kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

চকবাজার ট্র্যাজেডি

ইমারত আইন লঙ্ঘন করেই পুরান ঢাকায় অবৈধ ব্যবসা

অনুমোদনহীন রাসায়নিক ব্যবসা, দায় কার?

আশরাফ-উল-আলম   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইমারত আইন লঙ্ঘন করেই পুরান ঢাকায় অবৈধ ব্যবসা

স্বাধীনতার অনেক আগে ১৯৫১ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ইমারত নির্মাণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশের পর ১৯৫২ সালে ইমারত নির্মাণ আইন করা হয়, যা ১৯৫৩ সালে কার্যকর হয়। স্বাধীনতার পর এই আইন সংশোধন করা হয়। মূলত দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করতে পারে—এমন এলোমেলো ইমারত নির্মাণ ও জলাধার খনন নিবারণের জন্য এই আইন প্রণয়ন করা হয়।

ইমারত নির্মাণ আইনের ৩ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, ইমারত নির্মাণ যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে সে উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ইমারত ব্যবহার করা যাবে না। অর্থাৎ আবাসিক বাড়ির জন্য ইমারত নির্মাণের অনুমতি নিলে ওই ভবনকে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

ইমারত নির্মাণ আইনে বলা হয়েছে, ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেউ ইমারত নির্মাণ করলে সরকারের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ ওই ইমারত ভেঙে ফেলার বা অপসারণের নির্দেশ দিতে পারবে। আবার উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ স্বউদ্যোগে অবৈধ ইমারত ভেঙে ফেলতে বা অপসারণ করতে পারবে।

ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-তে প্রদত্ত ক্ষমতা বলে সরকার ১৯৯৬ সালে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রণয়ন করে। পরে ভূমি ব্যবহারের জন্য নীতিমালাও করা হয়। এই নীতিমালায় বলা হয়েছে (ক) সব রকম ইমারত নির্মাণ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত সংশ্লিষ্ট শহর, নগর বা মহানগরীর মহাপরিকল্পনায় নির্দেশিত ভূমি ব্যবহারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। (খ) আবাসিক বা অন্যান্য ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত স্থানে আবাসিক ছাড়াও অনধিক ১০ শয্যাবিশিষ্ট ক্লিনিক, ব্যাংক, ফাস্টফুড রেস্তোরাঁ, দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রীর দোকান, সেলুন, চিকিৎসকের চেম্বার, ঔষধালয়, সংবাদপত্র বিক্রয় কেন্দ্র, ফুলের দোকান, লাইব্রেরি, ভিডিও ক্লাব, নার্সারি স্কুল, লন্ড্রি ও টেইলারিং শপের জন্য ইমারত নির্মাণ করা যাবে। তবে এ রকম ইমারত কেবল দুটি রাস্তার সংযোগস্থলে নির্মাণ করা যাবে। যার মধ্যে একটি রাস্তা কমপক্ষে ছয় মিটার প্রশস্ত হতে হবে এবং ওই ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে আবাসিক ইমারত নির্মাণসংক্রান্ত বিধান প্রযোজ্য হবে। (গ) আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত স্থানে আবাসিক, বাণিজ্যিক অথবা উভয় উদ্দেশ্যে ভবন নির্মাণ করা যাবে। তবে বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে। এসব ভবন ব্যবহারে গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। থাকতে হবে প্রশস্ত রাস্তাও। রাস্তা হবে কমপক্ষে ২৩ মিটার প্রশস্ত।

অবশ্য ঢাকা মহানগরীর জন্য ২০০৮ সালে নতুন করে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা করা হয়। এই বিধিমালার ৩ (চ) নম্বর সারণিতে শিল্প-কারখানা, গুদাম ও বিপজ্জনক ব্যবহারের ভবন তৈরির কথা বলা হয়েছে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী, আবাসিক স্থানে বিপজ্জনক দ্রব্যের গুদাম বা কারখানা করা যাবে না। এই বিধিমালায় ‘ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট’ এর সংজ্ঞায় একমাত্র বসবাসের জন্য নির্মিত স্থান এবং ‘বসতবাড়ি’ অর্থ রান্নাঘর, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থাসহ বসবাস করার উপযোগী ভবন। অর্থাৎ আবাসিক সুবিধা যেখানে, সেখানে কারখানা বা বিপজ্জনক দ্রব্য ব্যবহারের কোনো সুযোগ থাকতে পারবে না।

সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালায় সুস্পষ্ট বিধান থাকলেও পুরান ঢাকার লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, কোতোয়ালি থানার বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক ভবনগুলোয় রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা চলছে। নিমতলী ট্র্যাজেডির পর চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকায় গত বুধবার রাতের আগুনে ৬৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন নড়েচড়ে বসলেও এত মৃত্যুর দায় কোনো সংস্থা নিতে চাচ্ছে না।

অনুমোদনহীনভাবে পুরান ঢাকায় যে অবৈধভাবে ব্যবসা চলছে তা দেখার দায়িত্ব কার তা নিয়েও বিতর্ক চলছে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনুমোদনহীনভাবে আবাসিক এলাকায় বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম বা কারখানা রয়েছে—বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা অনুসন্ধান করছি। আবাসিক ভবনে এ ধরনের ব্যবসা অবশ্যই অবৈধ। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এ ধরনের কোনো অনুমোদন দেয়নি। জনবসতিপূর্ণ এসব এলাকায় অতি গোপনে ব্যবসা করে আসছে কিছু ব্যবসায়ী।’

মন্ত্রী বলেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে যদি এই ব্যবসা করা হয় তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এসব ব্যবসা করার জন্য যারা লাইসেন্স দিয়েছে তাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। কী ব্যবসা করছে তা দেখার দায়িত্ব তাদের। আবাসিক এলাকায় বেআইনি কোনো কারবার যদি দৃশ্যমান হয় তাহলেই কেবল রাজউক ব্যবস্থা নিতে পারে। অন্যথায় নয়।

চকবাজার ট্র্যাজেডির পর শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেছেন, কেমিক্যালের সঙ্গে এ ঘটনা সম্পৃক্ত নয়। এটা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। তিনি অবশ্য এও বলেন, রাসায়নিক গুদাম বা কারখানা সরিয়ে নেওয়া হবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান বলেছেন, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক গুদাম বা কারখানার অনুমোদন ফায়ার সার্ভিস কখনো দেয় না।

বিস্ফোরক অধিপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. শামসুল আলম বলেছেন, ২৯ ধরনের বিস্ফোরকদ্রব্যের ব্যবসা করতে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদন নিতে হয়। এর বাইরের কোনো পদার্থ সেটা দাহ্য পদার্থ হোক আর যাই হোক তার অনুমোদন এই অধিদপ্তর দেয় না। চকবাজার ট্র্যাজেডির দায় তাদের না।

পরিবেশ আইনে রাসায়নিক দ্রব্য বেআইনিভাবে মজুদ বা সংরক্ষণ করার জন্য শাস্তির বিধান থাকলেও তারা কখনো পুরান ঢাকায় অভিযান চালায়নি। তাদের অনুমোদন নেওয়া হয় না।

ঢাকার জেলা প্রশাসন নিমতলী ট্র্যাজেডির পর ৪০০ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে রাসায়নিক গুদাম উচ্ছেদের ঘোষণা দিলেও গত ৯ বছরে তা কার্যকর হয়নি। এর মধ্যে আরেকটি বড় দুর্ঘটনা ঘটলেও তার দায় জেলা প্রশাসন নিচ্ছে না।

তবে ব্যবসার লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবারের প্রাণহানির পর উঠে পড়ে লেগেছে। মেয়র সাঈদ খোকন কালের কণ্ঠকে বলেছেন, তাঁরা গুদামের কোনো লাইসেন্স দেননি। তবে শো রুমের জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়। তবে এখন এসব অবৈধ গুদাম সরানোর জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি ভবনে চিরুনি অভিযান চালিয়ে রাসায়নিক গুদাম সরানো হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা