kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

নারী ছিনতাইকারী বেড়েছে নিচ্ছে নানা কৌশল

আশরাফ-উল-আলম ও রেজোয়ান বিশ্বাস   

৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নারী ছিনতাইকারী বেড়েছে নিচ্ছে নানা কৌশল

প্রতীক ছবি

রাজশাহী মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক রায়হানা আক্তার প্রতিদিনের মতো মহিষবাথানের বাড়ি থেকে কলেজে যাচ্ছিলেন। তিনি একটি অটোরিকশায় ওঠেন। অটোরিকশার কাছেই ছিল পাঁচ নারী। তারাও উঠে পড়ে অটোরিকশায়। অধ্যাপক বাধা দেন। কিন্তু পাঁচ নারী নাছোড়বান্দা। তারা কেউ কেউ অধ্যাপককে ‘আন্টি, আপু’ বলে সম্বোধন করেন। বলেন, ‘এটুকু রাস্তা। চলেন একসঙ্গেই যাই। আমরাও তো মেয়ে। অসুবিধা কী?’ অধ্যাপক রাজি হন। কিন্তু কিছদূর গিয়েই তারা ছুরি, চাকু বের করে রায়হানা আক্তারের কাছে যা আছে দিয়ে দিতে বলে। গলার চেন নিয়ে টানাটানি করতে থাকে। অধ্যাপকের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে পাঁচজনকেই আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকের ঘটনা এটি। পরে ওই অধ্যাপক থানায় মামলা করেন। রাজপাড়া থানা সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ নারী ছিনতাইকারীর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাছিরনগর উপজেলার ধরমণ্ডল গ্রামে। ওই দিন সকালেই তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে রাজশাহীতে এসে ছিনতাইয়ে নেমে পড়ে।

গত ২১ জানুয়ারি সাভারে যাত্রীবাহী বাসে ছিনতাইকালে সংঘবদ্ধ নারী ছিনতাইকারীচক্রের সাত সদস্যকে আটক করে পুলিশ। ওই দিন সকালে সকালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভারের গেণ্ডা বাসস্ট্যান্ড থেকে তাদের আটক করা হয়। আটককৃতরা হলো, মায়েরুন, কমলা, মিতু, ফরিদা, বানেছা, জামেলা ও মারুফা । এরাও সবাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাছিরনগর উপজেলার ধরমণ্ডল গ্রামের বাসিন্দা। এ মামলার সূত্রে জানা যায়, ওই দিন সকালে গেণ্ডা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসটিতে যাত্রীবেশে ওঠে আটককৃতরা। বাসের ভেতরে এক নারীর গলার সোনার চেন ছিনিয়ে নিয়ে বাস থেকে দ্রুত নেমে যেতে চেষ্টা

করে বোরকা পরিহিত এক নারী। ছিনতাইয়ের শিকার ওই নারী চিৎকার করলে অন্য যাত্রীরা নারী ছিনতাইকারীকে ধরে ফেলে। এ সময় বাসে থাকা চক্রটির অন্য ছয় নারী সদস্য তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তাদেরও আটক করে যাত্রীরা। পুলিশে সোপর্দ করার পর তারা একই গ্রুপের সদস্য বলে স্বীকার করে।

গত ১২ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় ছিনতাইকালে হাতেনাতে তিন নারীকে আটক করে র‌্যাব। মোহাম্মদপুর বসিলা ১ নম্বর গেটের পাশে ‘জাহানারা গ্যাস হাউসে’ ছিনতাইকালেই তাদের আটক করা হয়। এরা হলো, রোজিনা বেগম, নারগিস ও গুলনাহার ।

গত ৩০ অক্টোবর রফিকুল নামের একজন রাজধানীর ফার্মগেট থেকে রিকশায় ওঠেন ধানমণ্ডি যাওয়ার জন্য। এ সময় এক তরুণী এসে জানায়, সে জরুরি কাজে ধানমণ্ডি যাবে, কিন্তু কোনো রিকশা পাচ্ছে না। তাকে নিয়ে গেলে খুব উপকার হয়। রফিকুল তরুণীকে ভদ্র নারী মনে করেই রিকশায় তোলেন। রিকশা সোবহানবাগ মসজিদের কাছে এলেই রফিকুলের টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিতে থাকে তরুণী। রফিকুল প্রতিবাদ করলে তরুণী চিৎকার দেবে বলে জানায়। তরুণী বলে, ‘আপনি যে আমার গায়ে হাত দিয়েছেন তা সবাইকে জানাব।’ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রফিকুল টাকা-পয়সার মায়া ত্যাগ করে চলে যান।

এভাবে নারী ছিনতাইকারীদের খপ্পরে পড়ছে অনেকে। ঈদ বা বিভিন্ন উৎসব সামনে রেখে নানা কৌশল নিয়ে মাঠে নামছে নারী ছিনতাইকারীরা। ছিনতাইয়ে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে তারা। রিকশায় আরোহী হওয়া ছাড়াও নানাভাবে পুরুষদের প্রলুব্ধ করে লুটে নেয় টাকা-পয়সা। নারীদেরও বিশেষ কায়দায় টার্গেট করে তারা।

গত বছর ৩০ অক্টোবর রাজধানীর গুলিস্তান থেকে নারী ছিনতাইকারীচক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করে পুলিশ। এরা হলো নাজমা, তাসলিমা, দিলারা, কুলসুমা ও নিলময়। বয়সে সবাই তরুণী। থাকে হাজারীবাগের বেড়িবাঁধ এলাকার সুমনের বস্তিতে। আটককৃতরা জানায়, তারা নারী হওয়ার কারণে ছিনতাইয়ের শিকার পুরুষরা সেভাবে অভিযোগ করতে পারে না। অনেক সময় তাদের চক্রে পুরুষ সদস্যরাও থাকে। তারা সাধারণ মানুষ সেজে ছিনতাইকারী নারীর পক্ষে অবস্থান নেয়।

বিভিন্ন সময়ে আটককৃত নারী ছিনতাইকারীরা জানায়, বিভিন্ন শপিং মল, নিরিবিলি সড়ক, বিয়ে অনুষ্ঠান, পার্টিই তাদের ছিনতাইয়ের মূল কেন্দ্রস্থল। এ ছাড়া ফোনে প্রেমের ফাঁদ পেতে নির্জন ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে সর্বস্ব লুটে নেয় এই চক্রের সদস্যরা। বনানীতে গত বছর এমন ফাঁদে পা দিয়ে একজন খুনও হন। রাজধানীতে এই ছিনতাইচক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশেই।

নারী ছিনতাইকারীদের অনেকে বোরকা পরে পথচারীদের সালাম দেয়। এরপর কথা শোনার জন্য অনুরোধ করে। বিপদে পড়ার কথা বলে টাকা চায়। একপর্যায়ে তারা ছিনতাই শুরু করে। পথচারীদের গায়ে ধাক্কা মেরে চিৎকার দিয়েও ছিনতাই কাজ চালায় এক ধরনের নারী ছিনতাইকারী।

গত বছর ২ জানুয়ারি নবীনগর বাসস্ট্যান্ডে সাত নারী ছিনতাইকারী—ফুলচান বেগম, জুলেহা বেগম, হানু বেগম, তাসলিমা, আজুফা, শারমিন আক্তার ও শামছুন্নাহারকে আটক করে পুলিশ। ১০ এপ্রিল রাজশাহীর জিপিওর পাশে এক নারীর দুই লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার সময় জ্যোস্না নামের এক ছিনতাইকারী আটক হয়। ৩০ জুন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফকিরহাট এলাকা থেকে রাহেলা, আফিয়া, ফুলতারা, শাহার বানু, সুলতানা, নাজমা ও মরিয়মকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭ সেপ্টেম্বর আশুগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে সুমি, সাফিয়া, কুলসোমা, নাছিমা ও রুনা নামের পাঁচ নারীকে আটক করে পুলিশ। চাঁদপুর, হবিগঞ্জ, সোনাগাজী, শ্রীমঙ্গল, গাজীপুর, ঢাকার মোহাম্মদপুর, উত্তরা, মহাখালী বাস টার্মিনাল, সদরঘাট, চাঁদপুরের কচুয়া শহরসহ বিভিন্ন স্থানে নারী ছিনতাইকারী আটকের খবর পাওয়া গেছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিভিন্ন সময়ে অনেক নারী ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহেও সাত-আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে জামিনে বের হয়ে এরা আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ে। সারা দেশে শহর এলাকায় র‌্যাবের টহল টিমের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে এদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। তার পরও পথচারী ও যাত্রীদের সতর্ক হয়ে চলা উচিত। সমস্যা হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্য নিতে হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান বলেন, রাজধানীর ছিনতাই অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। তবে বিচ্ছিন্নভাবে অনেক সময় ভোরের দিকে কিছু ছিনতাই হয়। এরা বোরকা পরাসহ ছদ্মবেশে থেকে পথচারীদের টার্গেট করে। পুলিশ ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় বাড়তি নজরদারিতে রয়েছে।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা