kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বউ হারাল বইমেলায়!

মুহাম্মদ রোকনুদ্দৌলাহ   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বউ হারাল বইমেলায়!

আমার বউ কখনো বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলায় যায়নি। বিয়ের আগে সে ঢাকায় তিনবার এলেও সেটা মেলার সময় ছিল না। এখন সে ঢাকায়। জানুয়ারি মাস থেকেই বলছিলাম, তাকে নিয়ে একদিন একুশে গ্রন্থমেলায় যাব। কিন্তু তার আগ্রহ দেখি না। যতবার বলি, ততবার উত্তর ‘না’। মন খারাপ হলেও হাল ছাড়ি না। সপ্তাহের ছুটির দিনে অনেকটা জোর করেই তাকে নিয়ে বেরোলাম গ্রন্থমেলার উদ্দেশে। বাসে বসে সে ঘুমাচ্ছিল আর চেতন পেয়ে বলছিল, ‘না এলেই ভালো করতাম, বাসায় থাকলে ঘুমানো যেত...।’

বিকেল পৌনে ৫টায় প্রবেশ করলাম বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ অংশের গ্রন্থমেলায়। বিভিন্ন স্টলে নেড়েচেড়ে বই দেখছি। খেয়াল করলাম, বউ আমার বেশ আগ্রহ নিয়ে বই দেখছে। কোনো কোনো বইয়ের এক-দু পৃষ্ঠা পড়েও ফেলছে! জানাল, বইটির কয়েকটা গল্প এরই মধ্যে তার পড়া শেষ! আরেকটু অপেক্ষা করলে পুরো বইটাই পড়া শেষ হয়ে যাবে! কেনার প্রয়োজন পড়বে না! এদিন কোনো বই কেনার ইচ্ছা ছিল না আমার। বই দেখা আর বউকে গ্রন্থমেলার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য। তার পরও বাংলা একাডেমির স্টল থেকে কিনে নিলাম তিনটি ‘সহজ বাংলা অভিধান’, আতোয়ার রহমানের ‘উৎসব’ আর কবির হুমায়ূনের ‘হাতের আঙুলে খেলা করে পাঁচ পৃথিবীর রোদ’।

ঘণ্টাখানেক পর গেলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের গ্রন্থমেলায়। দুজনে বসলাম মোড়ক উন্মোচন মঞ্চের সামনে। অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তিন তরুণ লেখকের তিনটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করলেন। বক্তব্য শেষে তাঁরা বিদায় নিলেন। মঞ্চে এলেন মাজহারুল ইসলাম। তিনি রাজশাহীর সিরাজী নাজমুল হাসনাইনের দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করলেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বইটির বিষয়ে বলতে গিয়ে মাজহারুল ইসলাম বলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর দুটি ঘটনার কথা। একটি ঘটনা এই প্রথম প্রকাশ করলেন! কিন্তু আমি অন্যমনস্ক থাকায় বুঝতে পারলাম না। ফলে মঞ্চ থেকে নেমে আসার পর তাঁর পিছু নিলাম। একটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে দু-চারটি কথা বলে কজন তরুণের সঙ্গে ছবি তোলা শেষে তিনি পা বাড়ালেন মেলার গেটের দিকে (সঙ্গে বাংলা একাডেমির এক গবেষক)। আমি কালের কণ্ঠ’র সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ঘটনা দুটি আবার বলতে অনুরোধ করলাম। তিনি বললেন, আজ আর সময় হবে না। ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বললেন, ‘একদিন আসো আমার স্টুডিওতে, অনেক কথা বলব।’ এরপর বললেন, ‘মেলায় থাকবে আরো?’ বললাম, ‘হ্যাঁ, আমার স্ত্রী বসে আছে ওদিকে।’ তাঁর মুখে হাসি।

বউ হারিয়েছে আমার : মিনিট ১০-১৫ শেষে মোড়ক উন্মোচন মঞ্চের সামনে ফিরে গিয়ে দেখি, আমার বউ নেই! সব দিক খুঁজেও পেলাম না তাকে। শঙ্কায় আমার আত্মা শুকিয়ে কাঠ। আরো খোঁজার পর দেখি, মঞ্চের পাশেই বিমর্ষ বদনে বউ কথা বলছে একদল নারী পুলিশের সঙ্গে। কাছে যেতেই সে আর্তনাদ করে উঠল, ‘এই, এতক্ষণ কোথায় ছিলে! খুঁজে পাচ্ছি না! কখন থেকে ফোন দিচ্ছি তোমায়!’ পুলিশ দল তখন হাসছিল।

‘কী কথা পুলিশের সঙ্গে?’—হাঁটতে হাঁটতে আমি জানতে চাইলে বউ বলল, ‘আমি পুলিশকে বলেছি, আমার হাজব্যান্ড আমার কাছেই ছিল। অনেকক্ষণ তাকে খুুঁজে পাচ্ছি না। আমার ফোনও তার কাছে। পরে পুলিশের ফোন দিয়ে তোমাকে অনেকবার ফোন করেছি। ধরোনি!’

আমি ফোন খুলে দেখি সাতটা কল! তারপর? বউ বলে চলে, এক পুলিশ বলেন, ‘তাঁর মধ্যে অন্য কিছু আছে। না হলে তিনি বউকে ফেলে যাবেন কেন। ফিরবেন না কেন!’ আরেক পুলিশ বলেন, ‘তিনি অন্য মেয়েকে নিয়ে ভেগেছেন!’ বউ আমার দ্রুত বলেছে, ‘না না, ও ওরকম না! ওর ফোনে শব্দ কম হয়, তাই কল শুনছে না।’ আরেক পুলিশ সদস্য বউ একা বাড়ি ফিরতে পারবে কি না জানতে চাইলে সে ‘না’ করেছে।

পুরো মেলা ঘুরে আমরা দুজন কিনে নিলাম আরো দুটি বই। একটি নির্মলেন্দু গুণের ‘চাষাভুষার কাব্য’। বউ বেশি দেখেছে ভূতের গল্পের বই। কিন্তু কিনতে সাহস করেনি। পড়ার পর রাতে ভয় পাবে এ কারণে!

রাত ৮টার দিকে গ্রন্থমেলা থেকে বেরোনোর সময় বউয়ের মন্তব্য, সে ভাবতেই পারেনি গ্রন্থমেলায় এত বই থাকে, এত মানুষ আসে। আবার আমাকে খোঁচা দিয়ে বলল, ‘তুমি তো ওই স্টল থেকে বই কিনেছ সেখানে থাকা সুন্দরী দুই তরুণীকে খুশি করতে!

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা