kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

আলজাজিরায় নিবন্ধ

নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য বিএনপি নিজেও দায়ী

জনসমর্থন হারানো, জনসম্পৃক্ত হতে ব্যর্থ, সুস্পষ্ট এজেন্ডার ঘাটতি

বিশেষ প্রতিনিধি   

১১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য বিএনপি নিজেও দায়ী

কেবল সরকারের ভূমিকাই নয়, গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিজেও দায়ী। গতকাল রবিবার কাতারের দোহাভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আলজাজিরার ওয়েবসাইটে ‘হোয়াট ওয়েন্ট রং উইথ দ্য বিএনপি, বাংলাদেশস মেইন অপজিশন পার্টি’ (বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সমস্যাটা কী হয়েছিল) শীর্ষক নিবন্ধে এই অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘শুধু সরকারি নিপীড়নের কারণে গত বছরের বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপির পরাজয় হয়েছে এমনটি ব্যাখ্যা করা যায় না।’ সম্প্রতি আলজাজিরায় প্রচারিত ‘হেড টু হেড’ প্রগ্রামে ‘ইজ বাংলাদেশ আ ওয়ান-পার্টি স্টেট?’ (বাংলাদেশ কি একদলীয় রাষ্ট্র?) শীর্ষক অনুষ্ঠান নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গতকাল চ্যানেলটি তাদের ওয়েবসাইটে বিএনপির পরাজয় বিশ্লেষণ করে ওই নিবন্ধ প্রকাশ করে।

নিবন্ধটির লেখক নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কালচারাল স্টাডিজ অ্যান্ড ওরিয়েন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজ’ বিভাগের পোস্ট ডক্টোরাল ফেলো মোবাশ্বের হাসান ও সাউথ এশিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক আরিল অ্যাঙ্গেলসেন রুড। তাঁরা বিএনপির ভরাডুবির কারণ হিসেবে জনসমর্থন হারানো, জনসম্পৃক্ত হতে ব্যর্থতা, দলের সুস্পষ্ট এজেন্ডার ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছেন। আগামী দিনগুলোতে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর তেমন সম্ভাবনা না থাকার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তাঁরা লিখেছেন, ‘গত বছরের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের ব্যর্থ হওয়ার একমাত্র কারণ ক্ষমতাসীন সরকার তাদের নিপীড়ন ও স্তব্ধ (মত প্রকাশে বাধা) করেছে এমন নয়। পুরনো ও অদূরদর্শী নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট এজেন্ডার অভাব এবং দেশের জন্য নতুন পথ দেখাতে না পারার কারণও দলটির ব্যর্থতার জন্য দায়ী। বাংলাদেশে এখনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে। তবে তা বিএনপির সহযোগিতায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

দুই নিবন্ধকারের একজন মোবাশ্বের হাসান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক। তিনি ২০১৭ সালে ৪৪ দিন নিখোঁজ ছিলেন। অসলোতে অবস্থানরত মোবাশ্বের তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্টে নিজেকে নির্বাসিত লেখক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি ও বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ও অধ্যাপক আরিল যৌথ নিবন্ধে লিখেছেন, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনে বিশাল জয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর টানা তৃতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করেছেন। এতে বাংলাদেশ ‘একদলীয় রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনে

৩০০ সংসদীয় আসনের প্রায় সব কটিতেই বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী জোট মাত্র সাতটি আসন পেয়েছে। বিএনপির এই হতাশাজনক ফলাফলে বাংলাদেশের অনেক পর্যবেক্ষকের প্রশ্ন, ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে চারবার জাতীয় ও দুইবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী এই দল কি আর কখনো বাংলাদেশে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তার অবস্থান ফিরে পাবে?

দুই নিবন্ধকার বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পুনরুত্থানের সম্ভাবনা না থাকার জন্য মূলত তিনটি বিষয় তুলে ধরেছেন। এর প্রথমটিই হলো জনসমর্থন হারানো। নিবন্ধে বলা হয়েছে, বিএনপির এখন আর ব্যাপক জনসমর্থন নেই। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে কারাগারে। তাঁর ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় তারেকের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন সাজার কথা উল্লেখ করে নিবন্ধে বলা হয়েছে, দলটির অনেক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ সমর্থকরা হয় কারাগারে, নির্বাসিত বা পালিয়ে আছে। বাকিরা যতটা সম্ভব ‘লো প্রফাইল’ থাকার চেষ্টা করছে। দলটি তার নেতাদের কোনো ধরনের অন্যায়ের কথা অস্বীকার করে অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ বলে আসছে। তবে ওই অভিযোগগুলোর কারণেই দলটি তার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সমর্থক হারিয়েছে। ২০১৪ সালে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বিএনপির নির্বাচন বর্জন ও সহিংস আন্দোলনের কারণেও জনমত বিএনপির বিরুদ্ধে গেছে।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে অংশ নিলেও জনসমর্থন পুনরুদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছে। বেশির ভাগ নেতাকর্মী আত্মগোপনে বা কারাগারে থাকায় নির্বাচনী প্রচারণা ও ভোটের দিন দলটি ছিল প্রায় অদৃশ্য। এর পরও নির্বাচন পুরোপুরি অবাধ ও সুষ্ঠু হলে বিএনপির জেতার সম্ভাবনা ছিল না বা অন্তত উল্লেখযোগ্য অর্জন হতো না এমন নয়। তবে নির্বাচনে বিএনপি যে অবিচারের শিকার হয়েছে সে ব্যাপারে জনগণের দৃশ্যমান অনাগ্রহ রয়েছে। আর ওই অনাগ্রহের মধ্যে স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে যে বিএনপি ভোটের ফলাফলে যদি জয় পেত তবে তার কারণ হতো ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি জনগণের ক্ষোভ; বিএনপির প্রতি জনগণের সমর্থনের কারণে নয়।

জনসম্পৃক্ত হতে বিএনপির ব্যর্থতা হিসেবে নিবন্ধে ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিকে কাজে লাগাতে না পারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ২০১৫ সাল থেকে তরুণদের তিনটি বড় আন্দোলনেও বিএনপি কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।

‘সুস্পষ্ট এজেন্ডাবিহীন বিএনপি’ প্রসঙ্গে নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ মনে করে যে বিএনপি ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে কী করবে সে বিষয়ে দলটি কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারে না। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির মূল দুটি দাবি ছিল, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচন কমিশন সংস্কার। নিবন্ধে উল্লেখ রয়েছে, ‘খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব নিয়ে দৃশ্যত বাংলাদেশের খুব কম লোকই চিন্তিত। সাধারণ ধারণা হলো, তিনি এক রাজনীতিবিদ। আর সব রাজনীতিবিদই দুর্নীতিপরায়ণ।’

অনেকে বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশে সমস্যাপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়া ঠিক করার সক্ষমতা বিএনপির নেই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পছন্দ করতে বলা হলে অনেক বাংলাদেশিই বলেন, ‘বিএনপি এমন কোন কাজটি করবে যা আওয়ামী এখন করছে না?’

আওয়ামী লীগ সফলভাবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে এবং ঐতিহ্যবাহী দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বিপন্ন করতে সক্ষম হয়েছে উল্লেখ করে নিবন্ধে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ ভালো করছে। এমন প্রেক্ষাপটে জনসমর্থন ফিরে পাওয়া এবং ‘সর্বময় ক্ষমতাশালী আওয়ামী লীগ’কে সরিয়ে বিরোধীদের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনার বিষয়ে প্রশ্নও তোলা হয়েছে নিবন্ধে। এর উত্তরেও সম্ভাবনা বেশ কম বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন দুই নিবন্ধকার।

তাঁরা বাংলাদেশে ভারসাম্যহীন শিল্প, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, উচ্চ হারে বেকারত্ব, সন্ত্রাসের ঝুঁকি, শরণার্থী সংকট, সীমান্ত সমস্যা ও বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপের কথা উল্লেখ করেছেন। ক্ষমতাসীন দলের ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র ও পুলিশের সমর্থনের প্রয়োজনের কথা বলেছেন। অর্থনৈতিকভাবে পতন বা রাজনৈতিকভাবে ভুল পদক্ষেপ সহজেই শেখ হাসিনার দলের পতন ডেকে আনতে পারে বলেও নিবন্ধে উল্লেখ রয়েছে।

মন্তব্য