kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আমাদের আশার শেষ বাতিঘর

নোমান মোহাম্মদ

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমাদের আশার শেষ বাতিঘর

ঋষির মতো লোকটি। শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখ, কাঁধ ছুঁয়ে নামা চুল, পরনে লম্বা আলখাল্লা। হাত দুটো পেছনে ভাঁজ করে একটু কুঁজো হয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। বইমেলায়। আতিপাতি করে খুঁজছেন কী যেন! কিন্তু কোথাও, কিছুতেই যে নিজেকে খুঁজে পাচ্ছেন না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!

বিশ্বকবি নিজেকে খুঁজে খুঁজে হয়রান, বিদ্রোহী কবির ওই হল্লা নেই। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তাঁর আবক্ষ মূর্তি। সেই ‘নজরুল মঞ্চে’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের রীতি কত কালের! কিন্তু হালফিলে বই উন্মোচনের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন জায়গা উন্মোচিত হওয়ায় তামাটে বিদ্রোহী কবি পড়ে থাকেন আবছায়ায়। রবীন্দ্রনাথের মতো বিমর্ষ হয়ে বইমেলায় তাই স্বদেশির চাদর গায়ে ঘুরে বেড়ানো ঝাঁকড়া চুলের কাজী নজরুল ইসলামও।

রবীন্দ্র-নজরুলই নেই, পঞ্চকবির উপস্থিতি থাকে কিভাবে! বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্তদেরও তাই ভীষণ মন খারাপ। বাংলা ভাষার ওই দিকপালদের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানতম লেখকরাও তাঁদের বিষণ্নতার সফরসঙ্গী। শামসুর রাহমান থেকে সৈয়দ শামসুল হক কিংবা হুমায়ুন আজাদ থেকে আহমদ ছফা হয়ে মাত্রই অন্য ভুবনে যাত্রা করা আল মাহমুদ—কারো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই বইমেলার কোথাও। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা হুমায়ূন আহমেদের ছবি আছে প্রকাশনা সংস্থার স্টলে, বাংলা একাডেমির উদ্যোগে কিচ্ছুটি নেই। কারো নামে নেই কোনো চত্বর, বিদ্রোহী কবিকে বাদ দিলে অন্যদের নেই ভাস্কর্য। ফেব্রুয়ারির এই মাসখানেক সময়ের জন্য অস্থায়ী কোনো স্থাপনায় পর্যন্ত নেই বাংলা ভাষার এই কীর্তিমানদের প্রকাশ্য উপস্থিতি।

না হয় অমর একুশে বইমেলায় তাঁদের মন খারাপ করে ঘুরে বেড়ানোটা কাল্পনিক; কিন্তু তা কতই না বাস্তব!

নতুন পাঠকের সঙ্গে কিংবদন্তি লেখকদের পরিচয়ের সেতুবন্ধে এমনই অবহেলা বাংলা একাডেমির। মলাটবন্দি বইয়েই তাই শুধু থেকে যান রথী-মহারথীরা। তাঁদের সহচর হয়ে কত কত নবীন লেখকের আনাগোনা এই মাঘ-ফাল্গুনে! বইমেলায় পা রেখেই তাই মনটা ভালো হয়ে যেতে বাধ্য। খুব ইচ্ছা করে, এটিকে স্বর্গ ভাবতে। ওই যে আর্জেন্টাইন লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস বলেছিলেন, ‘আমার কল্পনায় স্বর্গ হচ্ছে এক ধরনের লাইব্রেরি’—সেটি মাথায় রেখে। কিন্তু বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মিলিয়ে বিশাল এ লাইব্রেরির সারশূন্যতা স্পষ্ট হয়ে যায় বই কেনার অনুপাত দেখলে।

এমনিতে মোটা দাগে বঙ্গবাসী বই কেনে বছরের শুধু এই একটি মাসই। লেখক-প্রকাশক-পাঠকদের সমস্ত দৌড়ঝাঁপ ফেব্রুয়ারি ঘিরে। শাহবাগ থেকেই সে মুখরতা গুঞ্জরিত হতে থাকে। টিএসসি পেরোলে তো কথাই নেই। বরাবরের মতো এবারের বইমেলাও ব্যতিক্রম নয় আমার জন্য। বইয়ের এ বিশাল লাইব্রেরির কাছাকাছি যেতেই রক্তে ছড়িয়ে পড়ে রোমাঞ্চের রেণু। নস্টালজিয়া ছোটাছুটি করতে থাকে আদিম জন্তুর মতো। স্মৃতিতে ফিরে আসে স্কুলের দিনগুলো, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তাল ক্ষণগুলো। রোমাঞ্চ-নস্টালজিয়ার খেলায় আমি মানুষ দেখি। মানুষ গুনি।

পাঠক দেখা, পাঠক গোনার চেষ্টা আরকি!

এই যে সময় প্রকাশনের সামনে দাঁড়ালাম! ১-২-৩, ১০-২০-৩০, ১০০-২০০-৩০০ ঝাঁকের কইয়ের মতো মানুষ আসছে। কেউ বন্ধুর সঙ্গী হয়ে, কেউ প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার, নিঃসঙ্গ কতজনও তো! কিন্তু তাদের মধ্যে পাঠক কই! মানুষের স্রোতের এগিয়ে চলায় মানুষের শূন্যস্থান পূরণ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বই নিয়ে স্টল ছাড়ার সংখ্যাটি রীতিমতো বিব্রতকর। মাওলা ব্রাদার্স, অনন্যা, আগামী, প্রথমা প্রকাশন—একই ছবি সব জায়গায়। মার্ক টোয়েনের সেই অমর বাণীটি তাই মনে পড়ে যায়, ‘লোকে যে বইয়ের প্রশংসা করে কিন্তু পড়ে না, সেটিই ধ্রুপদি সাহিত্য।’

বাংলার প্রায় সব পাঠকই (কিংবা না-পাঠক) কি এখন ধ্রুপদি সাহিত্যের সমঝদার!

তবে এই গ্রহণকালে, এই নিরন্নের দিনেও সত্যিকারের পাঠক রয়েছে। রয়েছে বলেই আগামী প্রকাশনীতে গিয়ে আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান অনূদিত দর্শনের বই ‘বুদ্ধের হূদয়’ খোঁজেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নিসার উদ্দিন। ‘মধুপোক’ থেকে প্রকাশিত সলিমুল্লাহ খানের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘প্রার্থনা’র জন্য অপেক্ষায় থাকেন চাকরিজীবী রাজ্জাক আলী। একগাদা বই বগলদাবা করেও এনজিওকর্মী লায়লা আরজুমান্দের কণ্ঠ প্রতীক্ষায় থাকে আরেকটি ছুটির দিনের। আর শিশু প্রাঙ্গণে মা-বাবার হাত ধরে কেমন খুশির ঝিলিক চোখে হেঁটে যায় পরের প্রজন্ম! ওদের হাতে বই তো নয়, যেন যক্ষের ধন।

আমার সাড়ে চার বছরের মেয়ে ঋষিকাব্যও নিজের ‘সম্পদ’ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় গর্বিত রাজহংসীর মতো গ্রীবা উঁচু করে। অক্ষরের সঙ্গে ওর পরিচয় হচ্ছে কেবল, পড়তে পারার সাধ্যি সুদূর। নিজের বইগুলো কোলে নিয়ে আবদারের সুরে বলে ওঠে, ‘বাসায় গিয়ে বইগুলোর গল্প আমাকে পড়ে শোনাবে। শোনাতেই হবে কিন্তু বাবা।’

মধুবর্ষণ হয় কানে। মেঘ ফুঁড়ে উঁকি দেয় সূর্যের আভা। বইমেলায় মহীরুহ লেখকদের দৃশ্যমান উপস্থিতির অভাব, তার চেয়েও দৃশ্যমান পাঠকস্বল্পতা ছাপিয়ে আত্মজার কথাটিই তাই গেঁথে যায় আমার মনে। এ পরবর্তী প্রজন্মের পাঠকই যে আমাদের আশার শেষ বাতিঘর!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা