kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবাধিকার পরিষদে প্রস্তাব গৃহীত

এবারও ভোট মিলল না কাছের প্রতিবেশীদের

মেহেদী হাসান   

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এবারও ভোট মিলল না কাছের প্রতিবেশীদের

৪৭ সদস্যের জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ গতকাল শুক্রবার রাতে ৩৭-৩ ভোটে রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার ইস্যুতে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। মিয়ানমার ওই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মাত্র তিনটি ‘না’ ভোট পেয়েছে। বরাবরের মতো এবারও চীন বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া অপর দুটি দেশ হলো ফিলিপাইন ও কিউবা। নীতিগত অবস্থানের কারণে ভারত, নেপাল, জাপান, অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, কঙ্গো ও সেনেগাল—এই সাতটি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো অবস্থান না নিয়ে ভোটে ‘অনুপস্থিত’ থেকেছে।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ নিকটতম প্রতিবেশী ভারত, চীন ও জাপানের আরো কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করে আসছে। ওই দেশগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিক বিভিন্ন বৈঠকেও রোহিঙ্গা ইস্যু গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। তবে জেনেভায় গত রাতের ভোটকে ঘিরে ওই দেশগুলোর বক্তব্যে আবারও প্রতিফলিত হয়েছে যে তারা রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চাইলেও সরাসরি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে না। অতীতে মানবাধিকার পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভোটের সময়ও তাদের এই অবস্থান দেখা গেছে।

গৃহীত প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের জন্য দায়ীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক কাঠামো যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ওই প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের ‘রাষ্ট্রহীনতা’ দূর করতে মিয়ানমারকে তার ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন এবং আনান কমিশনের সুপারিশগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ সব ধরনের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর প্রস্তাবে জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবে এ দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘকে মিয়ানমার সরকারের সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে তাঁর সংস্থার মিয়ানমারে কার্যক্রম পর্যালোচনার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।

৩০ দফা প্রস্তাবের শুরুতেই রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যসহ পুরো দেশেই যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, শিশুদের অধিকার লঙ্ঘনসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অব্যাহত খবরে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এসব সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর লঙ্ঘনে মিয়ানমারের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সম্পৃক্ততার উল্লেখ করে অনতিবিলম্বে তা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। উদ্বেগ জানানো হয়েছে রাখাইনে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আরাকান আর্মির লড়াই নিয়েও।

প্রস্তাবে মিয়ানমার সরকারকে তাদের দেশের সবার মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান স্থান পেয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো জাতীয়, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক আদালতে কিংবা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর ‘গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ বিচারের জন্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণে গঠিত কাঠামোর কাজ দ্রুত শুরু করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া মিয়ানমার সরকারকে সত্যানুসন্ধানী কমিশন, স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ও জাতিসংঘ কাঠামোকে পূর্ণ প্রবেশাধিকার ও সহযোগিতা দেওয়ার আহ্বান রয়েছে প্রস্তাবে।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক, টেকসই ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ার ওপর জোর দিয়ে ওই প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারকেও যুক্ত করার আহ্বান প্রস্তাবে স্থান পেয়েছে।

মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের তথ্যদাতাদের সুরক্ষা এবং রয়টার্সের দুই সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতেও প্রস্তাবে আহ্বান জানানো হয়েছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাবে চীনের আবারও বিরোধিতা অনেকটা অনুমেয় ছিল। গত রাতে ভোটের আগে চীনের রাষ্ট্রদূত প্রস্তাবে ‘আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) সংক্রান্ত রোম সংবিধিকে সমর্থন ও আইসিসিকে তদন্তে আমন্ত্রণ জানানোর আহ্বানের’ ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে চীন আবারও স্পষ্ট করেছে যে মিয়ানমার পরিস্থিতি তদন্তে আইসিসিকে দায়িত্ব দেওয়ার যেকোনো উদ্যোগ নিরাপত্তা পরিষদে উঠলে দেশটি তার বিরোধিতা করবে।

অন্যদিকে ভোটের পর ভারতের প্রতিনিধিও প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে অনুপস্থিত থাকার কথা জানিয়ে মানবাধিকার পরিষদে মিয়ানমারের এ যাবৎ নেওয়া উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানায়। ভারতের প্রতিনিধি বলেন, মিয়ানমারকে আইসিসির মুখোমুখি করার হুমকি হিতে বিপরীত হবে।

ভোটের আগে জাপানের প্রতিনিধি মিয়ানমার নিয়ে প্রস্তাবের ব্যাপারে উদ্বেগ জানান। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মানবাধিকারবিষয়ক আলোচনায় রাখাইন, শানসহ পুরো দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের আহ্বান জানিয়েছে জাপান।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পক্ষে রুমানিয়া গতকাল ওই প্রস্তাব আনে। রুমানিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে ভয়াবহতম অপরাধ নিয়ে মানবাধিকার কমিশনের কাজ করার সুযোগ আছে বলে ইইউ মনে করে।

প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম শামীম আহসান রোহিঙ্গা গণহত্যার কথা উল্লেখ করে বলেন, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পরিবেশ ও সামাজিক পুনর্মিলনের অঙ্গীকার মিয়ানমার এখনো পূরণ করেনি।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে একে একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রস্তাব এনে মিয়ানমারের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। রাখাইনের একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ওই প্রস্তাব আনা হয়েছে। এই প্রস্তাব মিয়ানমারের সমাজে আরো সমস্যা সৃষ্টি করবে। এই সংকটের জন্য আবারও রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসকে দায়ী করেছে মিয়ানমার।

চীনের রাষ্ট্রদূতও সন্ত্রাসের নিন্দা জানান। জাতিসংঘের তহবিল ঘাটতির উল্লেখ করে তিনি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব এনে তহবিল নষ্ট না করার আহ্বান জানান।

রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইন নিয়েও প্রস্তাবটিতে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা