kalerkantho

আটলান্টিকের দুই প্রান্তে সংকট

অনাস্থার মুখে টেরেসা মে ইমপিচমেন্টের ভয়ে ট্রাম্প

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অনাস্থার মুখে টেরেসা মে ইমপিচমেন্টের ভয়ে ট্রাম্প

এই মুহূর্তে সংকটে রয়েছেন আটলান্টিকের দুই প্রান্তের দুই শক্তিধর দেশ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রধান। ব্রেক্সিট (যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিচ্ছেদ) ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মেকে তাঁর নিজ দলের নেতৃত্বের প্রশ্নে আস্থা ভোটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ইমপিচমেন্টের মুখে পড়তে পারেন তিনি। সংবাদমাধ্যম সিএনএন হোয়াইট হাউসের কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করে। যদিও ট্রাম্প জনসমক্ষে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সে অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।

টেরেসা মে

ব্রেক্সিট ইস্যুতে বছর দেড়েক আগে ক্ষমতা ছেড়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। ওই একই ইস্যু এবার একই পরিণতির মুখে ফেলে দিয়েছে ক্যামেরনের উত্তরসূরি টেরেসা মেকে। দলের নেতৃত্বের প্রশ্নে আস্থা ভোটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁকে। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী দিবাগত রাত ২টায় এ ভোট সম্পন্ন হওয়ার কথা। তাতে হেরে গেলে শুধু দলের নেতৃত্ব নয়, প্রধানমন্ত্রিত্বও হারাতে হবে মেকে।

কনজারভেটিভ দলের নেতা টেরেসা মে অবশ্য বলেছেন, নিজের সব অর্জন নিয়ে তিনি আস্থা ভোটে লড়তে প্রস্তুত আছেন। আর হেরে গেলে মুদ্রার উল্টা পিঠ সম্পর্কেও সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। এক বিবৃতিতে মে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কিংবা কনজারভেটিভ দলের নেতৃত্বে রদবদল হলে তা ব্রেক্সিট চুক্তিতে কোনো পরিবর্তন ঘটাবে না। দলের নেতৃত্বের রদবদল যুক্তরাজ্যকে একটি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে। আর এই ঝুঁকি থেকে কবে মুক্তি মিলবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’

বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী, বুধবার রাত ১২টায় আস্থা ভোট শুরু হওয়ার কথা। চলবে দুই ঘণ্টা। ফল জানা যাবে কমপক্ষে এক ঘণ্টা পর। ভোটে টেরেসা মে হেরে গেলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দলের নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট হবে। সেখানে যিনি জিতবেন, তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রধানমন্ত্রীও হবেন। আর আস্থা ভোটে টেরেসা মে জিতে গেলে এক বছরের জন্য তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব নিশ্চিত হয়ে যাবে।

এরই মধ্যে মের সমর্থনে তাঁর মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য শোভাযাত্রা করেছেন। তাঁদের একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাবিদ। এক টুইটার বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। এ ছাড়া ২৯ মার্চের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে আমাদের বেরিয়ে আসার জন্য তিনিই সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি।’

২০১৬ সালের এক গণভোটে ইইউ থেকে আলাদা হওয়ার (ব্রেক্সিট) সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাজ্য। আগামী মার্চে ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এই বিচ্ছেদপ্রক্রিয়া এবং উভয়ের মধ্যকার ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে—তা নিয়ে গত ২৫ নভেম্বর দুই পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। সেটিকে বলা হচ্ছে ব্রেক্সিট চুক্তি। মূলত ওই চুক্তির জেরেই আস্থা ভোটের মুখে পড়তে হয়েছে টেরেসা মেকে। যুক্তরাজ্যের অনেক রাজনীতিক মনে করেন, চুক্তিতে যুক্তরাজ্যের চেয়ে ইইউয়ের স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চুক্তিটি যুক্তরাজ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য গত মঙ্গলবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভোট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনুমোদন পাবে না—এমন আশঙ্কায় শেষ মুহূর্তে ভোট স্থগিত করেন মে। সেই সঙ্গে চুক্তিতে কিছু সংশোধন আনার লক্ষ্য নিয়ে গত মঙ্গলবার ইউরোপ সফরে যান তিনি।

যুক্তরাজ্যের অনেকেই চুক্তির কঠোর বিরোধিতা করছেন। আর বিরোধিতার মূলে রয়েছে চুক্তির ‘ব্যাকস্টপ’ ইস্যু। সমালোচকরা বলছেন, এই ‘ব্যাকস্টপের’ কারণে ইইউর সঙ্গে যুক্তরাজ্য দীর্ঘমেয়াদি ঝামেলায় আটকে যেতে পারে।

মূলত আয়ারল্যান্ড ও নর্দান আয়ারল্যান্ডের সীমান্ত নিয়ে সৃষ্ট এক জটিলতার নাম ‘ব্যাকস্টপ’। আয়ারল্যান্ড স্বাধীন একটি দেশ এবং ইইউ সদস্য। অন্যদিকে নর্দান আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের একটি অংশ। এই দুই ভূখণ্ডের মধ্যে সীমান্ত উন্মুক্ত রাখার ব্যাপারে একটি চুক্তি রয়েছে। এখন ব্রেক্সিটের পর এই সীমান্ত খোলা থাকলে নর্দান আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের এক ধরনের আইনি দূরত্ব তৈরি হবে। কারণ ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যের বাকি তিন অংশের (ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলস) সঙ্গে ইইউয়ের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও নর্দান আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে উন্মুক্ত থাকবে। এ ছাড়া অনির্দিষ্টকালের জন্য নর্দান আয়ারল্যান্ড ইইউর আইনের অধীনে চলে যেতে পারে। তখন যুক্তরাজ্য এককভাবে এ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না; ইইউর সম্মতি লাগবে।

এই ‘ব্যাকস্টপ’ যুক্তরাজ্যকে ভবিষ্যতে কোনো ফাঁদে ফেলবে না—এমন নিশ্চয়তা পেতেই ইউরোপ সফরে গিয়েছিলেন তিনি। তবে ইউরোপের নেতারা যুক্তরাজ্যকে ফাঁদে না ফেলার আশ্বাস দিলেও ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে পুনঃসমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।

মে ভেবেছিলেন, ইউরোপের আশ্বাস পেলে কিংবা চুক্তি সংশোধন করা গেলে সেটি পার্লামেন্টে পাস করাতে বেগ পেতে হবে না। কিন্তু  চুক্তি টেকানোর আগে নিজের নেতৃত্ব টেকানোই এখন তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প :

হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, ট্রাম্পের সহকারীরা মনে করেন, একটি বিষয় নিয়ে ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব কংগ্রেসে উঠতে পারে। তা হলো সাবেক আইনজীবী মাইকেল কোহেনকে দিয়ে ট্রাম্পের সাবেক প্রেমিকাদের মুখ বন্ধ রাখতে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে অন্তত দুই নারীকে সম্পর্কের বিষয়ে মুখ বন্ধ রাখতে ট্রাম্পের নির্দেশে বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়।

তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে গত মঙ্গলবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রম্প বলেন, তিনি ইমপিচমেন্ট নিয়ে চিন্তিত নন। ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগে তাঁর দুই বান্ধবীর মুখ বন্ধ রাখতে যে অর্থ দেওয়া হয়েছিল, তা নির্বাচনী ব্যয় বিধির পরিপন্থী নয়।

ওভাল অফিসে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ভুলই করেনি তাকে ইমপিচ করা কঠিন। এই দেশের ইতিহাসে আর কেউ এত চমৎকার অর্থনীতি তৈরি করতে পারেনি।’ তিনি বলেন, ‘আমি চিন্তিত নই। একেবারেই না। আমি মনে করি, এমন কিছু ঘটলে মানুষ বিদ্রোহ করবে।’

নিউ ইয়র্কের ফেডারেল প্রসিকিউটর গত সপ্তাহে জানান, ট্রাম্পের নির্দেশেই তাঁর সাবেক আইনজীবী কোহেন দুই নারীকে মুখ বন্ধ রাখার শর্তে ছয় অঙ্কের সংখ্যার অর্থ প্রদান করেন। ফেডারেল প্রসিকিউটরের দাবি, এই অর্থ দিয়ে আইন লঙ্ঘন করেছেন ট্রাম্প। নির্বাচনী বিধি অনুসারে, কোনো ব্যক্তিকে দুই হাজার ৭০০ ডলারের বেশি দেওয়া যাবে না। দিলে সেটা প্রকাশ করতে হবে।

ডেমোক্র্যাটরা মনে করেন, ট্রাম্প যা করেছেন, তা ইমপিচমেন্ট করার যোগ্য অপরাধ। তবে এই অপরাধে এত গুরু শাস্তি দেওয়া যেতে পারে কি না, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব পাসের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকাই যথেষ্ট। তবে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়। মর্ধবর্তী নির্বাচনে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে এলেও সিনেট এখনো রিপাবলিকানদের কবজায়। কাজেই ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব সিনেটে হালে পানি পাবে না। সূত্র : সিএনএন, বিবিসি।

মন্তব্য