kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

ঝড়-বৃষ্টি সামলে ঝলমলে প্রাঙ্গণ

নওশাদ জামিল   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঝড়-বৃষ্টি সামলে ঝলমলে প্রাঙ্গণ

শিশু চত্বরের সামনেই কৃত্রিম ফোয়ারা। আশপাশে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্যাভিলিয়ন ও স্টল। কিন্তু চত্বরের পুরোটায় জমে আছে পানি। গতকাল রবিবার সকালের ঝড়-বৃষ্টির দাগ মেলা প্রাঙ্গণজুড়ে। বৃষ্টির পরপরই পানি সরানো হলেও অনেক জায়গাই ছিল ভেজা, ছপছপে আর কর্দমাক্ত। আয়োজক কর্তৃপক্ষ ও প্রকাশকরা ওই কর্দমাক্ত মাটির ওপর ফেলেছেন বালু। কোথাও কোথাও বসানো হয়েছে ইট। ইট ও বালুর ওপর সতর্ক পা ফেলে ক্রেতা-দর্শনার্থীরা ঘুরেছে বইমেলায়। কিনেছে পছন্দের বই। ঝড়-বৃষ্টিতে সাময়িক কিছু ক্ষতি হলেও তা সামলে মেলা ছিল ঝলমলে ও জমজমাট।

গতকাল মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, বেশ কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বই ভিজে গেছে বৃষ্টিতে। স্টল ও প্যাভিলিয়নের সামনে ভিজে যাওয়া অনেক বই রোদে শুকাতে দেওয়া হয়েছে। এর পরও এবার বৃষ্টির জন্য আগাম প্রস্তুতি থাকায় তেমন বড় ক্ষতি হয়নি। বৃষ্টির পানি সরাতে আয়োজক বাংলা একাডেমিও  ছিল তৎপর। মাটি ভেজা থাকায় অবশ্য আগের মতো ধুলার ওড়াউড়ি ছিল না। তাতে বরং স্বস্তি প্রকাশ করেছে দর্শনার্থীরা। সকালে খানিকটা ঝড়-বৃষ্টি থাকলেও দুপুর থেকে আবহাওয়া ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল। বিকেলে রোদ গায়ে মেখে পাঠকরা স্টলে স্টলে ঘুরে সংগ্রহ করেছে প্রিয় লেখকের বই। বেশির ভাগ দর্শনার্থীর হাতে দেখা গেছে বইভর্তি একাধিক ব্যাগ।

বৃষ্টিতে ভিজে গেছে অন্যপ্রকাশের অনেক বই। প্যাভিলিয়নের পাশে রোদে শুকাতে দেওয়া হয় অনেক বই। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক সিরাজুল কবির চৌধুরী কমল বলেন, ‘অনেক বই ভিজেছে বৃষ্টিতে। দুপুর থেকে বই শুকানোর কাজ চলেছে। অনেক বই বিক্রির অনুপযোগী হয়ে যাওয়ায় সেগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাবাজারের গোডাউনে। আলোকসজ্জারও ক্ষতি হয়েছে। সেগুলো ঠিক করা হচ্ছে।’

বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ মেলার সব প্রকাশককে সতর্ক করেছে এই বলে যে আগামী ২৩, ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি আবারও রাজধানীতে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য প্রকাশনা কর্তৃপক্ষকে স্ব স্ব স্টলের বইয়ের নিরাপত্তায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিকেল ৩টায় বাংলা একাডেমির শহীদ মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯’ বিষয়ে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলন হয়। সংবাদ সম্মেলনে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী গ্রন্থমেলার বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।

মহাপরিচালক বলেন, ‘প্রতিবছরই ফেব্রুয়ারি মাসে এক বা দুইবার বৃষ্টি হয়। সে বিষয়টিকে মাথায় রেখে আমরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। গত ১৫ তারিখে আমরা এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য মাইকিং করে এবং প্রকাশকদেরও জানিয়েছি। সে অনুসারে প্রস্তুতি নেওয়ায় ক্ষতি কমই হয়েছে।’

‘লেখক বলছি’ মঞ্চে নিজেদের নতুন প্রকাশিত গ্রন্থ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন বদরুল হায়দার, ফরিদুর রহমান, মারুফ রসুল, স্নিগ্ধা বাউল, অঞ্জন আচার্য। কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি মোহাম্মদ সাদিক ও খালেদ হোসাইন। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী লায়লা আফরোজ ও মো. মাসুদুজ্জামান। মানজারুল ইসলাম সুইটের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী’ এবং অনন্যা ওয়াফী রহমানের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘নৃত্যমঞ্চ’ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। এ ছাড়া সংগীত পরিবেশন করেন বেশ কয়েকজন শিল্পী।

১৬ দিনে বাংলা একাডেমির বিক্রি কোটি টাকা : এবারের মেলার প্রথম ১৬ দিনে বাংলা একাডেমির পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র থেকে বিক্রয় হয়েছে ৯৭ লাখ ৭৬ হাজার ১০৮ টাকার বই, যা গত বছরের প্রথম ১৬ দিনের চেয়ে ৩০ লাখ টাকা বেশি। গতবার সব মিলে বাংলা একাডেমি দেড় কোটি টাকার বই বিক্রি করলেও এবার তা আড়াই কোটিতে পৌঁছবে বলে কর্তৃপক্ষের আশা।

নতুন বই : এবারের মেলায় ১৭ দিনে নতুন বই এসেছে দুই হাজার ৫৪৮টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭৯১টি কবিতার বই এসেছে। এর পরেই রয়েছে গল্পগ্রন্থ ৪১২টি। তৃতীয় অবস্থানে আছে উপন্যাস, সংখ্যা ৪০৯। অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে প্রবন্ধ ১৪২টি, গবেষণা ৩৪টি, ছড়া ৬৩টি, শিশুতোষ ৭৪টি, জীবনী ৮৫টি, রচনাবলি পাঁচটি, মুক্তিযুদ্ধ ৬৩টি, নাটক ২০টি, বিজ্ঞান ৪৭টি, ভ্রমণ ৫৬টি, ইতিহাস ৪২টি, রাজনীতি ২১টি, স্বাস্থ্য ১৭টি, ধাঁধা ১৭টি, ধর্মীয় ১২টি, অনুবাদ ২০টি, অভিধান তিনটি ও গোয়েন্দা ৩০টি। অন্যান্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ১৮২টি।

গতকাল ১৭তম দিনে প্রকাশিত হয়েছে ৭১টি বই। এর মধ্য থেকে চারটি বইয়ের তথ্য-পরিচিতি :

কিশোরবেলা : প্রবীণ সাংবাদিক ও লেখক কামাল লোহানীর স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ। বইটিতে উঠে এসেছে লেখকের কৈশোর, তৎকালীন মফস্বল শহর পাবনার কথা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনে ভূমিকা, ভাষা আন্দোলনসহ কিশোরবেলার স্মৃতিকথা। প্রকাশক শুদ্ধপ্রকাশ। দাম ১৬০ টাকা।

একাত্তর ও একজন মা : কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস। একাত্তরে দশ ছেলে-মেয়ে নিয়ে বিধবা হন এক জননী। একাত্তরের পটভূমিতে বইটিতে উঠে এসেছে বাঙালি মায়ের জীবনযুদ্ধের অনুপুঙ্খ কাহিনি। প্রকাশক অনন্যা। দাম ৪৫০ টাকা।

বিশ্বাসেরই নিঃশ্বাস নাই : লেখক ও উপস্থাপক হানিফ সংকেতের নিবন্ধগ্রন্থ। বইটি সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গ, সমাজ, রাষ্ট্রসহ নানা বিষয়ে রচনার সংকলন। লেখক ক্ষুরধার লেখনীতে, হাস্যরসের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন তাঁর ব্যক্তিক অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা। প্রকাশক অনন্যা। দাম ১৭৫ টাকা।

গ্রাম মুক্তিযুদ্ধ ও নারী : মেজর চাকলাদারের (অব.) মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই। লেখকের পুরো নাম শাহাব উদ্দিন চাকলাদার। তিনি বাংলাদেশ হকি দলের সাবেক অধিনায়ক। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান লেখক তুলে ধরেছেন। বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন সাবেক বিচারপতি শরিফ উদ্দীন চাকলাদার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা আফজাল হোসেন, নজরুল গবেষক শফি চাকলাদার প্রমুখ। প্রকাশক সুলেখা লাইব্রেরি। দাম ১২০ টাকা।

মেলামঞ্চের আয়োজন : গতকাল মেলামঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক : শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খালেদ হোসাইন। আলোচনায় অংশ নেন মফিদুল হক, আসাদ মান্নান, শিহাব সরকার ও আনিসুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি মনজুরে মওলা।

মনজুরে মওলা বলেন, ‘ভাষার প্রতি সৈয়দ শামসুল হকের আমৃত্যু যত্নশীলতা আমাদের সাহিত্যসমাজে এক বিরল ব্যাপার, যে ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই উদাসীন। নতুন শব্দ ও ভাববন্ধ নির্মাণে তিনি ছিলেন সদাসচেষ্ট।’

শিশু-কিশোর চিত্র প্রদর্শনী : গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রতিবছর শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। এবারই প্রথম ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত শিশু-কিশোরদের পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিগুলো নিয়ে বাংলা একাডেমির ড. মুহম্মদ এনামুল হক ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। আজ বিকেল ৪টায় প্রদর্শনীটি শুরু হবে। চলবে মেলার শেষ দিন পর্যন্ত।

আজকের অনুষ্ঠান : আজ সোমবার মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেলে মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘কবি বেলাল চৌধুরী : শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ, কবিতা আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা