kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পালন

আজাদুর রহমান চন্দন    

৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পালন

বঙ্গবন্ধুর আগের দিনের স্বাধীনতার ডাক ও সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতির নির্দেশে একাত্তরের ৮ মার্চ পাল্টে যায় পুরো দেশের চিত্র। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে শুরু করে বাঙালি। আগের দিন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ বেতারে সরাসরি সম্প্রচার না করায় স্বাধীনতার নেশায় পাগল বাঙালি ক্ষোভে ফেটে পড়ে। প্রচণ্ড গণবিক্ষোভ আর বেতারকর্মীদের আন্দোলনের মুখে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি বেতারে ৮ মার্চ সকালে প্রচার করতে বাধ্য হয় শাসকগোষ্ঠী।

১৯৭১ সালের ৮ মার্চ সকাল ৮টায় রেডিওতে ভেসে আসে বঙ্গবন্ধুর সেই অবিস্মরণীয় ভাষণ— ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলন চলতেই থাকে। আগের মতোই উত্তাল জনতা মিছিলে-সমাবেশে প্রকম্পিত করে রাখে সারা দেশ। বাংলার দামাল ছেলেরা দলে দলে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে সংগ্রামের। ওই দিন স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

একাত্তরের ৮ মার্চ ছিল সোমবার। ওই দিন তখনকার অন্যতম প্রধান দৈনিক ইত্তেফাক খবরটি ছাপে আট কলাম ব্যানারে। শিরোনাম ছিল, ‘পরিষদে যাওয়ার প্রশ্ন বিবেচনা করিতে পারি, যদি—’। শিরোনামের নিচে ছিল—‘(ক) অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করা হয়, (খ) সমস্ত সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়, (গ) নিরস্ত্র গণহত্যার তদন্ত করা হয় এবং (ঘ) নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।’ শিরোনামের নিচে বাঁদিকে ছিল গর্জে ওঠা বঙ্গবন্ধুর ছবি, যার ক্যাপশন ছিল, ‘....সামরিক বাহিনীকে অবিলম্বে ব্যারাকে ফিরাইয়া লও’। খবরের পেটে আরেকটি শিরোনাম ছিল, ‘আজ থেকে আমার নির্দেশ—’। খবরের নিচে আট কলামজুড়ে ছিল আগের দিনের সমাবেশে উপস্থিত হর্ষোৎফুল্ল লাখো মানুষের ছবি। ছবির ওপরে ক্যাপশন ছিল, ‘এবার বন্দী বুঝেছে মধুর প্রাণের চাইতে ত্রাণ, জয় নিপীড়িত জনগণ জয়, জয় নব উত্থান’। ৬-এর পৃষ্ঠাজুড়ে আলোকচিত্র ছাপা হয় ওই সমাবেশের।

তখনকার আরেক প্রধান দৈনিক ‘সংবাদ’ও সেদিন বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ছেপেছিল আট কলামজুড়ে। রিভার্স টাইপে শিরোনাম ছিল, ‘এবার স্বাধীনতার সংগ্রাম : মুজিব’। ওপরে দুই লাইনের শোল্ডার ছিল, ‘সামরিক আইন প্রত্যাহার ও গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দিলেই পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিব কি না ঠিক করিব’। খবরের ইন্ট্রো বা সূচনা ছিল বড় পয়েন্টে। মূল শিরোনামের নিচে ছিল বঙ্গবন্ধুর খাড়া ছবি। ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যেসব নির্দেশনা দিয়েছিলেন তা ‘মুজিবের নির্দেশ’ নামে আলাদা শিরোনামে ছাপা হয়। প্রথম পাতায় আরেকটি শিরোনাম ছিল, ‘কর্মচারীদের কাজ বর্জন : ঢাকা বেতার ও টেলিভিশন কেন্দ্র বন্ধ’। ভেতরে ছাপা হয়েছিল ‘শেখ মুজিবের বিবৃতির পূর্ণ বিবরণ’। ওই পাতায়ই ছিল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ছবি।

সংবাদে ‘গতকালের রেসকোর্স ময়দান’ শিরোনামে একটি খবর ছাপা হয়। খবরের প্রথম অনুচ্ছেদটি ছিল এ রকম—‘গতকাল রেসকোর্স ময়দান ছিল পূর্ব বাংলার বিভিন্ন শ্রেণির মুক্তিকামী মানুষের বিচিত্রময় সমাবেশে পূর্ণ।’ শেষ পাতায় ওপরের দিকে ছিল ‘সাংবাদিক সম্মেলনে আসগর খান : শেখ মুজিবের গৃহীত সকল ব্যবস্থাই যুক্তিসংগত’ এবং ‘—এই দাবি সর্বনিম্ন সর্বন্যায্য : মোজাফফর’।

একাত্তরের ৮ মার্চ ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ এবং ডাকসুর সহসভাপতি আ স ম আব্দুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছিলেন, বাংলার বর্তমান মুক্তি আন্দোলনকে ‘স্বাধীনতার আন্দোলন’ ঘোষণা করে স্বাধীন বাংলার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক জনসভায় যে প্রত্যক্ষ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন আমরা তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য বাংলার সংগ্রামী জনতার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঘোষিত নির্দেশের ব্যাখ্যা দেন। এতে বলা হয়, ব্যাংকসমূহ সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ভেতরে নগদ জমা, বেতন ও মজুরি প্রদান, এক হাজার টাকা পর্যন্ত প্রদান এবং আন্ত ব্যাংক ক্লিয়ারেন্স ও নগদ লেনদেন করতে পারবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় বিভাগগুলো খোলা থাকবে। সার সরবরাহ ও পাওয়ার পাম্পের ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। পোস্ট অফিস সেভিংস ব্যাংক খোলা থাকবে। পানি ও গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।

ঢাকা থেকে পাঠানো ওয়াশিংটন পোস্টের স্টাফ রাইটার রোনাল্ড কোভেনের ৮ মার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাধীনতা ঘোষণার কাছাকাছি গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর প্রদেশ থেকে অবিলম্বে সেনা প্রত্যাহার ও সেনা শাসনের অবসান দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে। তিনি বলেছেন, তাঁর দাবি না মানা পর্যন্ত ২৫ মার্চ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। তিনি আরো দুটি শর্ত দিয়েছেন : সেনাবাহিনীর গুলিতে হত্যার ঘটনার তদন্ত করতে হবে আর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, মুজিব তাঁর অনুসারীদের আহ্বান জানিয়েছেন পশ্চিম পাকিস্তানি শোষণ থেকে ‘যেকোনো মূল্যে’ মুক্তির জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার প্রস্ততি নিয়ে রাখতে। গুঞ্জন ছিল মুজিবুর পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারেন। তাঁর এক ঘনিষ্ঠজন জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন মুজিবের।

৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে পরদিন দ্য টাইমস পত্রিকায় পল মার্টিন ঢাকা থেকে লেখেন, গতকালের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ভাষণে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান চারটি দাবি উত্থাপন করে বলেছেন, এগুলো মানলেই কেবল ২৫শে মার্চ কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলি অধিবেশনে যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করা হবে। পূর্ব পাকিস্তানে এখন একমাত্র কার্যকর নেতা শেখ মুজিব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা