kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

৯ বছরেও হলো না ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’

রুখতে পারত দুর্নীতি; বাধা এমপিরাই

পার্থ সারথি দাস   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৯ বছরেও হলো না ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’

নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের স্বেচ্ছাচারিতা বা দুর্নীতি রোধ এবং তাঁদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেওয়াসহ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ইংল্যান্ডের হাউস অব কমন্স, ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভা, কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় পার্লামেন্টসহ বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রের আইন প্রণেতাদের জন্য আইন রয়েছে। বাংলাদেশে তা হয়নি ৪৭ বছরেও। ২০১০ সালে তৎকালীন সংসদে সরকারি দলেরই একজন সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বেসরকারি বিল আকারে বিলটি সংসদে উপস্থাপন করেছিলেন। বিলটি আইন হিসেবে পাসের পক্ষে সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছিল—জনগণের প্রতি সংসদ সদস্যদের যে দায়দায়িত্ব রয়েছে তার প্রতিফলনের জন্য বাংলাদেশেও একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা আছে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে সংসদ সদস্যদের জবাবদিহির বিষয়ে অঙ্গীকার করে থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন হয় না। এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে সব দলে এ বিষয়ে অঙ্গীকার এবং পরে তা বাস্তবায়ন চান বিশেষজ্ঞরা।

এই আইন প্রণয়ন জরুরি উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় সংসদের বাইরে সংসদ সদস্যদের আচরণ কেমন হবে সেসংক্রান্ত একটি আইন, সংসদ সদস্য আচরণ আইন অনুমোদনের চেষ্টা করা হয়েছিল ২০১০ সালে নবম জাতীয় সংসদে। সরকারি দলেরই একজন সংসদ সদস্য বেসরকারি বিল আকারে এটি সংসদে উপস্থাপন করেছিলেন। এ বিষয়ে পরে সংসদের আর কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আয় ও ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করাসহ বিভিন্ন বিষয় তাতে উল্লিখিত ছিল।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজউদ্দিন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, সংসদ সদস্য হলেই প্রভাব বিস্তার করাসহ বিভিন্ন ধরনের কাজে তাঁদের ব্যাপক উৎসাহ থাকে। ওঠে দুর্নীতির অভিযোগ। তা ঠেকাতে পারে এই আচরণ আইন। তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের অসংযত আচরণ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে রাজনৈতিক দলকেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। তাই প্রধান সব রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে তা অন্তর্ভুক্ত শুধু নয়, অঙ্গীকারের বাস্তবায়নও করতে হবে।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরাও চেয়েছিলাম এই আইন হোক ও তার বাস্তবায়ন হোক। আমরা জানতে পেরেছিলাম, প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখেন। কিন্তু সংসদে বিল উপস্থাপনের পর এটি একটু এগোলেও রহস্যজনক কারণে আর আলোর মুখ দেখেনি। আগামী সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এই খসড়া নিয়ে পর্যালোচনা করে আইন প্রণয়ন ও তা কার্যকরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আমরা আশা করব।’

জানা গেছে, সংসদ সদস্যদের আচরণের বিষয়ে একটি মানদণ্ড এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘কমিটি অন স্ট্যান্ডার্ড ইন পাবলিক লাইফ’ তার পঞ্চম প্রতিবেদনে সাতটি মানদণ্ড চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে আছে নিঃস্বার্থতা, সত্যনিষ্ঠা, বস্তুনিষ্ঠতা, দায়বদ্ধতা, মুক্তমনা ও নেতৃত্ব। ভারতে লোকসভা সদস্যদের জন্য প্রণয়ন করা আচরণবিধিতে এসবের সঙ্গে যোগ করা হয়েছে জনস্বার্থ ও দায়িত্ব এর মতো বিষয়গুলো।

নবম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহার ছিল তরুণদের জন্য আকর্ষণীয়। চারদলীয় জোটের নিপীড়ন ও দুঃশাসনের জবাবে ভোটাররা আওয়ামী লীগের পক্ষেই তাদের রায় প্রদান করেছিল বেশির ভাগ আসনে। দিনবদলের সনদে সংসদ সদস্যদের জন্য সর্বসম্মত আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল। বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে শপথ নেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের অঙ্গীকার করেছিল। সংসদ সদস্যদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের বিষয়ে অঙ্গীকার বাস্তব রূপ পায়নি। দশম জাতীয় সংসদের সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ২৬ নভেম্বর প্রকাশ্যে তাঁর আয় ব্যয়ের হিসাব দিয়েছেন। তবে সিংহভাগ মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য তাঁদের সম্পদ ও আয়ের বিবরণী লুকিয়ে রাখতে চান। অর্থমন্ত্রী ওই দিন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মন্ত্রীরা তাঁদের হিসাব প্রধানমন্ত্রীকে দেন। তিনি মনে করেন, মন্ত্রীদের জবাবদিহি আছে। সাধারণ মানুষ তথ্য অধিকার অনুসারে তা জানতে পারবে।

সুশাসনে অগ্রগতি ও জবাবদিহির জন্য সংসদ সদস্য আচরণ বিষয়ে একটি বিল ২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি সংসদে পেশ করা হয়েছিল। বিলের বিভিন্ন ধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজে কোনো সুপারিশ করবেন না, নিজ বা পরিবারের সদস্যরা আর্থিক বা বস্তুগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবেন না। তাঁরা এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না, যাতে তাঁদের সংসদীয় দায়িত্ব প্রভাবিত হতে পারে। সংসদ সদস্যরা নিজের ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের স্বার্থগত দ্বন্দ্ব, আয় ও সম্পদের উৎসসংক্রান্ত তথ্য সংসদ কর্তৃক নির্ধারিত ছকে সংসদ শুরুর প্রথম অধিবেশনের মধ্যে প্রকাশ করবেন—মর্মেও স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল। সরকারি বা বেসরকারি খাতে কোনো ধরনের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, জ্যেষ্ঠতা বা অন্য কোনো সিদ্ধান্তে সুবিধা পেতে ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না বলে নিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। সরকারি ক্রয়-বিক্রয়, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত সরকারি নীতিনির্ধারণে ব্যক্তিগত বা দলীয় প্রভাব বা স্বার্থ অর্জন থেকে বিরত থাকবেন বলেও নিষেধ করা হয়েছিল।

প্রস্তাবিত বিলে ১৫টি ধারা ছিল। সংসদ সদস্যদের নৈতিক অবস্থান ও দায়-দায়িত্ব, ব্যক্তিস্বার্থে আর্থিক প্রতিদান; উপঢৌকন বা সেবা, সরকারি সম্পদের ব্যবহার, গোপনীয় তথ্যের ব্যবহার, বাক্স্বাধীনতা, সংসদ সদস্য বা জনগণকে বিভ্রান্ত ও ভুল পথে চালিত না করা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহিষ্ণুতা, নৈতিক কমিটি ও আচরণ আইনের প্রয়োগ, আইন লঙ্ঘনের শাস্তি, নৈতিকতা কমিটির কার্যকালসহ বিভিন্ন বিষয় তাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ধারা-১৩ ও ১৪তে প্রস্তাবিত আইনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে স্পিকারের নেতৃত্বে সব দলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সমন্বয়ে ৯ জন সাংসদের দ্বারা একটি সংসদীয় ‘নৈতিকতা কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব ছিল। যেকোনো ব্যক্তি গঠিত কমিটির কাছে অভিযোগ পেশ করতে পারবেন বা নৈতিকতা কমিটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে অভিযোগ বিবেচনায় নিতে পারবেন এমন প্রস্তাবও ছিল।

মন্তব্য