঁপা জনপদ। যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, খুনসহ নানা অঘটন যেন লাগামছাড়া। অস্থির এ সময়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতি থেকে বিদায় নিচ্ছে বসন্ত। দরজায় কড়া নাড়ছে খরতাপের গ্রীষ্ম, পহেলা বৈশাখ।

আজ শনিবার, চৈত্রসংক্রান্তি। আজ বিদায় নেবে বঙ্গাব্দ ১৪২৫। ঝরা পাতার মতো ঝরে যাবে আরেকটি বছর। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় ‘বর্ষ হয়ে আসে শেষ, দিন হয়ে এলো সমাপন,/চৈত্র অবসান—/গাহিতে চাহিছে হিয়া পুরাতন ক্লান্ত বরষের/সর্বশেষ গান।’ আজকের সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যাবে আরেকটি বছর। বিদায়ী সূর্যের কাছে ‘জীর্ণ পুরাতন’ ভেসে যাওয়ার এবং সব গ্লানি মুছে যাওয়ার প্রণতি জানাবে আজ বাঙালি। আগামীকাল পূর্ব দিগন্তে ভোরের আলো রাঙিয়ে স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর সম্ভাবনায় সূচিত হবে নতুন বছর। পুরনো বছরকে বিদায় আর নতুনকে বরণ করে নিতে দেশজুড়ে চলছে নানা প্রস্তুতি।  বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনে সাজিয়েছে চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষবরণের আয়োজন।

জানা যায়, বাংলা বর্ষপঞ্জির শেষ মাস চৈত্রের নামকরণ হয়েছিল চিত্রা নক্ষত্রের নামে। আবহমানকাল থেকে এই জনপদে বছরের শেষ দিনটি দান, স্নান, ব্রতসহ বিভিন্ন মাঙ্গলিক আচার-অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে পালনের রীতি চলে আসছে। বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশেষ উপাদানে পরিগণিত হয়েছে চৈত্রসংক্রান্তির এসব আয়োজন।

বছরের বিদায়বেলায় মানুষ সাধারণত অতীতের সব গ্লানি, ব্যর্থতা, রোগ-শোক, বালা-মুসিবত থেকে মুক্তির প্রত্যাশা করে। মনে আশা থাকে নতুন বছর বয়ে আনবে সুখ, শান্তি, সচ্ছলতা। এর ওপর ভিত্তি করেই কৃষিভিত্তিক এই জনপদে চৈত্রসংক্রান্তির আচার-আয়োজনগুলোর উদ্ভব হয়েছিল। চৈত্রের দহন আরো তীব্র হয় গ্রীষ্মে। সঙ্গে ঝড়-ঝাপটার দাপট। এসব থেকে রক্ষা পেতে সূর্যকে স্তুতি করে তুষ্ট রাখাই ছিল চৈত্রসংক্রান্তির লোকাচারের মূল ভাবনা।

আবহমান কাল থেকেই চৈত্রসংক্রান্তিতে গ্রামে, গঞ্জে, শহরে নানা আয়োজন থাকে। গানের দল সুরের ধারা আজ সন্ধ্যায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে আয়োজন করেছে ‘চৈত্রসংক্রান্তি’ বা বর্ষবিদায় উৎসব। বিশিষ্ট শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নেতৃত্বে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত শিল্পীরা পরিবেশন করবেন সমবেত সংগীত, একক সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য ও নৃত্যনাট্য। থাকবে শিশু শিল্পীদের পরিবেশনাও। এ ছাড়া রাজধানীতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন চৈত্রসংক্রান্তির অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

আগামীকাল থেকে হিসাবের খাতায় বসবে নতুন সংখ্যা ১৪২৬। নতুন বছরের আবাহনে মানুষের মাঝে শুভবোধ জাগ্রত করার আহ্বান জানাবে বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব পহেলা বৈশাখ। শুভ দিন সামনে রেখে, মানুষের মধ্যে শুভবোধ জাগাতে রাজধানীর সংস্কৃতি অঙ্গনে দেখা গেছে ব্যাপক প্রস্তুতি।

বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে এবারও থাকছে নানা উৎসবের আয়োজন। চিরায়ত সংস্কৃতি ও আবহমান বাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি বর্ষবরণের উৎসবে থাকছে নতুন কিছু আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ছায়ানট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, সুরের ধারাসহ নানা প্রতিষ্ঠান নিয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।

প্রকৃত বাঙালি হওয়ার শপথ নিয়ে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাংলা নববর্ষের প্রথম প্রভাতে রাজধানীর রমনার বটমূলে সংগীতায়োজন করে আসছে ছায়ানট। ২০০১ সালে রমনা বটমূলে উগ্রবাদীদের বোমা হামলাও রুখতে পারেনি এ আয়োজনকে।

গতকাল শুক্রবার সকালে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন মিলনায়তনে বর্ষবরণের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে অংশ নেয় সংগঠনটি। সামাজিক সব অনাচারের বিরুদ্ধে মানুষের মনে শুভবোধ জাগিয়ে তোলার মানস নিয়ে ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে বরণ করবেন এ সংগঠনের শিল্পীরা। ‘অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ’—এই আহ্বান নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের রমনার বটমূলের প্রভাতি আয়োজন। পহেলা বৈশাখ সকাল সোয়া ৬টায় বছরের প্রথম সূর্যোদয়কে স্বাগত জানানো হবে রাগালাপ দিয়ে। প্রত্যুষে থাকছে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ও সৃষ্টির মাহাত্ম্য নিয়ে ভোরের সুরে বাঁধা গানের গুচ্ছ। পরের ভাগে থাকছে অনাচারকে প্রতিহত করা এবং অশুভকে জয় করার জাগরণী সুরবাণী, গান-পাঠ-আবৃত্তিতে দেশ-মানুষ-মনুষ্যত্বকে ভালোবাসবার প্রত্যয়। জাতীয় সংগীত গেয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানার আগে ছায়ানটের সভাপতি শুভবোধ জাগরণের আহ্বান জানাবেন তাঁর কথনে। ছায়ানটের এ আয়োজন সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থকে অনুষ্ঠান দেখা যাবে ছায়ানটের ইউটিউব চ্যানেলে (bit.ly/chhayanaut)।

ছায়ানটের শিল্পীদের প্রস্তুতি মহড়ায় অংশ নিয়েছেন ছায়ানটের সহসভাপতি খায়রুল আনাম শাকিল, সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, এ টি এম জাহাঙ্গীরসহ শতাধিক শিল্পী। তাঁদের পাশে থেকে প্রেরণা জোগাচ্ছেন সন্জীদা খাতুন।

আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পর্কে লাইসা আহমেদ লিসা বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। পহেলা বৈশাখ সকাল সোয়া ৬টায় অসিত কুমার দের রাগালাপে শুরু হবে আয়োজন। থাকবে সমবেত ও একক গান। থাকবে আবৃত্তি। এবার ছায়ানটের বড় ও ছোটদের দল সমবেত কণ্ঠে গেয়ে শোনাবে ১২টি গান। আর ১৫ জন শিল্পী একক কণ্ঠে গাইবেন নিজেদের গান।’

বর্ষবরণের আরেকটি বৃহৎ আয়োজন চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা। এবার এ আয়োজন ৩০ বছরে পা দিচ্ছে। তাই আরো বর্ণাঢ্য পরিসরে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রস্তুতি ব্যাপক হলেও এবারের শোভাযাত্রাটির চলাচলের পরিসর ছোট হবে। চারুকলার সামনে থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে ফিরবে শোভাযাত্রার যাত্রীরা। অনন্য এ আয়োজনকে ২০১৬ সালে ইউনেসকো অপরিমেয় বিশ্ব সংস্কৃতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

গতকাল বিকেলে চারুকলা অনুষদ ঘুরে দেখা যায়, মঙ্গল শোভাযাত্রা উপলক্ষে সেখানে উৎসবমুখর পরিবেশ, তুমুল কর্মব্যস্ততা। এ বছর চারুকলার ২১তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা শোভাযাত্রার প্রস্তুতি তদারকি করছে। ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’ বাণীকে শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পহেলা বৈশাখ সকাল ৯টায় এ শোভাযাত্রা শুরু হবে।

সুরের ধারা ও চ্যানেল আই যৌথভাবে এবারও আয়োজন করেছে পহেলা বৈশাখের ভিন্নধর্মী আয়োজন। হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণের এ আয়োজনে উপস্থিত থাকবেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। পহেলা বৈশাখে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে অষ্টমবারের মতো আয়োজিত হবে এ উৎসব।

সুরের ধারার চেয়ারম্যান শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলেন, ‘প্রতিবছর অনেক শিল্পীকে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। কারণ এক হাজারের বেশি শিল্পী অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে দশম বর্ষ থেকে এক হাজার ৫০০ শিল্পীর অংশগ্রহণে বর্ষবরণ উদ্‌যাপন করব।’

সুরের ধারার বর্ষবরণ উৎসবের এবারের প্রতিপাদ্য ‘লোকজ সুরে বাংলা গান’। এতে থাকবে দেশের জনপ্রিয় নবীন ও প্রবীণ শিল্পীদের পরিবেশনার পাশাপাশি চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ, ক্ষুদে গানরাজ, গানের রাজা ও বাংলার গানের শিল্পীদের পরিবেশনা। এতে নৃত্য পরিবেশন করবেন চ্যানেল আই সেরা নাচিয়ের শিল্পীরা। আরো পরিবেশিত হবে এক দল তরুণীর অংশগ্রহণে ফ্যাশন শো ও মঙ্গল শোভাযাত্রা।

ছায়ানট, চারুকলা অনুষদ, সুরের ধারা শুধু নয়, বৈশাখে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান। শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন আয়োজন করছে বৈশাখের বর্ণিল উৎসব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা