kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

গাছার মূর্তিমান আতঙ্ক শহীদ

শরীফ আহেমদ শামীম গাজীপুর   

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গাছার মূর্তিমান আতঙ্ক শহীদ

মাদকদ্রব্য, যৌন ও জুয়ার কারবার, জমি দখলের সঙ্গে জড়িত তিনি। তাঁর যে কেবল সংযোগের (ডিশ) ব্যবসা সেটাও দখল করে নেওয়া। আর হামলা-জখমের অভিযোগ তো আছেই। শহীদ মণ্ডল (৩২) সম্পর্কে এ হলো পুলিশের ভাষ্য। মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি, ফরসা এই মানুষটি সব সময় পরিপাটি পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে থাকেন। গতবছর হজও পালন করে এসেছেন। এই যুবলীগ নেতাকে দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি কতটা ভয়ংকর। গাজীপুর মহানগরের শ্রমিক অধ্যুষিত গাছা থানাধীন বাদে কলমেশ্বর, শরীফপুর, হাজীর পুকুর ও হ্যারিকেন সড়ক এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক তিনি।

সম্প্রতি ছেলের হাত ভাঙার ঘটনায় মামলা করায় গার্মেন্ট কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের দুই পা গুঁড়িয়ে দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন শহীদ। নানা অবৈধ কারবারে জড়িত থাকলেও তাঁর মূল ‘পেশা’ জমি ও বাড়ি দখল। বাইরের জেলা থেকে এসে ওই এলাকায় জমি বা বাড়ি কিনেছেন—এমন সব মানুষই তাঁর নিশানা।

স্থানীয় লোকজন জানায়, কয়েক বছর আগেও শহীদ ছিলেন মাটিকাটা শ্রমিক। দুই বছরের ব্যবধানে এখন তিনি অঢেল সম্পদের মালিক। আছে চার-পাঁচটি বাড়ি। তবে সবই দখল করা।

গত মঙ্গলবার শহীদকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরদিন বাড়ি দখল ও মারধরের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁকে গাছা থানায় সোপর্দ করে র‌্যাব-১। ওই দিন দুপুরে তাঁকে ওই মামলায় সাত দিনের রিমান্ডে চেয়ে আদালতে পাঠায় গাছা থানার পুলিশ। কিন্তু বৃহস্পতিবার আদালত থেকে জামিন পেয়ে শহীদ মণ্ডল এলাকায় ফিরে আসায় ফের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহীদ মণ্ডল বাদে কলমেশ্বর ভুসির মিল সড়কের হবি মিয়ার ছেলে। তিনি একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এ দলে যোগ দেন। এখন তিনি গাছা থানা শাখা যুবলীগের সভাপতি প্রার্থী।

যে বাড়ি দখলের মামলায় শহীদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সে বাড়ির মালিক আলমের স্ত্রী শাহনাজ বেগম (৪২) অভিযোগ করেন, ২০১২

সালে তিনি বাদে কলমেশ্বরের ভুসির মিল সড়কের কাছে পাঁচ শতক জমি কেনেন। সেখানে দুই ইউনিটের একতলা বাড়ি করে ভাড়া দিয়েছিলেন। শহীদ মণ্ডল তাঁর কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। না দেওয়ায় পাঁচ মাস আগে ভাড়াটেদের অস্ত্রের মুখে বের করে দিয়ে বাড়ি দখল করে নেন তিনি।

শাহনাজ আরো বলেন, এর আগেও ওই এলাকায় বাবা ও ছেলের হাত-পা ভাঙার মামলায়ও জামিন পান শহীদ। এরপর তাঁর ক্যাডারা এলাকায় দা, হকিস্টিক চায়নিজ কুড়াল নিয়ে মহড়া দেয়। সে কারণে এখন তাঁরা আতঙ্কে রয়েছেন।

গত বুধবার বাদে কলমেশ্বর গেলে রুস্তম আলী মণ্ডল (৫০) নামের এক বাসিন্দা জানান, জমি ও বাড়ি দখল করে বহু নিরীহ মানুষকে নিঃস্ব করেছেন শহীদ মণ্ডল। তাঁর বড় ভাই জসিম, দুই ভাগ্নে রাসেল ও রাহাত মাদক ও যৌন কারবার নিয়ন্ত্রণ করে। মাদকসহ বহুবার গ্রেপ্তার হয়েছেন জসিম।

শহীদের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় দুই বছর আগে তাঁকে ডাকাতি ও জোড়া খুনের মামলার আসামি করে ৬১ দিন জেল খাটানো হয়েছে বলে জানান রুস্তম আলী। তিনি বলেন, শহীদের রয়েছে ১৫-২০ সদস্যের দুর্ধর্ষ ক্যাডার বাহিনী। তাদের চালায় শহীদের দুই ভাগ্নে। পৈতৃক সূত্রে শহীদ চার কাঠ জমির মালিক। কয়েক বছর আগে শহীদ ছিনতাইয়ে জড়িয়ে যান।

গাছা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফোরকান কালের কণ্ঠকে জানান, শহীদ মণ্ডল এলাকার বড় মাদক কারবারি। ফেনসিডিল ও ইয়াবার বড় ডিলার তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে গাছা থানায় মাদক মামলা রয়েছে।

জয়দেবপুর থানার সাবেক ভোগড়া ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জাকির হোসেন জানান, শহীদের বিরুদ্ধে মাদক কারবার ও ডিশ ব্যবসা দখলের অভিযোগ ছিল। তিনি অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পেয়েছিলেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী সোহানুর রহমান রবিন জানান, পাঁচ বছর আগে শহীদ তাঁদের প্রায় ৫০ লাখ টাকার সোয়া পাঁচ কাঠা জমি দখল করে নিয়ে সেখানে ঘর তুলে ভাড়া দিচ্ছেন।

রিকশা গ্যারেজের মালিক শান্ত (৩২) বলেন, পাঁচ-ছয় বছর আগে ভুসির মিল সড়কে এক কাঠা জমি কিনেছিলেন তিনি। সীমানা দেয়ালও তুলেছিলেন। কিন্তু ঘর তোলার আগেই একদিন শহীদ তাঁর জমিটি দখল করে নেন। পাশের কবিরুল হোসেন মোল্লার সাত কাঠা জমিও দখল করেন শহীদ।

হালিম মণ্ডল নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, শান্ত ও কবিরুলের জমি দখল করে সেখানে ঘর তুলে শহীদের তত্ত্বাবধানে মাদক ও যৌন কারবার চালাচ্ছেন তাঁর ভাই জসিম। এক বছর আগে ওই বাসা থেকে পুলিশ ১০০টি ইয়াবাসহ এক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছিল।

কিডনি রোগী আবদুল বারেক জানান, তিনি চিকিৎসার জন্য শেষ সম্বল চার কাঠা জমি বিক্রির চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কোনো ক্রেতা এলে শহীদ মণ্ডল ভয় দেখাতেন। বাধ্য হয়ে তিন-চার মাস আগে ওই জমি ৩২ লাখ টাকায় শহীদের কাছে বিক্রি করেন; কিন্তু পেয়েছেন ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বাকি টাকার চেক দিলেও ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে শহীদের হিসাবে কোনো টাকা নেই। এখন টাকা চাইতে গিয়ে উল্টো নাজেহাল হতে হচ্ছে।

মুদি দোকানি আবু তালেব (৪৫) আক্ষেপ করে বলেন, তিনি একটি জমি ২৮ লাখ টাকায় কেনার জন্য ১০ লাখ টাকায় বায়না করেছিলেন। শহীদ মণ্ডল ভয় দেখিয়ে ১০ লাখ টাকায় মালিকের কাছ থেকে ওই জমিটি নিয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁর টাকা ফেরত পাননি তিনি।

গাছা থানার ওসি মো. ইসমাইল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই থানায় শহীদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। জয়দেবপুর থানার কয়েকটি মামলাসহ তাঁর বিরুদ্ধে ৯টি মামলা বিচারাধীন থাকার কথা শুনেছেন তিনি। শহীদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) রয়েছে বলে জানান ওসি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা