kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

পুনর্ভবার ভব সাঙ্গ, যৌবন হারিয়ে এখন মরা খাল

ফরিদুল করিম, নওগাঁ   

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



পুনর্ভবার ভব সাঙ্গ, যৌবন হারিয়ে এখন মরা খাল

পোরশার নিতপুর সীমান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া পুনর্ভবা নদী এখন মরা খাল। ছবি : কালের কণ্ঠ

সে সময় পুনর্ভবা ছিল পূর্ণ যৌবনা। ঢেউয়ের তালে তালে দুলত নদী, চলত অসংখ্য পালতোলা নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার। মাঝিরা নৌকা নিয়ে ছুটে যেত গোমস্তাপুর, রহনপুর, নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার ব্যবসাকেন্দ্রগুলোতে। বড় বড় হাট-বাজারে ধান, পাট, আলু, বেগুন, সরিষা, কলাই, গমসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহের অন্যতম পথ ছিল এই পুনর্ভবা নদী। শুধু পণ্য নয়, বিক্রির জন্য নৌকায় করেই নেওয়া হতো গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া। এলাকার একমাত্র এই নদীপথ অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকার শক্ত ভিত ছিল। শুধু হাট-বাজার নয়, পূনর্ভবার পানি দিয়ে কৃষকরা দুই পারের হাজার হাজার হেক্টর জমিতে সবুজ ফসল ফলাত। দিন-মাস শেষে ফসলে ভরে উঠত ক্ষেত, তারপর গোলা। আবার ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অফুরন্ত উৎস ছিল এই পুনর্ভবা। মাছ মিলত সারা বছর। মাছ বিক্রির অর্থে অসংখ্য জেলে পরিবারের সংসার চলত। সময় গড়িয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে ভরা যৌবনা পুনর্ভবা এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, নওগাঁ জেলার সাপাহার ও পোরশা উপজেলায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষে প্রবাহিত একসময়ের উত্তাল পুনর্ভবা নাব্যতা হারিয়ে এখন বালুচর। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলে পরিবারগুলো এরই মধ্যে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। পারগুলো হয়েছে কৃষিজমি। নদীগর্ভে জেগে ওঠা চরে এলাকার শিশুরা খেলছে ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলা। একসময়ের ব্যবসা-বাণিজ্যের উৎসগুলো হয়ে গেছে চিরতরে বন্ধ। থমকে গেছে নদী, নিভে গেছে বিপুল সম্ভাবনা। এলাকাবাসীর ভাষ্য, নদীকেন্দ্রিক সম্ভাবনাগুলো ধীরে ধীরে নিভে গেলেও এ নিয়ে খুব কমই কেউ ভেবেছে।

নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস সূত্রে জানা যায়, পুনর্ভবার উৎপত্তি ভারতের মহানপুর বিলে। নদীটি দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে এবং নওগাঁ জেলায় প্রবেশ করেছে সাপাহার উপজেলার উত্তর পাতাড়ি এলাকা দিয়ে। নওগাঁর সাপাহার ও পোরশা উপজেলার মধ্য দিয়ে ভারত সীমান্ত ঘেঁষে ১০ কিলোমিটার পথ প্রবাহিত হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুরে মহানন্দা নদীতে মিলিত হয়েছে। পুনর্ভবা নদীর গড় প্রশস্ততা ছিল ২০০ মিটার ও গভীরতা ৬.৫০ মিটার।

নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জোয়ারদার মো. আসাদুল্লাহ্ বলেন, নদীর এখন নাব্যতা না থাকলেও বর্ষা মৌসুমে পুনর্ভবা নদীতে পানির প্রবাহ শুরু হয়। তখন নদীর তীরে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। নদীটি যেহেতু ভারত সীমান্তঘেঁষা, তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নদীর সীমানা (ভূখণ্ড) রক্ষায় বাঁ তীরে ভাঙন রোধে দুই হাজার ১০০ মিটার ব্লক বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে দুই হাজার ২০০ মিটার ব্লক বসানোর কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুকনো মৌসুমে সরকারিভাবে নদীটি খননের পদক্ষেপ নেওয়া হলে অন্তত মরা খালে পরিণত হতো না। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার ফলেই নদীটি ফসলের জমিতে পরিণত হয়েছে। এ সুযোগে অনেকেই ধান চাষ করছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমে পুনর্ভবা নদীতে যে পানিপ্রবাহ হয় তার অর্ধেক পরিমাণ পানি যদি শুকনো মৌসুমে থাকে তবে নদীর তীরে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ফিরে আসবে। আর এর জন্য জরুরিভাবে নদী ড্রেজিং করে এর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে।

নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পুনর্ভবার ড্রেজিংয়ের বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া আছে। কেন্দ্রীয়ভাবে প্রস্তাবটি প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবনায় চলমান রয়েছে। তিনি আরো বলেন, নদীটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বলে এ বিষয়ে বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে খননকাজ করতে হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা