kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

বাসপ্রতি দিনে কম্পানির চাঁদা ৫০০ থেকে ১২০০ টাকা

বোঝার ওপর শাকের আঁটি ‘ব্যাক মানি’

লায়েকুজ্জামান   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাসপ্রতি দিনে কম্পানির চাঁদা ৫০০ থেকে ১২০০ টাকা

মিরপুর-১২ থেকে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে এবং আশপাশের জেলাগুলোতে ১৬টি কম্পানির ৬২০টি বাস চলাচল করে। এই বাসগুলোর মালিক অসংখ্য। মূলত ব্যক্তি উদ্যোগে বাস পরিচালনা করা অসম্ভব বলে মালিকরা তাঁদের বাসগুলো কম্পানিতে দিতে বাধ্য হন। আর এর জন্য প্রতিদিন বাসপ্রতি কম্পানিকে দিতে হয় ৫০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত।

‘স্বাধীন’ নামের বাস কম্পানির সহকারী সাজ্জাদ কালের কণ্ঠকে জানান, মিরপুর-১২ থেকে বিভিন্ন রুটে তাঁদের কম্পানির ৪২টি বাস চলাচল করে। প্রতিদিন কম্পানির পক্ষ থেকে বাসপ্রতি আদায় করা হয় এক হাজার ২০০ টাকা। এই টাকা কোথায় খরচ করা হয় তা তাঁর জানা নেই। জানেন মালিক ও কম্পানির লোকজন।

মিরপুর-১২ থেকে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে যে ১৬টি কম্পানির বাস চলাচল করে, ওই কম্পানিগুলোর পরিচালক, বাসের মালিক, চালক ও সহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবগুলো বাস থেকে চাঁদা আদায় করা হলেও পরিমাণে পার্থক্য আছে। একই হারে চাঁদা আদায় করা হয় না। পরিমাণে কমবেশি রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘প্রজাপতি’ পরিবহনের একজন চালক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কম্পানির বাসপ্রতি প্রতিদিন চাঁদা নেওয়া হয় ৮৫০ টাকা।’ কারা টাকা নেয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কম্পানি অফিসের নির্দিষ্ট লোক রয়েছে। তারা এসে নিয়ে যায়।’

‘তেঁতুলিয়া’ পরিবহন কম্পানির একজন অফিস সহকারীকে দেখা গেল বাস থেকে টাকা নিয়ে কম্পানির কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছেন। কিসের টাকা নিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা কম্পানির টাকা। অফিসে জমা দেব। প্রত্যেক বাস থেকে আমরা ৭০০ টাকা করে তুলি।’

মিরপুর-১২ থেকে প্রতিদিন যেসব পরিবহনের বাস চলাচল করে এর মধ্যে রয়েছে প্রজাপতি, রবরব, খাজাবাবা, স্বাধীন, দ্রুতি, শিখর, বসুমতি, ইউনাইটেড, রাজধানী, জাবালে নূর, আকিক, বিহঙ্গ, পরিস্থান,  অছিম, নূরে মক্কা ও তেঁতুলিয়া।

একজন বাস মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে বাসপ্রতি সর্বনিম্ন ৫০০ থেকে ঊর্ধ্বে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়া হয়। গড়ে বলা যায় ৯০০ টাকা হারে চাঁদা দিতে হয়।’ একই ধরনের তথ্য দিয়ে আরো কজন বাস মালিক জানান, প্রতিদিন বাসপ্রতি গড়ে ৯০০ টাকা করে দিনে ৬২০টি বাস থেকে আদায় করা হয় পাঁচ লাখ ৫৮ হাজার টাকা চাঁদা।

আরেকজন বাস মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার দুটি বাস আছে। নিজের মতো করে কোনো রুটে চালানো অসম্ভব। রুট পারমিট মিলেবে না, নানাভাবে সৃষ্টি করা হবে বাধা। ফলে নিরুপায় হয়ে বাস দুটি মিরপুর-১২ নম্বরে একটি কম্পানির অধীনে দিয়েছি। আমার মতো আরো অনেক সাধারণ মালিক তাঁদের বাসও দিয়েছেন। বাসপ্রতি প্রতিদির কম্পানিকে চাঁদা দিই ৮৫০ টাকা। ওই টাকা কোথায় খরচ হয় আমরা জানি না। এর বাইরে প্রতিদিন টাকা ভাংতির নামে দিতে হয় ৬০ টাকা।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কম্পানি কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেক ফিটনেসবিহীন বাস কম্পানিতে চলে। বাস দুর্ঘটনায় পড়লে দেখবেন, দ্রুত সেগুলো আবার রাস্তায় চলে আসে। কখনো কখনো রাস্তায় যাত্রীদের সঙ্গে মারপিটের ঘটনা ঘটে। এসব সামাল দিতে প্রয়োজন হয় রাজনৈতিক শক্তির। কিন্তু এসব তো শূন্য হাতে সামাল দেওয়া যায় না! বাস মালিকরা তো দিনে কয়েকটি টাকা দিয়ে নিরাপদে থাকেন। ব্যবসার টাকা বাড়ি নিয়ে ঘুমান। সব ঝামেলা সামাল দিতে হয় কম্পানির লোকদের। টাকা না হলে এসবের সমাধান কিভাবে করব!’

প্রজাপতি পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিহঙ্গ পরিবহন কম্পানির পরিচালক কে এম রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বাসপ্রতি টাকা তুলি এটা ঠিক। সে টাকার কিছু অংশ আমরা মালিক সমিতিতে জমা করি। বাকিটা খরচ হয় কর্মচারী পরিচালনাসহ অন্য কিছু খাতে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আমরা দরিদ্রদের অনুদান দিয়ে থাকি।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা পুলিশ বা রাজনৈতিক নেতাদের কোনো টাকা দিই না।’ বিআরটিএকে দেন কি? এর জবাবে তিনি বলেন, ‘এই প্রশ্নের জবাবটা দিতে চাই না।’

‘ব্যাক মানি’ হাজারে ৬০ টাকা  চাঁদা নয়, তাঁরা নেন সার্ভিস চার্জ। তবে জোর করেই নেন এই সার্ভিস চার্জ। বাস মালিকরা বাধ্য হয়ে দেন। কম্পানির নেতারা নির্দিষ্ট লোক ঠিক করে দিয়েছেন। প্রতিদিন সকালে এদের কাছ থেকে টাকা ভাংতি নিতে হয় সব বাসের সহকারীকে। টাকা ভাংতি দেওয়ার কমিশন আদায় করে যুবলীগ পরিচয়ের কজন। কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য জানিয়েছেন মিরপুর ১২ নম্বর থেকে সদরঘাট চলাচলকারী একটি বাসের সহকারী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁদাবাজির এই নয়া কৌশল উদ্ভাবন করেছে যুবলীগের কজন নেতাকর্মী।

মিরপুর-১২ নম্বর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী প্রতিটি বাসের সহকারীকে প্রতিদিন বাস ছাড়ার আগে এক হাজার টাকা নিয়ে হাজির হতে হয় মিরপুর-১২ নম্বর বাস ডিপোতে। সেখানে বসা কজন যুবলীগকর্মী। কমিশন দিয়ে তাদের কাছ থেকে নিতে হয় টাকার ভাংতি। কার কার কাছ থেকে ভাংতি টাকা নিতে হবে, তা ঠিক করেন যুবলীগ পল্লবী থানা শাখার সভাপতি তাজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি। স্থানীয়ভাবে চাঁদাবাজির এ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ব্যাক মানি’। মিরপুর-১২ থেকে বিভিন্ন কম্পানির যে ৬২০টি বাস চলাচল করে এর মধ্যে কে কোন বাসের ব্যাক মানি নেবে তাও ঠিক করে দেওয়া আছে। ৬২০টি বাস থেকে প্রতিদিন আদায় করা হয় ব্যাক মানির ৩৭ হাজার টাকা।

‘রবরব’ ও ‘খাজাবাবা’ পরিবহনের টাকা ভাংতি দেন ইকবাল হাওলাদার। ‘নূরে মক্কা’ পরিবহনে দেন সোহেল। ‘পরিস্থান’ পরিবহনে দেন ফারুক। ‘দ্রুতি’ পরিবহনে আবুল কাশেম। ‘শিখর, বসুমতি ও ইউনাইটেড’ পরিবহনে দেন সোহাগ। ‘রাজধানী’ ও ‘জাবালে নূর’ পরিবহনে দেন সাইফুল ইসলাম। ‘আকিক’ পরিবহনে দেন আশিক। তিনি আবার ওই কম্পানি পরিচালনার একজন।

এর মধ্যে ইকবাল নিজেকে পল্লবী থানা যুবলীগের কর্মী বলে দাবি করেছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা দোষের কি! আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করছি।’ এর বইরে সোহেল, ফারুক, আবুল কাশেম, সোহাগ, সাইফুল ও আশিক পল্লবী থানা যুবলীগের সদস্য। বড় পদে না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তাঁরা প্রতাপশালী। কালের কণ্ঠকে তাঁরা জানান, তাঁরা কেউ চাঁদাবাজি করেন না। কমিশন নিয়ে টাকা ভাংতি দেওয়া চাঁদাবাজির মধ্যে পড়ে না।

ব্যাক মানি সম্পর্কে জানতে চাইলে পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি তাজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে জড়িতরা আমার লোক কিংবা আমি তাদের দিয়েছি এ কথা ঠিক নয়। এদের বেশির ভাগ কম্পানি পক্ষের লোক। তাদের আত্মীয়-স্বজন। আমি চাইলেই কি কম্পানির মালিক আমার লোক নেবে? তবে এটা ঠিক, রাজনীতি করি, দু-একজন বেকার থাকলে অনেক সময় ফোন করি একটা কাজ দেওয়ার জন্য।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা