kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

আজ থেকে ট্রেনের আগাম টিকিট

চাহিদার চাপে রেলসেবা অ্যাপের ‘মাথা নষ্ট’

পার্থ সারথি দাস   

২২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চাহিদার চাপে রেলসেবা অ্যাপের ‘মাথা নষ্ট’

কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য কমাতে এবং ঘরে বসে ট্রেনের টিকিট পেতে বড় গলায় ঘোষণা দিয়ে ‘রেলসেবা’ অ্যাপ চালু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। কিন্তু এই অ্যাপ ঠিকমতো চলছে না। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে প্রতিদিন টিকিটপ্রত্যাশীদের মাত্র ১০ শতাংশের চাপ নিতে পারছে অ্যাপটি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একক সময় বড়জোর ৫০০ জন এই অ্যাপে ঢুকতে পারে। তার স্থলে একক সময়ে কমপক্ষে ১০ হাজার টিকিটপ্রত্যাশী ঢুকতে চাইছে। কিন্তু লগ ইন অংশে চাপ দিয়ে তাদের ঠায় বসে থাকতে হচ্ছে।

এদিকে আজ বুধবার সকাল থেকে রাজধানীর পাঁচটি স্থান থেকে শুরু হচ্ছে ঈদের আগাম টিকিট বিক্রি। একই সঙ্গে শুরু হচ্ছে অ্যাপেও। আজ বিক্রি করা হবে ৩১ মে যাত্রার টিকিট। রাজধানীর পাঁচটি স্থানের কাউন্টার থেকে বিক্রি করা হবে ৫০ শতাংশ টিকিট। বাকি ৫০ শতাংশ বিক্রি হওয়ার কথা রেলসেবা অ্যাপসে। আজ তাই একক সময়ে ৫০ হাজারের বেশি ব্যক্তির চাপ পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

গতকাল মঙ্গলবারও অনেকে অগ্রিম টিকিট কাটতে অ্যাপের মাধ্যমে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে তারা কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশনে গিয়ে ৩০ মে ভ্রমণের টিকিট কিনতে কাউন্টারে ভিড় করে। 

‘রেলসেবা অ্যাপস’-এর ব্যবস্থাপনায় আছে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেমস লিমিটেড বাংলাদেশ-সিএনএসবিডি। তারা ৫০ শতাংশ টিকিট অনলাইনে দিচ্ছে তিন পদ্ধতিতে। মোবাইল ফোনের এসএমএস, ওয়েবসাইট ও ফিচার অ্যাপসের মাধ্যমে। এই প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, রেলের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে এবং রেলওয়ের নির্দেশনা অনুসারে তারা অনলাইনে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা নিয়েছে। গত রবিবার প্রতিষ্ঠানের একটি কারিগরি দল রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছে পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জেল হোসেন গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, বিষয়টি কারিগরিসংক্রান্ত। এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবে সিএনএসবিডি কর্তৃপক্ষ।

সিএনএসবিডি মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) কামরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাউন্টারে সবাই কি একসঙ্গে টিকিট কিনতে পারে? এই অ্যাপসেও তাই ঘটছে। একক সময়ে ৫০০ জন যেখানে ঢুকতে পারে, সেখানে ১০ হাজার ব্যক্তি ঢুকতে চাইলে তো সবাই পারবে না। তারা ঢুকতে চাইলে তাদের কিউতে ফেলে রাখছি আমরা। এমন না যে আমরা টিকিট বিক্রি করছি না। সংরক্ষণ করে রাখার পদ্ধতি এখন আর নেই। কাজেই পুরো বিষয়টি তথ্য-প্রযুক্তি ও কারিগরির ওপর নির্ভরশীল। তবে অ্যাপসের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার।’

রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন দায়িত্ব নেওয়ার পর রেলের টিকিট পেতে যাত্রী হয়রানি কমাতে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করেন। এ ছাড়া রেলসেবা অ্যাপটি চালুর উদ্যোগ নেন। ঘটা করে গত ২৮ এপ্রিল কমলাপুর রেলস্টেশনে রেলমন্ত্রী নিজে তা উদ্বোধন করেন। তবে একক সময়ে কতসংখ্যক টিকিটপ্রত্যাশী ঢুকতে পারে তার সম্ভাব্যতা যাছাই না করেই সীমিত ক্ষমতার অ্যাপস চালু করায় বিপত্তি দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া টিকিটপ্রত্যাশীদের ধৈর্য ধরে টিকিট কেনার পরামর্শও দেওয়া হয়নি।

গতকাল সকালে টিকিট কিনতে অনেকে ‘রেল সেবা’ অ্যাপে ঢুকতে পারেনি। সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে। এই সময়ের মধ্যে একবার ঢোকা গেলেও টিকিটপ্রত্যাশীরা টিকিট কেনার কোনো অপশন পায়নি। ইন্টারফেস কাজ করছিল না। রাজধানীর মুগদার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টানা চেষ্টা করেও ঢুকতে পারিনি। ৩০ মে রাজশাহী যাওয়ার টিকিট কিনতে তাই কাউন্টারেও যেতে পারিনি। এখন আমি টিকিট পাব কার কাছে?’

অনেক ভুক্তভোগী এ অবস্থায় রেলওয়ে কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ জানাতে ছোটে। তবে কর্মকর্তাদের বেশির ভাগ ‘ব্যস্ত’ থাকায় ক্ষুব্ধ লোকজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়তে থাকে। কালের কণ্ঠ থেকে ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হলে সিএনএসবিডির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত সোমবার অ্যাপের সাহায্যে প্রায় আড়াই হাজার টিকিট কিনেছে ক্রেতারা। অথচ অ্যাপে একসঙ্গে টিকিট কাটার কথা ৫০০ জনের। যথেষ্ট সক্ষমতা না থাকায় এই অবস্থা তৈরি হয়েছে।

এদিকে অ্যাপে অনেক ভূতুড়ে কাণ্ডকারখানা ঘটারও অভিযোগ করেছে অনেকে। ঢাকা থেকে সুবর্ণ এক্সপ্রেসে চট্টগ্রামে যাওয়ার টিকিট কিনতে অ্যাপে তিনবার ঢুকেও টিকিট কিনতে ব্যর্থ হয় এক যাত্রী। সে টিকিট না পেলেও টিকিটের মূল্য কেটে নেওয়া হয়েছে। সেটা আবার অনেক বেশি। একে তো টিকিট পায়নি, তার ওপর ৭৪৫ টাকার মূল্যের টিকিটের জন্য দুই হাজার ২০০ টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ রেল মন্ত্রণালয়কে তিন দিন আগে জানিয়েছে সে। এদিকে ট্রেন চলে যাওয়ার পর টিকিট পেয়েছেন রাজিব আহমদ। এ অভিযোগও গেছে রেল মন্ত্রণালয়ে। রানা ইসলাম নামে এক যাত্রী অভিযোগ করেন, গত রবিবার একতা ট্রেনের টিকিট চেয়েছি, দেওয়া হয়েছে দ্রুতযান এক্সপ্রেসের। এ অবস্থায় আজ ঈদের আগাম টিকিট পেতে যাত্রীদের ভোগান্তি আরো বেশি হবে বলে মনে করছে যাত্রীরা।

রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, ফুলবাড়িয়া পুরাতন রেলভবন, বনানী রেলস্টেশন, বিমানবন্দর রেলস্টেশন ও তেজগাঁও রেলস্টেশন থেকে আজ ঈদের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু হচ্ছে। আগামী ২৬ মে পর্যন্ত এসব স্থানে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টিকিট বিক্রি চলবে। সারা দেশের ৯৩টি আন্তনগর ট্রেনের ৭০ হাজারের বেশি টিকিট বিক্রি করা হবে। এর মধ্যে ঢাকা থেকে ২৭টি আন্তনগর ট্রেনের প্রতিদিন ৩০ হাজার টিকিট বিক্রি করা হবে। অ্যাপে টিকিট বিক্রি শুরু হবে সকাল ৮টা থেকে। 

কমলাপুর রেলস্টেশনের ২০টি কাউন্টার থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে চলাচলকারী পশ্চিমাঞ্চলগামী ট্রেনগুলোর টিকিট বিক্রি করা হবে। রাজধানীর বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীগামী ট্রেনগুলোর টিকিট বিক্রি করা হবে। তেজগাঁও স্টেশন থেকে ময়মনসিংহ ও জামালপুরের বিভিন্ন ট্রেনের, বনানী রেলস্টেশন থেকে নেত্রকোনাগামী মোহনগঞ্জ ও হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের; ফুলবাড়িয়া পুরাতন রেলভবন থেকে কিশোরগঞ্জ ও সিলেটগামী সব আন্তনগর ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রি করা হবে।

 

মন্তব্য