kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আমন ধান সব বড় মিলের গুদামে!

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমন ধান সব বড় মিলের গুদামে!

রংপুর সিটি বাজারে চালের দোকানে অভাব নেই চালের। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

উত্তরের ১৬ জেলায় প্রায় ২১ লাখ হেক্টর জমিতে এবার আমন ধান উৎপাদিত হয়েছে ৫৫ লাখ মেট্রিক টন। এরই মধ্যে ৮০ শতাংশ কৃষকই তাদের উৎপাদিত ধান বিক্রি করে দিয়েছে। আর মিল মালিকরা তা মজুদ করে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। এ কারণে গত এক সপ্তাহে চিকন ও মাঝারি মানের চালের দাম বেড়েছে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। মিল ও চাতাল মালিক, চাল ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা ও কৃষকদের অভিযোগ, উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৬০০ অটোরাইস মিলের মালিক লাখ লাখ মণ ধান মজুদ করে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। সাধারণ ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছে, সরকার এখনই যদি এই অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয় তাহলে তারা চালের বাজার অস্থিতিশীল করে তুলবে।

রংপুরের মাহিগঞ্জ, দিনাজপুরের পুলহাট এবং বগুড়া, নওগাঁ ও রাজশাহী থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক চাল ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। এসব মোকামে এক সপ্তাহ আগে থেকে অটোরাইস মিল মালিকরা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে চিকন ও মাঝারি মানের চাল প্রকারভেদে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) দুই হাজার ৩০০ থেকে দুই হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক সপ্তাহ আগে এই চাল ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কমে পাওয়া যেত। রংপুরের আবু পাটোয়ারী, লিখন চৌধুরী, রহিম পাঠান, মহিদ চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন আড়তদার জানান, তাঁরা বিভিন্ন মোকাম ঘুরেও চাল সংগ্রহ করতে পারেননি অটোরাইস মিলগুলোর কারণে। অটোরাইস মিলের মালিকরা বাজার থেকে একতরফাভাবে ধান সংগ্রহ করে নিজেদের ইচ্ছামতো চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। কৃষকদের কাছেও ধান নেই।

ওই আড়তদাররা জানায়, পুরো উত্তরাঞ্চলের ৫০০ থেকে ৬০০ বড় ব্যবসায়ী ও অটোরাইস মিল মালিক সারা দেশের চালের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। বড় ব্যবসায়ীদের কাছে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বাধ্য হয়ে তারা তাদের মিল চাতাল বন্ধ করে দিয়েছে। তারা আরো অভিযোগ করে, অটোরাইস মিল মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা ধানের জন্য ব্যাপারীদের আগাম টাকা দিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে গুদামজাত করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।

মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে কৃষকদের ঘরে আমন ধান নেই। কর্তনের পরপরই তারা ধান বিক্রি করে দিয়েছে। কৃষকদের ওই ধান কিনে মজুদ করে রেখেছে অটোরাইস মিল মালিকরা।

রংপুর সদরের অমল চন্দ্র, গঙ্গাচড়ার লাভলু মিয়া, কাউনিয়ার আফজাল হোসেন, নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের রেজাউল করিমসহ বেশ কয়েকজন ধানচাষি জানায়, তারা আমন ধান তোলার পরপরই কম দামে বিক্রি করে দিয়েছে। তাদের ঘরে এখন কোনো ধান নেই। ফলে এখন ধানের দাম মনপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বাড়লেও তাদের কোনো লাভ হচ্ছে না। ধানের বাড়তি মূল্যে লাভবান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।

রংপুর চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম চালের দাম বৃদ্ধির জন্য সরাসরি অটোরাইস মিলগুলোকে দায়ী করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, অটোরাইস মিল মালিকরা আগে থেকে ধানের মজুদ গড়ে তুলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে ছোট ব্যবসায়ীরা অসহায় হয়ে পড়েছে।

ধানের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি স্বাভাবিক বলে দাবি করেন বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক লাইক আহমেদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, চিকন ও মাঝারি মানের চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু মোটা চালের দাম ঠিকই আছে। অটোরাইস মিলগুলোর মজুদের পাশাপাশি চিকন চালের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চিকন চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। কৃষকদের কাছে এখনো ধান আছে। দাম বাড়ায় কৃৃষকরা দুটি পয়সা বেশি পাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, অটোরাইস মিলগুলোতে ধান মজুদ রাখার বিধান আছে। ব্যবসার স্বার্থে তারা মজুদ রেখে বেআইনি কিছু করছে না।

এ বিষয়ে রংপুরের আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা রায়হানুল কবির বলেন, ‘চিকন ও মাঝারি মানের যে চালের দাম বেড়েছে তা আমন ধানের চাল নয়। আমনের দাম স্বাভাবিকই আছে। কিছুটা দাম বৃদ্ধি হয়েছে হয়তো বোরো ধানের চালের। তার পরও ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা ধান মজুদ করেছেন কি না বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত আমন মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় ২১ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ৫৫ লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়েছে। উৎপাদিত ওই ধানের উল্লেখযোগ্য অংশই এখন অটোরাইস মিলগুলোর গুদামে।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা