kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

এবার শব্দদূষণের বিরুদ্ধে মাঠে নামছে সরকার

আরিফুর রহমান   

১০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এবার শব্দদূষণের বিরুদ্ধে মাঠে নামছে সরকার

বিয়েবাড়িতে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর প্রতিবাদ করায় গত বছর জানুয়ারিতে রাজধানীর গোপীবাগে নাজমুল হক নামের একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই সময় ঘটনাটি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু এক বছর পর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে ঝালকাঠিতে। গত ২ মার্চ গভীর রাতে পিকনিকের নামে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর প্রতিবাদ করায় আবদুল জলিল হাওলাদার নামের একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

রাজধানীর শেওড়াপাড়া বাজারে মৌমিতা জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী আবুল কালামকে জোরে না বললে তিনি ক্রেতার কথা বুঝতে পারেন না।

এ তিনটি ঘটনাই বলে দেয়, দেশে শব্দদূষণ কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, বিভাগ ছাড়িয়ে এখন জেলা পর্যায়েও শব্দদূষণের মাত্রা সীমা ছাড়িয়েছে। শব্দদূষণের কারণে দিন দিন বধিরের সংখ্যা বাড়ছে। মানুষের হৃৎকম্প বেড়েছে। উচ্চ রক্তচাপ, মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব হয়—এমন রোগীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

এমন বাস্তবতায় সারা দেশে শব্দদূষণ প্রতিরোধে একসঙ্গে মাঠে নামছে পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও স্থানীয় প্রশাসন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ২০০৬ সালে জারি করা বিধিমালা সম্পর্কে অনেকেই জানে না। উচ্চ শব্দ হলে কোথায়

কোথায় অভিযোগ করতে হয়, তা সাধারণ মানুষ জানে না। এতে সারা দেশে প্রতিনিয়তই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। সাধারণ মানুষ যাতে বিদ্যমান বিধিমালা সম্পর্কে অবহিত হয়, সে জন্য সারা দেশেই জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে পরিবেশ অধিদপ্তর। যেখানে স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করা হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, জাপানসহ বিশ্বের অনেক দেশেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের শব্দদূষণ এবং এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে শেখানো হয়। যাতে ছোট থেকেই তারা শব্দদূষণের ক্ষতির বিষয়ে জানতে পারে। বাংলাদেশেও সেই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সারা দেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাছাই করা এক লাখ শিক্ষার্থীকে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেবে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ ছাড়া বাস, ট্রাক, পিকআপসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে দেশজুড়ে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সুধীসমাজ, বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) প্রতিনিধি, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, মসজিদের ইমামদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, সারা দেশে ১০ হাজার সরকারি কর্মকর্তাকে শব্দ সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বাদ যাবে না কারখানা ও নির্মাণ শ্রমিকরাও। নির্বাচিত পাঁচ হাজার কারখানা ও নির্মাণ শ্রমিককেও সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। শব্দদূষণের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকায় প্রচার, আটটি বিভাগীয় শহরে ডিসপ্লে এবং শব্দ সচেতনতা দিবস উদ্যাপনেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাঁচ শতাধিক সাংবাদিক, চার হাজার পেশাজীবীকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ৩৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরে যে প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটা নিয়ে আগামী ১১ মার্চ আন্তর্মন্ত্রণালয় সভায় আলোচনা হবে। পরিকল্পনা কমিশনে এ সভা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের থাকতে বলা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়া পর কাজ শুরু হবে বলে পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ফরিদ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শব্দদূষণ নিয়ে এর আগে পরিবেশ অধিদপ্তর সীমিত পরিসরে কাজ করলেও এবারই প্রথম দেশজুড়ে করতে যাচ্ছে। এ ছাড়া ৬৪ জেলায় শব্দের মাত্রা পরিমাপের জন্য একটি জরিপ পরিচালনা করব।’

পরিবেশবিদরা সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, দেশে প্রতিনিয়তই যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে মোটরসাইকেলের সংখ্যা। অবকাঠামো নির্মাণ চলছে দেশজুড়ে। এসব কারণে শব্দদূষণের মাত্রা বাড়ছে। শব্দদূষণের মাত্রা কমাতে বিদ্যমান আইনের কঠোর বাস্তবায়ন এবং গণপরিবহনব্যবস্থা জোরদারের তাগিদ দেন তিনি।

শব্দদূষণ বিধিমালায় নীরব এলাকায় দিনে সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিবল, রাতে ৪০ ডেসিবল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ডেসিবল, রাতে ৪৫ ডেসিবল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ডেসিবল, রাতে ৬০ ডেসিবল, শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ডেসিবল, রাতে ৭০ ডেসিবল রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এসব এলাকায় বিদ্যমান মাত্রার চেয়েও দ্বিগুণ। ঢাকার পল্টন ও ফার্মগেটে সর্বোচ্চ ১৩২ ডেসিবল পর্যন্ত উঠছে। চট্টগ্রামে ১৩৩ ডেসিবল, খুলনায় সর্বোচ্চ ১৩২, বরিশালে ১৩১, রংপুরে ১৩০, রাজশাহীতে ১৩২ এবং ময়মনসিংহে ১৩০ ডেসিবল মাত্রা পেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। আগে কখনো জেলাওয়ারি জরিপ করা হয়নি।

স্থপতি ইকবাল হাবিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারত, থাইল্যান্ড, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সার্বক্ষণিক শব্দমাত্রা মনিটরিং নেটওয়ার্ক সিস্টেম চালু আছে। আমাদের দেশেও এ নেটওয়ার্ক চালু করা জরুরি।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা