kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ভাতসহ প্লেট পড়ে রইল

শওকত আলী   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ভাতসহ প্লেট পড়ে রইল

রাস্তার পাশে বসানো চুলার ওপর পাশাপাশি দুটি কড়াই। একটির কোনায় ভেজা স্যাঁতসেঁতে একটি রুটি। পাশে রুটি বানানোর পাকা জায়গায় বেলনাসহ অর্ধেক ডলা রুটি, ২৫-৩০টি রুটি বানানোর ময়দার গোল্লা এবং বেশ খানিকটা ময়দার স্তূপ। কাস্টমারদের বসার টেবিলের একটির ওপর পড়ে আছে একটি প্লেট, তার ওপর পরোটা। মনে হচ্ছে, এইমাত্র যেন কেউ অর্ডার দিয়ে নিয়েছে। পাশের অন্য একটি টেবিলে আধাখাওয়া কয়েকটি ভাতের প্লেট, পানির গ্লাস। মনে হচ্ছে, তিন-চারজন এইমাত্র খাওয়া ছেড়ে উঠে গেল।

পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকায় আগুনে আধাআধিভাবে পুড়ে যাওয়া একটি রেস্টুরেন্টের চিত্র এটি। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এলাকাটির রাজমহল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট নামের ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, এটি ছাড়াও ৩০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ঠিক উল্টোপাশের রেস্টুরেন্টটি এমনভাবে পুড়েছে যেখানে সাইনবোর্ডে নামও স্পষ্ট দেখা যায় না।

পাঁচটি গলির সংযোগস্থলের দুটি গলির মুখজুড়ে ওয়াহিদ ম্যানশনের অবস্থান। এই ভবনের মধ্যেই অন্তত ১৮টি দোকান পুড়ে গেছে। জায়গাটিতে বুধবার রাতে আগুন লেগে ৩০টিরও বেশি দোকান পুড়ে গেছে। এর মধ্যে হোটেল, ফার্মেসি, বডি স্প্রের গোডাউন, প্লাস্টিক পুঁতির কেমিক্যালের গোডাউন, ডেকোরেটর, ফ্লেক্সির দোকান, দর্জির দোকান, কম্পিউটার সেন্টার, চায়ের দোকানও রয়েছে। তবে এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমনভাবে পুড়েছে যে কোনোটার সাইনবোর্ড পর্যন্ত নেই।

স্থানীয় লোকজন জানায়, আগুন লাগার পর যে যেভাবে পেরেছে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেছে। তবে তীব্র যানজটের কারণে গলির এই সংযোগের মধ্যে অনেকে রিকশা, গাড়ি, মোটরসাইকেলের ওপরই পুড়ে মারা গেছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার ওপর পুড়ে যাওয়া মোটরসাইকেল, বেশ কয়েকটি রিকশা, কয়েকটি প্রাইভেট কার ও ঠেলাগাড়ির শুধু লোহার অংশগুলোই পড়ে রয়েছে। মোড়টির মধ্যে নানা ব্র্যান্ডের অসংখ্য বডি স্প্রে, এয়ার ফ্রেশনার, লোশনের ক্যান পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে ক্লারিশ ব্র্যান্ডের বেবি লোশন, এয়ার ফ্রেশনার ও বডি স্প্রেই বেশি। এ ছাড়া বুলেট ও শট নামের আরো দুটি বডি স্প্রের ক্যানও দেখা গেছে, যার সবই বিদেশি ব্র্যান্ডের বডি স্প্রে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানায়, বেশির ভাগ বডি স্প্রেই ছিল বিদেশি বিভিন্ন কম্পানির নকল পণ্য। এখানে কেমিক্যালের গোডাউনে আগুন না লাগলে এত ছড়াত না এবং এত মানুষও মারা যেত না। 

স্থানীয় এক বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে ছোট ছোট কিছু দোকানের পাশাপাশি মূলত বডি স্প্রে ও প্লাস্টিক কেমিক্যালের গুদাম ছিল কয়েকটা। এর ফলে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। যানজটের কারণে রাস্তার ওপরের লোকগুলো সরতে পারেনি। গাড়ি বা রিকশার ওপরই পুড়ে মরেছে। ভবনগুলো থেকে গোডাউনের লোকজনও বের হতে পারেনি। তারাও পুড়ে গেছে।

মোড়টির ওপর দিয়ে যাওয়া নন্দ কুমার রোডের দুই পাশে বস্তায় ও খোলা পড়ে থাকা প্লাস্টিকের দানা দেখা গেছে। এর মধ্যে কিছু দানা পুড়ে কালো কালো হয়ে গেছে। কিছু দানা সাদা রয়েছে, আর রঙিন কিছু দানাও পড়ে থাকতে দেখা গেছে।   

এদিকে নাসরিন আক্তার নামের এক মাঝবসয়ী নারী তাঁর বাবার (জয়নাল আবেদিন বাবুল) সন্ধান করছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এখানে বাবা চা খেতে এসেছিলেন। রাত ১০টা ২৬ মিনিটে তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছে। আগুন লাগার পর থেকেই তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারি নাই। এখান থেকে শুরু করে মেডিক্যাল পর্যন্ত সব জায়গায় খুঁজেছি, পাইনি।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা