kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

সুপারিশবিলাসেই ঘুরপাক খাচ্ছে সড়ক-শৃঙ্খলা

পার্থ সারথি দাস   

২৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সুপারিশবিলাসেই ঘুরপাক খাচ্ছে সড়ক-শৃঙ্খলা

১৯৯৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদের ২৬টি বৈঠক হয়েছে। বেশির ভাগ সভায় বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল অনুপযুক্ত ও পুরনো গাড়ি উচ্ছেদের বিষয়টি। এরই মধ্যে গত ১০ বছরে সরকারের পক্ষে ঢাকা মহানগরী থেকে ফিটনেসবিহীন গাড়ি উচ্ছেদ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে দফায় দফায়।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ বৈঠকেও ঢাকার মতো দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বাস ও ট্রাকের আয়ুষ্কাল নির্ধারণসহ অনুপযুক্ত গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযানের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ঢাকায় সিটিং সার্ভিসসহ গণপরিবহনে সুষ্ঠু যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটি ২০১৭ সালে ২৬ দফা সুপারিশ তৈরি করে। তাতেও ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করার বিষয়টি ছিল।

এর আগে একই লক্ষ্যে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যানকে প্রধান করে ১১ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল।

গত বছর ২৯ জুলাই দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানির পর টানা ৯ দিন নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা। ওই সময় তাদের ৯টি দাবির মধ্যে একটি ছিল ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলতে পারবে না। তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিআরটিএকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বিআরটিএর পরিসংখ্যান থেকেই এর প্রমাণ মেলে। সংস্থার তথ্য অনুসারে, গত বছরের আগস্টে দেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ছিল চার লাখ। গত বুধবার পর্যন্ত তা বেড়ে হয়েছে পাঁচ লাখ ১১ হাজার ৩৪৮টি।

এ অবস্থায় সড়কে শৃঙ্খলা আনয়ন ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়নে গঠিত ২২ সদস্যের কমিটি ১১১টি সুপারিশ তৈরি করেছে। এর মধ্যে ৫৪ নম্বর সুপারিশে ত্রুটিপূর্ণ গাড়ির চলাচল নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে।

সড়কে প্রাণহানির বড় একটি কারণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি। গত মঙ্গলবার রাজধানীর প্রগতি সরণিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীর প্রাণ কেড়ে নেওয়া ‘সুপ্রভাত’ পরিবহনের বাসটির (ঢাকা মেট্রে-ব-১১-৪১৩৫) ফিটনেস ছিল না। অথচ ঢাকা মহানগর পুলিশের চোখের সামনেই চলছিল গাড়িটি। এবারও নিরাপদ সড়ক দাবির আন্দোলনে ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধের দাবি ওঠে।

ফিটনেসবিহীন গাড়ি উচ্ছেদে সুপারিশের পর সুপারিশ করে আসছে বিভিন্ন স্তরের বিশেষজ্ঞ কমিটি; কিন্তু সমস্যার সুরাহা হচ্ছে না।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ ও জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল বন্ধসহ নিরাপদ সড়কব্যবস্থার জন্য গত আট বছরে ২৪০টি সুপারিশ করেছে এসংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটি। এর বাইরে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকেও ২১টি সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরের আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৭টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর আগে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিশেষ পাঁচটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে যুক্ত কমপক্ষে ৩২টি সংস্থা।

এসব সংস্থার মধ্যে অন্যতম বিআরটিএ। এর বর্তমান চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান এর আগে ছয় বছর একই সংস্থার এনফোর্সমেন্ট শাখার পরিচালক ছিলেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন সড়ক পরিবহন আইন করা হয়েছে। তাতে শাস্তি ও জরিমানা বেশি। বিধিমালা করা শেষ হলে মাঠপর্যায়ে আইনটি প্রয়োগ করা যাবে। তাতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এ ছাড়া আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি।’

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর আগস্টে ঢাকায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি ছিল দুই লাখ ১৬ হাজার। চলতি মাসে তা বেড়ে হয়েছে দুই লাখ ৩০ হাজার ৫৮২টি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের জেরে ফিটনেসের জন্য বিআরটিএর বিভিন্ন কার্যালয়ে চালকদের ভিড় বাড়লেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের অধীন জাইকার সমীক্ষা অনুসারে, ঢাকায় ৭২ শতাংশ যাতায়াত হয় বাসে। বিআরটিএর হিসাবে ঢাকায় চলাচল করে আট হাজার বাস। এর ৮৮ শতাংশের ফিটনেস নেই।

ফিটনেস সনদ নিতে ৬০টি বিষয় যাচাই করে নিতে হয় বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শকের কাছ থেকে। তবে ফিটনেস পরীক্ষার জন্য ঢাকার মিরপুরেই শুধু মোটরযান পরিদর্শন কেন্দ্র আছে। যেখানে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কারিগরি ও বাহ্যিকভাবে ৬০টি বিষয় যাচাই করা হয়। বাকি সব কার্যালয়ে চোখে দেখে সনদ দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে বিআরটিএর মিরপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ফিটনেস) মো. মোরশেদুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাত্র ১০৩ জন মোটরযান পরিদর্শক দিয়ে খুব কষ্টে সেবা দিতে হচ্ছে।’

চাহিদা অনুসারে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলা হলেও এ ক্ষেত্রে অদক্ষতা ছাড়াও আছে ঘুষ বাণিজ্য। অভিযোগ আছে, বিআরটিএ কার্যালয়ে গাড়ি হাজির না করেও ফিটনেস সনদ নেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা ও চালকের ড্রাইভিং পরীক্ষা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ জন্য নীতিমালা করা হচ্ছে। এ জন্য গত ৩ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ১৪ সদস্যের একটি কমিটি করেছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (প্রশাসন) আহ্বায়ক করে এ কমিটি করা হয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নীতিমালা তৈরি করার কথা ছিল। কিন্তু একাধিক বৈঠক হলেও নীতিমালা চূড়ান্ত হয়নি।

এদিকে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় সড়কে শৃঙ্খলা আনয়ন ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি। এ কমিটি ১১১টি সুপারিশ তৈরি করেছে। কমিটির আহ্বায়ক সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘সুপারিশমালা বাস্তবায়নে এক বা একাধিক ট্রাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবও জুড়ে দেওয়া হবে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে।’

জানা গেছে, এ কমিটি আগামী ৪ এপ্রিলের মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেবে।

কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে আগের বিভিন্ন কমিটির সুপারিশ দেখেছি। একই সুপারিশ ঘুরেফিরে গুরুত্ব পেয়েছে; কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। এ জন্য সুপারিশমালা চূড়ান্তভাবে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন পেলে আমরা তা বাস্তবায়নের জন্য টাস্কফোর্স গঠন করব।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা