kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

সম্রাট জঙ্গি, না মানসিক রোগী?

আশরাফ-উল-আলম ও কে এম সবুজ   

১৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সম্রাট জঙ্গি, না মানসিক রোগী?

র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. রবিউল ইসলাম কবির সিকদারের ছেলে মো. ওয়ালিউল ইসলাম সম্রাট জঙ্গি, না একজন মানসিক রোগী তা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে সম্রাটকে তাঁদের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করেন র‌্যাব ৮-এর সদস্যরা। তাঁকে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সদস্য হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়।

২৫ বছর বয়সী সম্রাটকে আটকের পর ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। এরপর ঢাকার আশুলিয়া থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

সম্রাটকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে তিনি একজন মানসিক রোগী। ২০১৬ সাল থেকে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে এখনো চিকিৎসাধীন তিনি। তিনি কী করে জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিবারের সদস্যরা। এলাকার লোকজনও জানে, তিনি মানসিক রোগী। কিন্তু র‌্যাব বলছে, সম্রাট এবিটির সদস্য। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলার এজাহারনামীয় আসামি তিনি।

তাঁকে যে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, ওই মামলার নথিপত্র থেকে দেখা যায়, গত ২৮ জানুয়ারি র‌্যাব ১-এর একটি টহল দল আশুলিয়া থানার কুমকুমারি মৃধাবাড়ীর মোড়ের কাছে একটি ফাঁকা জায়গা থেকে এবিটির সক্রিয় সদস্য মো. আব্দুস সোবহান ওরফে হাবিবকে আটক করে। এ সময় তাঁর কাছ থেকে জঙ্গি কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করার পাঁচটি জিহাদি বই উদ্ধার করা হয়। হাবিবকে আটকের সময় কয়েকজন পালিয়ে যায়। তারা নাস্তিক ও মুরতাদদের টার্গেট করে হত্যার পরিকল্পনা করতে সেখানে সভা করছিল বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

মামলায় বলা হয়, আটক হাবিব স্বীকার করেছে ভার্চুয়াল জগতে ‘টেলিগ্রাম অ্যাপস’-এ ‘সহজ পথ’ নামের একটি গ্রুপে তাদের ৯০ জন সদস্য আছে। তারা বিভিন্ন ফেসবুক আইডি খুলে জঙ্গি তৎপরতা চালায় ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। অর্থও জোগাড় করে। এজাহারে ২০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। তার মধ্যে একজনের নাম সম্রাট বলেও উল্লেখ আছে। তবে সম্রাটের নাম ছাড়া অন্য কোনো পরিচয় এজাহারে নেই। র‌্যাব ১-এর নায়েক সুবেদার মো. শওকত আলী ২৯ জানুয়ারি আশুলিয়া থানায় এজাহারটি দায়ের করেন।

এদিকে সম্রাটকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর বাবা কবির সিকদার র‌্যাব ৮-এর পরিচালক ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বরাবর এক চিঠি দিয়ে তাঁর ছেলের বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, এ রকম কোনো অপরাধের সঙ্গে তাঁর ছেলে জড়িত নয়। তাঁর ছেলে ২০১৬ সাল থেকে মানসিক রোগী এবং এখনো চিকিৎসাধীন। তিনি মানবিক কারণে ছেলের মুক্তি দাবি করেছেন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য (ঝালকাঠি-১) বজলুল হক হারুন বলেছেন, সম্রাট মানসিক রোগী। চিঠিতে তিনি সুপারিশ করে বলেছেন, সম্রাটের পিতার আবেদন সত্য বলেই তাঁর জানা। সম্রাটের গোটা পরিবার মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও তাঁদের পরিবারের সদস্য। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি সাধারণ সম্পাদকও তাঁদের পরিবারের লোক। সম্রাটও অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত কাঁঠালিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

আবার মামলার নথি থেকে দেখা যায়, সম্রাট গ্রেপ্তারের পরে ঢাকা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জঙ্গি কার্যক্রমে যুক্ত বলে জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর আইনজীবী নজরুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, সম্রাটের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রও আছে। একজন মানসিক রোগীকে দিয়ে যেকোনো কথাই বলানো যায়। তিনি বলেন, মামলার এজাহারে এক সম্রাটের নাম আছে। কিন্তু প্রকৃত সম্রাট এই আসামি কি না তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে।

তবে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে সম্রাটের ভূমিকা নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। একই এলাকার কয়েকজন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানায়, সম্রাট মানসিক রোগীর ভান ধরেছিলেন। তিনি একসময় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও মাদক ব্যবসা করতেন। এর আগে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরে তিনি নিয়মিত উপজেলা পরিষদের মাঠে ভলিবল খেলতেন। মোটরসাইকেল চালাতেন। তবে কারো সঙ্গে তেমন একটা কথাবার্তা বলতেন না, কোথাও আড্ডা দিতেন না। নামাজ পড়তেন। আর ইসলামী বই পড়েই বেশি সময় কাটাতেন।

কাঁঠালিয়ার পশ্চিম আউরা গ্রামের রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্রাট কয়েক দফা গ্রেপ্তারের পর একটু মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। দাড়ি রেখে তিনি নামাজ-কালাম নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। কারো সঙ্গে কথা বলতেন না। আমরা তাঁকে মানসিক রোগী হিসেবেই দেখতাম।’ 

একই এলাকার ইব্রাহিম হাওলাদার বলেন, ‘সম্রাটকে আটকের পরে মারধর করা হয়েছিল বলে আমরা শুনেছি। এর পর থেকেই তিন অসুস্থ হয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। তবে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত এমনটি কখনো আঁচ করা যায়নি।’

সম্রাটের ভূমিকা নিয়ে ভিন্নমত থাকায় এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে, তাঁকে ষড়যন্ত্র করে কেউ জঙ্গি বানাতে চাচ্ছে, নাকি জঙ্গি খাতায় নাম ওঠায় তা থেকে রেহাই পেতে মানসিক রোগী সাজানো হচ্ছে?

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা