kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সিভিল সার্জনের ‘গোপন গর্ভপাত কেন্দ্রে’ প্রসূতির মর্মান্তিক মৃত্যু

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সিভিল সার্জনের ‘গোপন গর্ভপাত কেন্দ্রে’ প্রসূতির মর্মান্তিক মৃত্যু

ময়মনসিংহের নান্দাইলে অবস্থিত নেত্রকোনার সিভিল সার্জন ডা. তাজুল ইসলাম খানের একটি ‘গোপন গর্ভপাত কেন্দ্রে’ জবরদস্তিমূলক অপচিকিৎসায় মারা গেছেন এক প্রসূতি। তাঁর নাম জিনুয়ারা খাতুন (৩০)। গতকাল শনিবার প্রসবব্যথায় কাতর এ প্রসূতিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করাতে গেলে দুই নারী দালাল তাঁকে হাসপাতালের গেট থেকে টেনে নিয়ে কাছের ওই ‘গর্ভপাত কেন্দ্রে’ গিয়ে সন্তান প্রসব করানোর চেষ্টা করে। এ সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলেও মৃত ভেবে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়নি। এর দুই ঘণ্টা পর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ গেলেও অদৃশ্য কারণে কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ ছাড়াই ঘটনাটি ফয়সালা হয়ে যায়। তবে এলাকার লোকজনকে এ ঘটনার বিচার দাবি করে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নান্দাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ফটকের অদূরেই অবস্থিত নেত্রকোনা সিভিল সার্জন ডা. তাজুল ইসলাম খানের বাসা কাম কথিত হাসপাতালটিতে প্রধানত গোপনে গর্ভপাতের কাজ করা হয়।

নিহত প্রসূতি জিনুয়ারা নান্দাইল উপজেলার দাতারাটিয়া গ্রামের মো. মোস্তফার স্ত্রী। স্বামী ঢাকায় কাজ করার কারণে সন্তানসম্ভাবনা জিনুয়ারার প্রচণ্ড ব্যথা হলে তাঁর মা, বোন ও ভাবি তাঁকে (প্রসূতি) নান্দাইল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে এসেছিলেন।

নিহতের ভাবি পারভিন বেগম জানান, সকাল সোয়া ৭টার দিকে জিনুয়ারাকে নিয়ে উপজেলা হাসপাতাল গেটে প্রবেশ করতেই দুই নারী এসে পথ রোধ করে। তারা নিজেদের নান্দাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আয়া পরিচয় দিয়ে বাচ্চা প্রসবের নিশ্চয়তা দিয়ে একরকম টেনে নিয়ে যায় পাশের একটি বাসায়। জিনুয়ারাকে নিয়ে গিয়ে সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বাচ্চা প্রসবের চেষ্টা করে ওই দুই নারী। এ সময় প্রচণ্ড প্রসবব্যথায় চিৎকার করছিলেন জিনুয়ারা। একপর্যায়ে বাচ্চা প্রসব করানো গেলেও জিনুয়ারার চিৎকার হঠাৎ থেমে যায়। তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় ডা. তাজুল ইসলামের ওই দুই নারী দালাল জিনুয়ারার পরিবারকে আশ্বস্ত করে বলে, জিনুয়ারা ঘুমিয়ে গেছে। এমন সময় ওই দুই নারী সদ্যোজাত শিশুটিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে এবং মাকে পরে দেওয়া হবে বলে জানায়।

পারভিন বেগম আরো জানান, জিনুয়ারার মা হেলেনা বেগম ও বোন পারুল ওই গর্ভপাত কেন্দ্র থেকে নবজাতকটিকে নিয়ে বাড়ি চলে যান। পরে প্রসবের দুই ঘণ্টা পর প্রসূতির কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে তাঁকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে ফেলে রেখে লাপাত্তা হয়ে যায় ওই দুই নারী। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মহিউদ্দিন প্রসূতিকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি জানান, জরুরি বিভাগে আনার আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসক মহিউদ্দিন বলেন, প্রসূতিকে জরুরিভাবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে এলে তাঁর রিকভারি (পরিস্থিতির উন্নতি) করা সম্ভব ছিল।

খোঁজ নিয়ে  জানা যায়, ডা. তাজুল ইসলাম খানের দুই নারী দালাল হচ্ছে কল্পনা ও শাহানা বেগম। তারা দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের আশপাশে থেকে আগত নারী রোগীদের আটকে চিকিৎসার নামে হাসপাতাল গেটের কাছেই একটি বাসায় নিয়ে হেস্তনেস্ত করে যাচ্ছে। ওই বাসাটি হচ্ছে নান্দাইল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাজুল ইসলাম খানের। তিনি বর্তমানে নেত্রকোনা জেলার সিভিল সার্জন। তিনি ওই বাসাটি হাসপাতাল কাম বাসা বলে স্বীকার করে নেন। তবে স্থানীয়ভাবে ওই বাসা অবৈধ গোপন গর্ভপাত কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। ডা. তাজুল ইসলাম খান প্রায়ই নেত্রকোনা থেকে এই বাসায় আসেন বলে স্থানীয় লোকজন জানায়।

এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে ডা. তাজুল ইসলাম তাঁর বাসাটি ‘বাসা কাম চেম্বার’ বলে স্বীকার করে নেন। তিনি বলেন, ‘এখানে আমি প্রতি শুক্রবার এসে রোগী দেখি। এ ছাড়া একজন শিক্ষার্থী থেকে লেখাপড়া করে। অন্য কেউ তো রোগী দেখার কথা না।’ কল্পনা ও শাহানা কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এরা গরিব বলে বাসাটি দেখভাল করতে বলেছিলাম।’ তবে স্থানীয় লোকজন জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই ওই বাসাটি গোপন গর্ভপাত কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মাঝেমধ্যে ডা. তাজুল এসে রোগীও দেখেন। এ ছাড়া বাসাটিতে ডা. তাজুলের স্ত্রী স্থানীয় স্বমূর্ত জাহান মহিলা কলেজের দর্শন বিভাগের প্রভাষক ফৌজিয়া খানমকেও বাসাটিতে থাকতে দেখা যায়।

দুই দালালের জবরদস্তিতে প্রসূতির মৃত্যুর ব্যাপারে নান্দাইল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রুহুল কদ্দুস খান বলেন, নিহত প্রসূতির পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আপত্তি না থাকায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া গেল না। তবে ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক ও মর্মান্তিক।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা