kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

ফুটপাতে চাঁদাবাজি : মিরপুর স্পট-২

চাঁদার দখল নিয়ে যুবলীগ-ছাত্রলীগে খুনাখুনি

লায়েকুজ্জামান   

১৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চাঁদার দখল নিয়ে যুবলীগ-ছাত্রলীগে খুনাখুনি

মিরপুরের আদি ১০ নম্বরে ইনডোর স্টেডিয়াম। এই স্টেডিয়ামের সামনে প্রতিদিন ভোরে মাছ ও সবজির বাজার বসানো হয়। মিরপুর এলাকায় বর্তমানে এটি সবচেয়ে জমজমাট কাঁচাবাজার। ফুটপাতের এ বাজারটির চাঁদার দখল নিয়ে ইতিমধ্যে ঘটেছে খুনাখুনির ঘটনা। দখল বজায় রাখতে প্রতিপক্ষের হামলায় খুন হয়েছেন স্থানীয় যুবলীগকর্মী রুমান। আর মারাত্মক আহত হয়ে বেঁচে আছেন আরেক যুবলীগকর্মী সাইফুল। ঘটনাটি ঘটেছে তিন মাস আগে। এই খুনের মামলায় আসামি করা হয়েছে ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ইব্রাহিমকে।

এখানেই ঘটনা শেষ হয়ে যায়নি। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি এবং ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই ফুটপাতের চাঁদাবাজির দখল নিতে নতুন করে শাণিত হচ্ছে তিনটি পক্ষ। ফলে আবারও খুনাখুনির আশঙ্কা করা হচ্ছে। নতুন করে যে তিনটি পক্ষ এই ফুটপাতের চাঁদার দখল নিতে চায় তার মধ্যে রয়েছে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগ উত্তরের একটি অংশ। এই অংশের নেতা ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগ উত্তরের সভাপতি ইব্রাহিম। আরেক পক্ষ স্থানীয় ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম খোকন। তৃতীয় পক্ষ হচ্ছে বর্তমান দখলে থাকা স্থানীয় যুবলীগের পদহীন নেতা সাইফুল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম খোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দখল নিতে চাই না।

চাঁদাবাজি বন্ধ করতে চাই।’ তার মানে সেখানে চাঁদাবাজি হয়? জবাবে তিনি জানালেন—হাঁ, হয়।

এলাকার লোকজন এবং দোকানদাররা জানায়, মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামের সামনের ওই ফুটপাত এবং সংলগ্ন ৬ নম্বর এলাকার বাজারের ফুটপাতে দোকানের সংখ্যা এক হাজার ২০০। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইনডোর স্টেডিয়ামের সামনের ফুটপাতের একজন সবজি বিক্রেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রায় দেড় বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। প্রথম যখন দোকান শুরু করি তখন ১২ হাজার টাকা দিয়েছিলাম রুমান ভাইকে। তিনি তো মারা গেছেন। আগে আমরা দিনে ১৫০ টাকা চাঁদা দিতাম। এখন দিতে হয় ২০০ টাকা। এক মাস আগে বাড়ানো হয়েছে। এখন চাঁদার টাকা নেন সাইফুল ভাই।’

ফুটপাতের ব্যবসায়ী এবং একাধিক চাঁদা আদায়কারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন এই স্পট থেকে ২ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। চাঁদার টাকা সংগ্রহ করেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ১০০ দোকান থেকে টাকা তুলি। দিনে বেতন পাই ৪০০ টাকা। চাঁদার টাকা তুলে সাইফুল ভাইকে দেই।’

ইনডোর স্টেডিয়ামের এই ফুটপাতের চাঁদার দখল নিতে গিয়ে গত জানুয়ারি মাসে খুন হন স্থানীয় যুবলীগকর্মী রুমান। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত হন যুবলীগকর্মী সাইফুল। সাইফুলকে রাম দা দিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হলেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। রুমান হত্যা ও সাইফুলের ওপর হামলার বিষয়ে মিরপুর থানায় একটি মামলা করা হয়। ওই মামলার প্রধান আসামি ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ইব্রাহিম। নিহত রুমানের পরিবারের দাবি, ছাত্রলীগের কয়জন নেতা ওই হামলায় অংশ নেন। বর্তমানে সাইফুল ওই ফুটপাতের একটি অংশের চাঁদা আদায় করেন। আরেক অংশের চাঁদা আদায় করেন আওয়ামী লীগকর্মী গিয়াস উদ্দিন বেপারী।

স্থানীয় লোকজন জানায়, ইনডোর স্টেডিয়ামসহ ৬ নম্বর এলাকার ফুটপাত থেকে চাঁদা নেন গিয়াস উদ্দিন বেপারী। মিরপুর ৬ নম্বর এলাকার ফুটপাত থেকে চাঁদার টাকা আদায়কারী মাঝ বয়েসী এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ইনডোর স্টেডিয়াম ও ৬ নম্বর এলাকা থেকে চাঁদার টাকা তুলি। দোকানপ্রতি ২০০ টাকা।’ চাঁদার টাকা কাকে দেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের গিয়াস উদ্দিন বেপারীকে।’ গিয়াস উদ্দিন বেপারী স্থানীয় আওয়ামী লীগের পদহীন নেতা। তবে এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে পরিচিত। ২০১৪ সালের পর এলাকায় তাঁর উত্থান।

ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ইব্রাহিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আগেও কখনো ফুটপাতের চাঁদার দখল নিতে যাইনি। এখনো না। ভবিষ্যতেও দখলের কোনো পরিকল্পনা আমার নেই।’ রুমান হত্যা মামলায় আসামি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এলাকার রাজনীতির শিকার হয়েছি। সে কারণে আমাকে আসামি করা হয়েছে।’

বর্তমানে দখলে থাকা যুবলীগকর্মী সাইফুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ফুটপাত থেকে চাঁদা তুলি না। একটি গ্রুপ আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’ এলাকার সবাই তো আপনার নাম বলে, এমনটি জানালে তিনি বলেন, ‘এসব মিথ্যা কথা।’ কিন্তু রুমান হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল চাঁদার দখল নিয়ে। সে সময় তিনিও আহত হয়েছিলেন। এর জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা শুধু চাঁদার ঘটনা নিয়ে ঘটেনি। এর পেছনে এলাকার রাজনীতি জড়িত।’ আপনি তো চাঁদা তোলেন, এ কথা বললে নীরব থাকেন সাইফুল।

চাঁদা আদায়ের কথা অস্বীকার করে আওয়ামী লীগকর্মী গিয়াস উদ্দিন বেপারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেউ সামনাসামনি এসে বলতে পারবে না আমি চাঁদা আদায় করি।’ তিনি প্রভাবশালী। কেউ ভয়ে কথা বলে না। এমনটি জানালে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাঁদাবাজি সব খানে হয়। দলের কর্মীরা চাঁদা নিয়ে সংসার চালায়। না হলে তো তাদের ছিনতাই করতে হতো।’

মন্তব্য