kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নারীর গৃহস্থালি কাজ ‘অমূল্য’

চাই স্বীকৃতি ও আলাদা হিসাব

আরিফুর রহমান   

৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নারীর গৃহস্থালি কাজ ‘অমূল্য’

ড. তানিয়া হক

প্রতিদিন গৃহস্থালির কাজে যতটুকু সময় খরচ করেন, এর আর্থিক মূল্য নিয়ে কখনো ভেবেছেন? এমন প্রশ্নে বেশ রূঢ় কণ্ঠে রাজধানীর শেওড়াপাড়ার গৃহিণী আফরোজা খানম বললেন, ‘আমার দুই সন্তানকে লালন-পালন করছি, এর আর্থিক মূল্য নিরূপণ করা কখনো সম্ভব? ভালোবাসার কোনো মূল্য হয় না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক গৃহস্থালিতে নারীর কাজ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েও একই রকম উত্তর পেয়েছেন। নারীরা বলেছেন, ঘরের কাজের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক নেই। আছে আবেগ, দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসা, যার কোনো মূল্য হয় না।

অধ্যাপক তানিয়ার মতে, ‘বাংলাদেশের নারীরা গৃহস্থালির কাজকে আর্থিক মূল্যে নিরূপণের বিষয়টি এখনো চিন্তার মধ্যেই আনতে পারেননি।’

গৃহস্থালিতে নারীর কাজের হিসাব মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে যোগ হয় না। জিডিপি নিরূপণে জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্বব্যাপী প্রণিধানযোগ্য যে সিস্টেম অব ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস (এসএনএ) রয়েছে, সেখানে নারীদের গৃহস্থালির কাজের আর্থিক মূল্য জিডিপিতে যোগ করার কোনো দিকনির্দেশ দেওয়া হয়নি। ফলে বিশ্বে কোনো দেশেই নারীর গৃহস্থালির কাজ জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না। অবশ্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নারীর গৃহস্থালির কাজ জিডিপিতে যোগ করার দাবি উঠেছে বেশ কয়েক বছর ধরেই।

নারী কর্মীরা বলছেন, একজন নারী ঘরের মধ্যে প্রতিদিন যে কাজ করছেন, এর মূল্যায়ন না হওয়ায় অর্থনীতিতে নারীর অবদান আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

বেশ কয়েকজন নারী গবেষক কালের কণ্ঠকে বলেছেন, নারীর গৃহস্থালির কাজ জিডিপিতে না হোক, অন্তত একটা ছায়া হিসাবেও যদি আসত, তাহলে জানা যেত একজন নারী ঘরে যে কাজ করছেন, তা বাইরে করলে কত পেতেন। কিংবা একজন নারী ঘরে সন্তান লালন-পালনের বাইরেও নৈমিত্তিক যেসব কাজ করছেন, সেগুলো অন্য কাউকে দিয়ে করালে কত টাকা খরচ হতো। এতে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসত বলে তাঁরা মনে করেন।

গৃহস্থালিতে নারী শ্রমের আর্থিক মূল্য নিয়ে চার বছর আগে একটি গবেষণা করেছিল বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। গবেষণায় দেখা গেছে, গৃহস্থালিতে নারীরা যে কাজ করেন, এর আর্থিক মূল্য ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জিডিপির ৭৬ শতাংশের সমান। অর্থাৎ ওই বছর জিডিপি যদি হয় ১০০ টাকা, নারীর কাজ অন্তর্ভুক্ত করলে সেটা দাঁড়ায় ১৭৬ টাকা।

ওই গবেষণায় দেখা গেছে, একজন নারী দৈনিক ১৬ ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজ করে থাকেন। সেখানে পুরুষ গৃহস্থালির কাজ করেন মাত্র দুই ঘণ্টা। পুরুষের কাজের ৯৮ শতাংশই যেখানে জিডিপিতে যোগ হচ্ছে, সেখানে নারীর কাজের মাত্র ৪৭ শতাংশ জিডিপিতে যোগ হচ্ছে বলে ওই গবেষণায় উঠে এসেছে।

তবে ওই গবেষণার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, একজন নারী তাঁর সন্তানের পেছনে সময় দিচ্ছেন। এই মমতা, ভালোবাসার আর্থিক মূল্য কিভাবে নিরূপিত হবে। তিনি মনে করেন, জিডিপি নিরূপিত হয় উৎপাদন ও ব্যয় দিয়ে। নারীর গৃহস্থালির কাজের মূল্য জিডিপিতে যোগ করা মূল্যহীন। বরং আলাদা একটি হিসাব করা যেতে পারে। একজন নারী বাইরে যে কাজটি বেতন কিংবা মজুরির বিনিময়ে করতে পারতেন, সেই সময়টি তিনি ঘরেই দিচ্ছেন। তাঁর মতে, গৃহস্থালিতে টাকার স্বীকৃতির চেয়ে পুরুষের ঘরের কাজে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।

গবেষক ড. তানিয়া হক তাঁর গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন, নারী বিনা পারিশ্রমিকে যে কাজ ঘরে করছেন, তা অলক্ষ্যেই থেকে যাচ্ছে। নারীর অবৈতনিক গৃহকর্মকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কারণ ঘরের কাজকর্ম যদি সঠিকভাবে না চলে, তা জাতীয় অগ্রগতিকে চরমভাবে ব্যাহত করে। কল্যাণের মানদণ্ডে বিচার করতে হবে নারীদের অবৈতনিক এই সেবাকে। নারীদের গৃহস্থালির কাজকে যথাযথ স্বীকৃতি দিয়ে এই কাজের ভার পুরুষদের ওপরও কিভাবে দেওয়া যায়, সেই পথ খুঁজতে হবে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আমরাও বলছি, ভালোবাসা অমূল্য। তবে নারীরা ঘরে যেসব কাজ করেন, তা অন্য কাউকে দিয়ে করালে কত টাকা দিতে হতো, এর একটি ছায়া মূল্য করা যেতে পারে।’ তিনি বলেন, এসএনএর আলোকে নারীর গৃহস্থালির কাজ জিডিপিতে যোগ হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু আলাদা একটি স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টস তো করা যেতে পারে। যেটা বিশ্বের অনেক দেশে আছে। তাহলে জানা যাবে, নারীর গৃহস্থালির অবদান কতটুকু।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় হিসাব শাখার পরিচালক আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশ জিডিপি হিসাব করে এসএনএ অনুসারে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর ফলে জিডিপিতে নারীদের গৃহস্থালির কাজ যুক্ত করার সুযোগ নেই। করতে হলে বিশ্বের সব দেশকেই করতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা