kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

বিআইডাব্লিউটিএর অর্থ আত্মসাৎ

মামলাও শেষ হয় না উদ্ধার হয় না টাকাও

নিজস্ব প্রতিবেদক    

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মামলাও শেষ হয় না উদ্ধার হয় না টাকাও

জনতা ব্যাংকের হিসাব থেকে প্রায় ১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আটক হয়েছিলেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) এক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা। ৯ বছর আগে করা মামলায় ব্যাংকের ১৮ কর্মকর্তাকেও আসামি করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। এরই মধ্যে প্রায় আট বছর কারাগারে কাটিয়েছেন প্রধান আসামি। আর সময়মতো টাকা উদ্ধার করে ব্যাংকে রাখা সম্ভব হলে বীমা তহবিলে ৯ বছরে সুদ বাবদ যোগ হতো প্রায় দুই কোটি টাকা, যা থেকে বঞ্চিত হলেন বিআইডাব্লিউটিএর কর্মচারীরা।

সেই মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, টাকাও উদ্ধার হয়নি। অভিযোগ মাথায় নিয়ে এরই মধ্যে মারা গেছেন ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। চাকরিজীবন শেষ করেছেন ১৪ জন, তবে মামলার তারিখে তারিখে নথিপত্র নিয়ে আদালতে হাজিরা দেওয়া থেকে তাঁদের রেহাই মেলেনি এখনো।

ঢাকায় জনতা ব্যাংকের পুরানা পল্টন শাখায় বিআইডাব্লিউটিএর গ্রুপ বীমাসংক্রান্ত হিসাবটি পরিচালনা করতেন সংস্থার সহকারী হিসাব কর্মকর্তা আব্দুস সালাম খান। ২০১০ সালের নভেম্বরে তাঁর বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মামলা করে সংস্থাটি। এরপর দুদক তদন্ত করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রুপ বীমা তহবিলের ১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন আব্দুস সালাম। ৬৫২টি চেক জাল করে, ভুয়া পে-অর্ডার তৈরি করে, এসএস কার্ডে জাল সই করে তিনি ওই অর্থ আত্মসাৎ করেন। দুদকের

অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদনের পাঁচ পৃষ্ঠা জুড়েই মামলার এক নম্বর আসামি আব্দুস সালামের জালিয়াতির তথ্য, আলামত ও বিবরণ আছে।

২০১৭ সালের মার্চে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ঢাকা মহানগর বিশেষ জজ আদালতে (নং ১০)। তাতে অভিযুক্ত ১৯ আসামির মধ্যে ১৮ জনই ব্যাংক কর্মকর্তা। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, যাচাই-বাছাই না করে, অথবা অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আব্দুস সালাম খানকে তাঁরা অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা করেন।

প্রতিবেদনে আসামির তালিকায় ১৮ নম্বরে আছে কবির আহমদের নাম। অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের যে তিনজন এখনো অবসরে যাননি, তাঁদের একজন তিনি। প্রায় চার বছর ধরে সংঘটিত আত্মসাতের একটা সময়ে পাঁচ মাসের জন্য তিনি জনতা ব্যাংকের ওই শাখায় সেকেন্ড অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাসিং অফিসার হিসেবে কয়েকটি ভাউচারে তাঁর সই ছিল। জনতা ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের তদন্তে তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দুদকে ব্যক্তিগত শুনানিতে তাঁর ব্যাখ্যা সন্তোষজনক বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এমনকি অধিকতর তদন্তের পর দুদকের চার্জশিটেও বলা হয়েছে, কবির আহমেদ ‘নিয়মানুযায়ী রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে দ্বিতীয় স্বাক্ষরকারী হিসেবে ভাউচারে স্বাক্ষর করেছেন।’ এর পরও মামলা থেকে তাঁর অব্যাহতি মেলেনি। দুদক বলছে, আদালতে চার্জশিট গৃহীত হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আদালতেরই। আবার আদালত থেকে বলা হয়েছে, দুদকই চার্জশিট থেকে তাঁর নাম বাদ দিতে পারত। 

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে দুদক চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে ব্যক্তিগত শুনানিতে হাজির হয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিলেন কবির। সেদিনের শুনানির বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, ‘তাঁর উপস্থাপিত বক্তব্য কমিশনের নিকট সন্তোষজনক মর্মে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু এই মামলায় দাখিলকৃত চার্জশিট বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক গৃহীত হওয়ায় কমিশন আসামিকে কোনো ধরনের প্রতিকার দিতে সক্ষম নয়।’

ব্যক্তিগত শুনানির পর্যবেক্ষণ আনুষ্ঠানিকভাবে দুদক থেকে আদালতে জানানো হয়নি। বরং অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর নাম রেখে দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো প্রতিকার পাননি কবির আহমেদ। আদালতে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত কবির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বললেন, ‘প্রিন্সিপাল অফিসার থেকে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার হয়েছিলাম, ৯ বছর ধরে সে পদেই পড়ে রয়েছি। আমার সঙ্গের অনেকেই জিএম, ডিএমডি হয়েছেন। কোনো দোষ না করেও কেরিয়ারে পিছিয়ে পড়লাম।’

এখন অবসরের দিন গুনছেন কবির, আর খোঁজ রাখছেন মামলার পরবর্তী তারিখের। কতবার আদালতে গেছেন সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেননি। তবে ৯ বছরে গড়ে প্রতি মাসে এক থেকে দুইবার আদালতে হাজির ছিলেন, সেই হিসাবে অন্তত ৭০ দিন গেছেন পুরান ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে। আইনজীবীর ফি, আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে ১৮ জন ব্যাংক কর্মকর্তার প্রত্যেকের পকেট থেকে তিন থেকে চার লাখ টাকা করে বেরিয়ে গেছে। আর কর্মঘণ্টা, মানসিক চাপের হিসাব করেননি কবির। তাঁর প্রশ্ন, ‘চাকরি, ব্যক্তিগত জীবনের এ ক্ষতি কে পূরণ করবে?’ 

মামলা চলাকালেই অবসরে গিয়েছিলেন জনতা ব্যাংকের পুরানা পল্টন শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার জমশের আলী। দুই বছর রোগে ভুগে গত বছরের অক্টোবরে তিনি মারা যান। মোবাইল ফোনে তাঁর ছোট মেয়ে বলেন, ‘বাবার মুত্রথলিতে ক্যান্সার হয়েছিল। দুই বছর ভয়াবহ অসুস্থ ছিলেন। শেষের দিকে ডায়ালিসিস নিতে হতো বার্ডেমে। অনেক খরচ, বাবা টাকার অভাবের মধ্যেই মারা গেছেন।’ তিনি জানান, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় পেনশনের টাকা দেয়নি ব্যাংক। চিকিৎসার জন্য অনেক ঋণ হয়েছে তাঁদের। পেনশন পেলে সেই ঋণ শোধ হবে এই আশায় আছে পরিবার।

মামলার সাক্ষী ৪৯ জন। ২৭ জনের সাক্ষ্য হয়েছে, বাকিদের শেষ হবে মামলার পরবর্তী পর্বে।

মামলা আর কত দিন চলতে পারে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো জবাব নেই আইনজীবীদের। তবে তাঁরাও মনে করেন, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় প্রকৃত অপরাধীর সাজা যেমন বিলম্বিত হচ্ছে, তেমনি নির্দোষ যাঁরা তাঁদেরও ভোগান্তি হচ্ছে। খোয়া যাওয়া অর্থও উদ্ধার হচ্ছে না। 

সুপ্রিম কোর্টে দুদকের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী খুরশীদ আলম খান জানান, ভুয়া ডকুমেন্ট বানিয়ে রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাতের অপরাধে দণ্ডবিধির ৪৬৭ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে যাবজ্জীবন আর সর্বনিম্ন ১০ বছরের কারাদণ্ড, সঙ্গে জরিমানা। এই শাস্তির পরিমাণ অপরাধের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করবে। প্রতারণার দায়ে সাত বছর কারাদণ্ডসহ জরিমানার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ভুয়া কাগজপত্র বানানোর অপরাধে ৪৬৭ ধারার ন্যায় শাস্তির বিধান আছে দণ্ডবিধির ৪৭১ ধারায়।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের আইনজীবী বোরহান উদ্দিন আহমেদ বলেন, মামলার মূল অভিযুক্ত বিআইডাব্লিউটিএর সহকারী হিসাব কর্মকর্তা। দুই মামলায়ই তিনি মূল আসামি। এই কারণেও হয়তো সময় লাগছে। আসামি না আসা, আরো নানা কারণ থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের সবাই তো আর দোষী নয়, কয়েকজন তো জানেই না, অথচ সবাই সাফার করছে।’

প্রধান আসামি আব্দুস সালামের পক্ষে মামলা লড়ছেন অ্যাডভোকেট মাজেদুর রহমান মামুন। তাঁর মতে, তদন্ত প্রক্রিয়ায় ভুলের কারণেই বেশি সময় লাগছে। এত বড় ঘটনায় বিআইডাব্লিউটিএর মাত্র একজনের ওপর দায় চাপিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।

দুদকের পক্ষে এই মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল কালের কণ্ঠকে বলেন, বিআইডাব্লিউটিএর প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। মানিলন্ডারিং আইনে দায়ের হওয়া মামলাটিতে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। এখন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। আরেকটি মামলা হয়েছে ভুয়া ডকুমেন্ট বানিয়ে রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে। এ মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এটি দ্রুত সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিচার সম্পন্ন হতে এত দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে কাজল বলেন, এই মামলাগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া এ মামলা একবার অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর আদালত পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিলে, সেটি সম্পন্ন করে অভিযোগপত্র দাখিল করতে বেশ সময় লেগেছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা