kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জীবন্ত বইয়ের খোঁজে

সফেদ ফরাজী   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জীবন্ত বইয়ের খোঁজে

‘পৃথিবীর শেষ বইটি লেখা হয়ে গেছে। প্রতিদিনের অজস্র বই লেখার ফাঁকে, কখন, সকলের অজান্তে, একদিন লেখা হয়ে গেছে শেষ বইটি। সম্ভবত ১৯৮৫ সালে কিংবা ১৯৯২-তে, সম্ভবত পেরু কিংবা ঘানা কিংবা বাংলাদেশে কিংবা হতেও পারে মঙ্গোলিয়ায়। সেই বইটি নিয়ে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় এবং অভিভূত আনন্দে আলোচনা করেছেন মাত্র দশ-বারোজন লোক, একটা অন্ধকার, ধুলোভর্তি চায়ের দোকানে বসে, রাত্রিবেলা। তারপর তারাও সেই বইটির কথা ভুলে গেছে। কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি যে সেই বইটিই ছিল পৃথিবীর শেষ জ্যান্ত লেখকের লেখা পৃথিবীর শেষ জ্যান্ত বই। পৃথিবীর শেষ জ্যান্ত ডোডো পাখির মতো। এর পরও, প্রতিদিন, পৃথিবীজুড়ে ভ্রূক্ষেপহীনভাবে লেখা হয়ে চলেছে অসংখ্য বই, কিন্তু সেগুলো সমস্তই মৃত বই, ক্লান্তিহীন মৃত লেখকেরা সেগুলো লিখে চলেছেন। আর, চতুর্দিকে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে বিনির্মাণতত্ত্বের অধ্যাপক, সাবানসিরিয়ালের ঠিকাদার, মেধাসম্পত্তির পুলিশ। কী করে এই অগুনতি মৃত বইয়ের ক্রমস্ফীতমান গোলকধাঁধার মধ্য থেকে চিনে নিতে পারব সেই শেষ জ্যান্ত বইটিকে, অজস্র মৃত ডোডো পাখির স্টাফ্ড পুতুলের ভেতরে লুকিয়ে বসে থাকা সেই শেষ জ্যান্ত ডোডো পাখিটিকে, হাত দিলেই টের পাব তার পালক-ঢাকা বুকের ধুকপুকানি? সন্ধান শুধু জানেন সেই দশ-বারোজন ছন্নছাড়া লোক, কিন্তু কোথায় আর তাঁদের দেখা পাব? গ্রামেগঞ্জে মফস্বলে, শহরে-বন্দরে, আমি তাঁদেরকেই খুঁজে চলেছি, যেখানে যত অন্ধকার, ধুলোভর্তি চায়ের দোকানে...।’

‘শেষ বই’ শিরোনামে কবি রণজিৎ দাশের এ কবিতাটি যখনই পড়ি, পড়ে যাই গোলকধাঁধায়—চারপাশে এই যে এত এত বইয়ের সারি, এত এত লেখক, কোনটা আসলে জ্যান্ত বই? জ্যান্ত লেখকের জ্যান্ত বই? কী করে চিনব তাঁকে? চেনার উপায়ইবা কী? আর তা যদি হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলার মতো বড় কোনো আয়োজনে, তাহলে!

হয়তো এসব প্রশ্নঝড় পেরিয়ে নিজস্ব বীক্ষণে পছন্দের বইটির কাছে ঠিকঠিক পৌঁছে যায় প্রকৃত পাঠক, একা। হয়তো তার অন্তর্গত রক্তের ভেতর ‘কোনো এক বিপন্ন বিস্ময়’ খেলা করে, অন্তর্চক্ষু প্রস্ফুটিত স্বচ্ছ আলোকলতা; ভাবের আগুনে সিদ্ধ তার জগৎ। যে পাঠক নিজেই নিজের দেবতা।  

কালে কালে পোশাকি প্রেমে, লোভে, হিংসায়, মিথ্যায়, পাপে ডুবে, শেষ হয়ে গেল কত যে প্রাণ! কিন্তু বইয়ে? কেউ মরেনি বইয়ে ডুবে! বই জাগায় মন, খোলে জ্ঞানের অগুনতি দরজা—যে জ্ঞান স্বপ্নের, নতুন জীবনের, সত্যের—যা উন্মোচন করে অস্তিত্ব-জটিল বাস্তবতার গভীর স্তর বা তৈরি করে আরেক বাস্তবতা, যার প্রতিবিম্ব, প্রতিফলন বা ছায়াপাত ঘটে ব্যক্তির জীবনে, কর্মে। তাই জ্যান্ত বই পাঠের বিকল্প নেই। হয়তো এ জন্যই কবি ও দার্শনিক ওমর খৈয়াম বলেছেন, ‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে, কিন্তু একখানা বই অনন্ত যৌবনা, যদি তেমন বই হয়।’

‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’—এই বাণী দেওয়ার পাশাপাশি লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী বলে গেছেন বই কেনায় বাঙালির কিপ্টামির চিত্রও। ওই যে এক ধনী ভদ্র মহিলা বাজারে গিয়েছিলেন স্বামীর জন্মদিনের উপহার কেনার জন্য। দোকানদার এটা দেখায়, সেটা দেখায়, কিন্তু কিছুই মনঃপূত হয় না তাঁর। বলেন, এ সব কিছুই আছে স্বামীর ভাণ্ডারে। শেষমেশ দোকানদার নিরাশ হয়ে বললেন, তবে উপহার দিতে পারেন একখানা ভালো বই। তখন ওই ভদ্র মহিলা নাসিকা কুঞ্চিত করে বলেন, ‘সেও তো ওর একখানা রয়েছে।’

এই চিত্র কি এখন বদলেছে? দেশে যে হারে মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে একাডেমিক শিক্ষিত, টাকাওয়ালা, সে হারে বাড়েনি বই কেনা। এটা সত্যিই হতাশার, লজ্জার।

আবার এও সত্য, যে হারে দেশে লেখক বাড়ছে, প্রকাশনী বাড়ছে, বই প্রকাশ বাড়ছে, সে হারে বাড়েনি মানসম্মত বই। প্রযুক্তি ও প্রকাশনার সহজলভ্যতায় এখন যে কেউ যা খুশি ইচ্ছে লিখেই বই করে ফেলতে পারেন। বইটির শিল্পমান যাচাই-বাছাইয়ের কোনো প্রয়োজনই বোধ করছেন না প্রকাশকও। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে দেশের প্রকাশনীগুলোতে নেই কোনো সম্পাদক বা সম্পাদক পরিষদ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ। মুদ্রিত অধিকাংশ বই-ই ভুল বাক্য, ভুল তথ্য, ভুল বানানে পরিপূর্ণ, টেক্সটেও নেই নতুন কোনো চিন্তা-দর্শনের স্ফূরণ—এগুলোই মৃত বই। মুদ্রণেও নেই যত্নের ছাপ। এসবও হাতাশার, লজ্জার।    

এবার বইমেলার পরিধি বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছুটা বেড়েছে বইপ্রেমী ও সাধারণের আনাগোনাও, এটা আশার বার্তা। বইয়ের কাছে আসার, ছুঁয়ে দেখার অভ্যাস রপ্ত হলে একদিন বই পড়ায়ও মগ্ন হয় মন। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে ডানা মেলে থাকা প্রাণের মেলা বইমেলায় চার ঘণ্টা হেঁটে হেঁটে ধুলোমাখা বাতাস খেতে খেতে স্টলে স্টলে বইয়ের পাতায় পাতায় চোখ বোলাতে বোলাতে মনে হলো প্রকৃত নিজের কাছে, জীবন্ত বইয়ের কাছে যাওয়া এক অকল্পনীয় অন্তর্ঘাত।       

প্রিয় পাঠক, মৃত বই না কিনে, না পড়ে, জ্যান্ত বই অর্থাৎ ভালো বইয়ের খোঁজ করুন বইমেলায় বা অন্য কোনোখানে। ভালো বই নিজে কিনুন, অন্যকেও উৎসাহিত করুন। তবেই বোধ হয় কমতে পারে মৃত বইয়ের জঞ্জাল।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা