kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির গোড়ায় গলদ

তৌফিক মারুফ   

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির গোড়ায় গলদ

দেশে চক্ষু চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার প্রসারে চালু হয়েছিল জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। কিন্তু একদিকে রোগীর চাপ অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক-চিকিৎসক সংকটে দিশেহারা প্রতিষ্ঠানটি। এ প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক-শিক্ষককে গত বছর বদলি করা হয়েছে। রোগীর চিকিৎসাদান, কোর্সগুলোর শিক্ষার্থীদের ক্লাস করানো, নিয়মিত অপারেশন করা, ওয়ার্ডে রাউন্ড দেওয়া, শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে উপযুক্ত মাত্রায় শিক্ষাদান বাকিদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। সব কিছুই হচ্ছে অনেকটা দায়সারাভাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির একজন অধ্যাপক কালের কণ্ঠ’র কাছে এমন পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘রোগীর চাপ সামলাতে এখানে চিকিৎসক বাড়ানো দরকার। আমরা রোগী দেখব না ক্লাস নেব? আমরা তো এমবিবিএস পড়াচ্ছি না, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে একেকজন ছাত্রকে গড়ে তুলছি। কিন্তু বিষয়টির গুরুত্ব যেন নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বুঝতে সমস্যা হচ্ছে।’

বিশেষায়িত এই প্রতিষ্ঠান ছাড়াও আরো একাধিক প্রতিষ্ঠানে খোঁজখবর নিয়ে একই চিত্র পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) একজন অধ্যাপক বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা সব ইনস্টিটিউশনের অবস্থা একই মানের নয়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক-চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই, ঠিকমতো ক্লাসও হয় না।

বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে নতুন রোগের পাশাপাশি পুরনো রোগের জটিলতা দিন দিন বাড়ছে। এসব রোগের চিকিৎসায় বাড়ছে একের পর এক বিশেষায়িত হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউশন। তবে সেই হারে বাড়ছে না বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। আবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির কারখানা হিসেবে ওই ইনস্টিটিউশনগুলো থেকে যে কোর্স করানো হয় তার মান নিয়েও রয়েছে সংশয়। বেশির ভাগ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউশনেই উপযুক্ত পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। এমনকি ওই সব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে এমন সব বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির হারও গত কয়েক বছরে বাড়ার বদলে উল্টো কমে যাচ্ছে, যা নিয়ে খোদ চিকিৎসা শিক্ষাবিদদের মধ্যেই দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী মূলত নজরদারির ক্ষেত্রে সরকারের অপ্রত্যাশিত শৈথিল্য। আছে পরিকল্পনায় দুর্বলতাও।

জানতে চাইলে বিএসএমএমইউর ভিসি ও বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন,

‘দুঃখজনক হলেও সত্যি যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাদে বেশির ভাগ উচ্চতর মেডিক্যাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনেক ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এসব ঘাটতি দূর করতে সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানোটা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্রাইভেট ও কিছু সরকারি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান ও পরিবেশ আরো উন্নত করা প্রয়োজন।’

ডা. কনক কান্তি জানান, প্রাইভেট পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদের দিকনির্দেশনা অনুসারে চলে। সেখানে শিক্ষা দেওয়ার সঙ্গে তাদের প্রতিষ্ঠানের লাভের বিষয়টিও জড়িত থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় নিজস্ব পর্যাপ্ত বা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই, শিক্ষা উপকরণ নেই, উপযুক্ত পরিবেশ নেই, কোনোমতে কিছুদিন এখানে কিছুদিন ওখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কোর্স করে। এতে বিশেষায়িত শিক্ষার গুণগত মান খর্ব হয়।’

সরকারের সেন্ট্রাল মেডিক্যাল এডুকেশনের (সিএমই) গবেষণার তথ্য অনুসারে, দেশে মোট প্রোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩৯টি। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান ২২টি, স্বায়ত্তশায়িত সাতটি ও বেসরকারি ১০টি। বিভিন্ন মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজ থেকে এমবিবিএস ও বিডিএস পাস করা ডাক্তাদের এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা, এমফিল, এমডি, এমএস, এমপিএইচ, এমএমইউডি, এফসিপিএস ও এমসিপিএস ডিগ্রি ও ফেলোশিপ দেওয়া হয়। আসনসংখ্যা মোট দুই হাজার ৮৪৬টি। তবে বছরে পাস করে বের হয় মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। মাঝে এই হার কিছুটা বেশি থাকলেও গত তিন বছরে তা কমে গেছে। যদিও বিএসএমএমইউ সূত্রের দাবি, এই হার বাড়ছে।

বিএসএমএমইউর প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. শাহানা আখতার রহমান বলেন, ‘আমরা সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকেই বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। আর শুধু পোস্ট গ্র্যাজুয়েট নয়, আমরা এমবিবিএসেও মানের দিকে বেশি নজর রাখছি।’

সিএমইর কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট ও ইভ্যালুয়েশনের অধ্যাপক ডা. হুমায়ূন কবীর তালুকদার বলেন, ‘দেশে বিশেষজ্ঞ তৈরির বড় সমস্যা হচ্ছে বেসিক সাবজেক্টগুলোয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা শিক্ষকের সংকট। এই সংকট দূর করতে না পারলে বিশেষজ্ঞ তৈরি বাড়বে না। মানের জায়গাতেও প্রত্যাশা পূরণ হবে না।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা