kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মাদক মামলা নিষ্পত্তিতে দৃষ্টান্ত

চার মাসে ১৯ মামলায় সব আসামির কারাদণ্ড

আশরাফ-উল-আলম   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চার মাসে ১৯ মামলায় সব আসামির কারাদণ্ড

রাজধানীর পল্লবী থানার মিল্লাত ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. রাজু ওরফে পূর্ন্নি রাজুকে ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই আটক করেছিল পুলিশ। তার প্যান্টের পকেট থেকে একটি সাদা পলিথিনে মুড়িয়ে রাখা এক হাজার ৫৫০ পুরিয়া (২০৫ গ্রাম) হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় পল্লবী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেছিল পুলিশ। বিচার শেষে গত ১৪ জানুয়ারি রায় ঘোষণা করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬। তাতে আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

একই আদালত মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. রাজুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন গত ১৭ জানুয়ারি। রাজুর কাছ থেকে ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই ২০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করেছিল শেরেবাংলানগর থানার পুলিশ।

একইভাবে গত চার মাসে ওই আদালত মাদকদ্রব্য আইনের ১৯টি মামলায় ২২ আসামির সবাইকে সাজা দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ওই সব মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

দেশে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের পাশাপাশি উচ্চ আদালতও বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন। এর পরও দেশে মাদকের সাড়ে তিন লাখ মামলা ঝুলে আছে বলে জানা যায়। বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন ওই সব মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এ অবস্থায় চার মাসে ১৯ মামলার রায়ে সব আসামিকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা প্রশংসার দাবি রাখে বলে মনে করেন আইনজীবীরা।

কয়েকজন আইনজীবী বলেন, মাদকের মামলায় আদালতে সাক্ষী হাজির না হওয়া, সাক্ষী প্রভাবিত হওয়া, মামলা দায়ের করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ত্রুটি থাকায় খালাসও পেয়ে যায় আসামিরা। এমন অবস্থার মধ্যে ১৯টি মামলার রায়ে আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা প্রশংসাযোগ্য।

ঢাকার আদালতের সিনিয়র আইনজীবী শাহজাহান মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন বন্ধ করতে আদালতের এসব রায় অবশ্যই মাদক কারবারিদের জন্য একটি সংকেত। মাদকের মামলার বিচার হয় না। বেশির ভাগ মামলার আসামিরা বিভিন্ন কৌশলে খালাস পেয়ে যায়। সেখানে ১৯ মামলার রায়ে ২২ আসামিকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা বিরল।

ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এর আগে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর বিচারক ছিলেন কে এম ইমরুল কায়েশ। তাঁর কড়া নির্দেশে সাক্ষীরা আদালতে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। এরপর নতুন বিচারক ড. শেখ গোলাম মাহবুব যোগদানের পর মামলাগুলো অল্প সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করে প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। মাদক ব্যবসা বা মাদকদ্রব্যের সঙ্গে জড়িতদের জন্য একটি সংকেত। দেশের যেসব আদালতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের হওয়া মামলা বিচারাধীন রয়েছে সেসব আদালতের বিচারকগণ এমন উদ্যোগ নিলে অবশ্য মাদকসংশ্লিষ্টরা ভীত হয়ে কিছুটা হলেও মাদকের সংস্পর্শ ত্যাগ করবে। ১৯ মামলার সব আসামিকে শাস্তি দেওয়া অবশ্যই অনন্য দৃষ্টান্ত।’

আদালত সূত্রে জানা গেছে, বিচারক ড. শেখ গোলাম মাহবুব (জেলা জজ) গত বছর ৬ সেপ্টেম্বর বিশেষ জজ আদালত-৬-এ যোগ দেন। এর পরই তিনি তাঁর আদালতের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেন। এরই মধ্যে চাঞ্চল্যকর দুটি দুর্নীতির মামলায় রায় দিয়েছেন। আরো অনেক মামলাই নিষ্পত্তি হওয়ার পথে। বিশেষভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে মাদকের মামলার বিচারকাজও তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকার আদালতের আইনজীবীরা মনে করেন, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে বিচারক আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এমনভাবে সব আদালতে বিচারকাজ চললে একদিকে অপরাধ দমন হবে, অন্যদিকে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তিও কমবে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, দুটি মামলায় ভয়াবহ মাদক হেরোইন উদ্ধারের ঘটনায় দুই আসামির যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। ওই আসামিরা কারাগারে আছে। বিচার চলাকালে এদের জামিনও দেওয়া হয়নি। অন্যান্য মামলার রায়েও আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সূত্র মতে, বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. শেখ গোলাম মাহবুব গত বছর ৬ সেপ্টেম্বর এই আদালতে যোগ দেওয়ার পর ৯ সেপ্টেম্বর প্রথম রায়ে পাঁচ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মো. বিপ্লব মিয়া নামের এক আসামিকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন। এর পরদিন ১০ সেপ্টেম্বর দুটি মাদক মামলার রায় দেন। তাতে দশ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধারের মামলায় লাক্কু মিয়াকে দুই বছরের এবং দুই গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় আহাম্মদ আলীকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন। ১৮ সেপ্টেম্বর মো. রিপনকে তিন বছর, ১৪ অক্টোবর পারভীন ওরফে ফাহিমাকে তিন বছর, ১৫ অক্টোবর রফিকুল ইসলামকে ছয় বছর এবং তাজুল ইসলাম ও সেলিনাকে চার বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৮ অক্টোবর শাহাদৎ হোসেনকে তিন বছর, ২১ অক্টোবর দেলোয়ার হোসেন দিলাকে পাঁচ বছর, ২৪ অক্টোবর মো. আ. সালাম ও বিল্লাল হোসেন ডেনীকে দুই বছর ছয় মাস, ২২ নভেম্বর সোহেল শাহকে দুই বছর, ৬ ডিসেম্বর মিঠু শেখকে তিন বছর, ১১ ডিসেম্বর রফিকুল ইসলাম টুটুলকে দুই বছর, ১২ ডিসেম্বর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার মামলায় আবদুস সালাম, বেলাল হোসেন, শংকর ডি কস্তা ও আলমাছকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দেন আদালত। গত ১ জানুয়ারি মো. শফিককে তিন বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা