kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

হাতে হাতে বাংলার পতাকা

আজাদুর রহমান চন্দন   

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাতে হাতে বাংলার পতাকা

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের চতুর্থ সপ্তাহের প্রথম দিনটিতেও বাংলার রাজপথ ছিল মিছিলে মিছিলে উত্তাল। একাত্তরের ২২ মার্চ ঢাকার রাজপথের চিত্র তুলে ধরা হয় পরদিন সংবাদপত্রের পাতায়। ‘রাজপথে উত্তাল গণমিছিল’ শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের গতকাল (সোমবার) ২১তম দিবস অতিবাহিত হয়। গতকাল বিক্ষুব্ধ মানুষের সভা-শোভাযাত্রা এবং গগনবিদারী ধ্বনিতে ঢাকা নগরী পুনরায় প্রকম্পিত হইয়া উঠে। গতকাল সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাটি দিনভর রাজধানীর রাজপথে ছিল অবিচ্ছিন্ন মিছিলের স্রোত আর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার বলিষ্ঠ শপথের বজ্র নির্ঘোষ ধ্বনি।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘মিছিলকারীদের অধিকাংশের হাতে ছিল কালচে সবুজ রংবিশিষ্ট কাপড়ের মাঝখানে লাল গোলাকার বৃত্ত। উহার মাঝখানে মুদ্রিত সোনালী রংয়ের বাংলার মানচিত্র শোভিত পতাকা। শান্তিপূর্ণ এবং এক অভূতপূর্ব সৃশৃংখলে মিছিলগুলির স্রোত প্রবাহিত হয় বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডীস্থ বাসভবনের দিকে।’

১৯৭১ সালের এই দিনে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল ‘ইয়াহিয়া-মুজিব অনির্ধারিত বৈঠক’। এর বাঁ দিকে এক কলাম শিরোনাম ছিল ‘আন্দোলন অব্যাহত থাকিবে—মুজিব’। প্রধান শিরোনামের ডানে এক কলাম শিরোনাম ছিল ‘জয়দেবপুরে কারফিউ প্রত্যাহার’। এর ডানদিকে দুই কলাম শিরোনাম ‘ক্ষমতা হস্তান্তরে আইনগত কোন বাধা নেই—ব্রোহী’। পাকিস্তানের প্রখ্যাত আইনজীবী এ কে ব্রোহী আগের দিন ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যে অভিমত দিয়েছিলেন তার ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি করা হয়। ইত্তেফাকে ২২ মার্চ প্রধান প্রতিবেদনের নিচে দুই কলামজুড়ে আরেকটি শিরোনাম ছিল “‘হঠ যাও—সব কুছ্ ঠিক হো যায়েগা’—ঢাকায় ভুট্টো ঃ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক”।

একাত্তরের এই দিনে দৈনিক আজাদের একটি শিরোনাম ছিল ‘শীতলক্ষ্যার বুকে জাহাজ মিছিল’। মর্নিং নিউজে একটি শিরোনাম ছিল ‘Teachers Demand Transfer of Power’ (ক্ষমতা হস্তান্তর দাবি শিক্ষকদের)।

ওই দিন সকালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে বলেন, পাকিস্তানের উভয় অংশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনাক্রমে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের পরিবেশ সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টির জন্য ২৫ মার্চের অধিবেশন স্থগিত রাখা হয়েছে। এর আগে রমনায় প্রেসিডেন্ট হাউসে ইয়াহিয়া খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও জুলফিকার আলী ভুট্টো বৈঠকে মিলিত হন। সেটি ছিল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ষষ্ঠ দফা বৈঠক। প্রায় সোয়া ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে নিজ বাসভবনে ফিরে আওয়ামী লীগপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আন্দোলনে আছি এবং লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’ দুপুরে প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে কড়া সামরিক পাহারায় হোটেলে ফিরে ভুট্টো তাঁর উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতারা প্রেসিডেন্ট হাউসে যান। রাতে সেখান থেকে ফিরে ভুট্টো হোটেল লাউঞ্জে এক অনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রেসিডেন্ট এবং আওয়ামী লীগপ্রধান বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য একটি সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। তবে সেই ঐকমত্য অবশ্যই পিপলস পার্টির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। পিপলস পার্টির অনুমোদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত পশ্চিম পাকিস্তানিরা মেনে নিতে পারে না।

একাত্তরের এই দিনে পল্টন ময়দানে সশস্ত্র বাহিনীর প্রাক্তন বাঙালি সৈনিকরা এক সমাবেশ ও কুচকাওয়াজের আয়োজন করেন। সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে উঠেছে তাতে প্রাক্তন সৈনিকরা আর প্রাক্তন হিসেবে বসে থাকতে পারেন না। তাঁদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মূল্যবান সম্পদ। তাঁরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পালন করতে প্রস্তুত।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা