kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

৫০০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে চক্রান্ত

এক অঞ্জনে অতিষ্ঠ হাজারো বাউল

মনিরুজ্জামান, নরসিংদী   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এক অঞ্জনে অতিষ্ঠ হাজারো বাউল

বাউল সম্প্রদায়ের নিয়ম অনুযায়ী মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে নরসিংদী শহরের মেঘনাতীরে আজ থেকে বসছে বাউল মেলা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেই শুধু নয়, প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও বহু বাউল ও পুণ্যার্থী অংশ নেয় এই মেলায়। হিন্দু দেবতা ব্রহ্মার মহাযজ্ঞানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূজা ও মেলা শুরু হয়। কয়েক শ বছর ধরে এই বাউল মেলা চললেও এবার মেলা নিয়ে দেখা দিয়েছিল অনিশ্চয়তা।

বাউলদের অভিযোগ, নরসিংদীর পৌর এলাকার কাউরিয়াপাড়ায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা নিয়ে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন জনৈক অঞ্জন বাউল। জানা যায়, প্রতিবছরের মতো মেলার আয়োজন করতে ১৬ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি মেলার অনুমতি চেয়ে গত ১৬ জানুয়ারি জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেন সেবায়েত প্রাণেশ কুমার বাউল। এরই মধ্যে জানা যায়, মেলার আয়োজনে বাধা সৃষ্টি করতে বাউলবাড়ির জোতের মালিক কার্তিক চন্দ্র বাউলের নাম উল্লেখ করে তাঁর ওয়ারিশ দাবি করে অঞ্জন বাউল ১৭ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলা আয়োজনের অনুমতি চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে ১৪ জানুয়ারি আবেদন করেছেন অঞ্জন নামে আরেক বাউল। এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুষমা সুলতানা গত ৫ ফেব্রুয়ারি জেলা পুলিশ সুপার ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। তাঁরা সেবায়েত প্রাণেশ কুমার বাউলকেই বৈধ মেলার আয়োজক ও প্রকৃত সেবায়েত তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে

উল্লেখ করে প্রতিবেদন জমা দেন বলে জানা যায়। এরপর প্রাণেশ কুমার বাউলকেই ১৭ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি বাউল মেলা ও যজ্ঞানুষ্ঠান করার অনুমতি দেয় জেলা প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় গত রবিবার বিকেল থেকে মেলা শুরু হলেও আজ মঙ্গলবার মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে বাউল ঠাকুরের যজ্ঞানুষ্ঠান ও কাল বুধবার মেলার মূল আয়োজন হওয়ার কথা রয়েছে।

জানা যায়, আখড়ার জমির কাগজপত্র জালিয়াতির মামলা ও তথ্য-প্রযুক্তি আইনের মামলার আসামি অঞ্জন বাউল প্রায় আড়াই মাস কারাবাসের পর ছাড়া পেয়ে নিজের নামে মেলা আয়োজনের চেষ্টা করেন। তিনি নিজেকে বাউলবাড়ির জোতের মালিক কার্তিক চন্দ্র বাউলের নাম উল্লেখ করে তাঁর ওয়ারিশদের একজন দাবি করে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলেন।

অঞ্জন বাউল নিজেকে কার্তিক চন্দ্র বাউলের ওয়ারিশ হিসেবে দাবি করেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কার্তিক চন্দ্রের পৌত্রী সুমতি বালা বাউল ও সুমতির পৌত্রী গীতা রানী বাউলের ছেলে এই অঞ্জন। তাঁদের সবার জন্ম এই বাউলবাড়িতে হলেও ব্রিটিশ আমল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত আখড়ার সেবায়েত ছিলেন বর্তমান সেবায়েত প্রাণেশ কুমার বাউলের বাবার দাদা নদী রাম চন্দ্র বাউল। ১৯৫৭ থেকে ২০০৩ সাল সেবায়েত ছিলেন প্রাণেশ বাউলের বাবা মণীন্দ্র চন্দ্র বাউল। তাঁর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় ছেলে প্রাণেশ কুমার বাউল সেবায়েত হিসেবে মেলার আয়োজন করে আসছেন। জানা যায়, অঞ্জন বাউলের মা গীতা রানী বাউলের নানির বাবা এই বাড়িরই সন্তান ছিলেন। সেই সূত্রে তাঁর স্বামী হরেন্দ্র বাউল এই বাড়িতেই থাকতেন। তাঁদের সন্তান এই প্রজন্মের অঞ্জন বাউল, রঞ্জন বাউল ও অজিত বাউল।

অঞ্জন বাউল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মায়ের দিক থেকে ওয়ারিশ সূত্রে বাউলবাড়ির সেবায়েত হওয়ার কথা আমাদের। মণীন্দ্র বাউলের ছেলেরা জোরপূর্বক আমাদেরসহ ৪৩ পরিবারকে তারা বাউলবাড়ি থেকে বিতারিত করেছে। আর আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

তবে আখড়ার তত্ত্বাবধায়ক সেবায়েত প্রাণেশ বাউল বলেন, ‘অঞ্জন বাউল আমাদের আখড়াবাড়ির আশ্রিত। তারা কখনো আমাদের ওয়ারিশ কিংবা কোনো সত্ত্বেও অংশীদার না। কিন্তু এই অঞ্জন বাউলের বিভিন্ন যড়যন্ত্রের কারণে আমাদের সম্প্রদায়ের মানুষ দুশ্চিন্তায় আছেন। ৫০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এই মেলার আয়োজন ও সুষ্ঠুভাবে যজ্ঞানুষ্ঠান সম্পন্ন করা নিয়ে সব সময় আমরা উদ্বিগ্ন থাকি।’ প্রাণেশ বাউল আরো বলেন, ‘জালিয়াতির মাধ্যমে আখড়াবাড়ির ভুয়া পরচা তৈরি করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছিল অঞ্জন বাউল গং। এর প্রতিবাদ করায় তারা মামলা-মোকদ্দমা করে আমাদের হয়রানি করে আসছে।’

এদিকে এলাকার প্রয়াত হীরেন্দ্র চন্দ্র বাউলের ৩ শতাংশ জমি খারিজ করে দেওয়ার কথা বলে অঞ্জন বাউল বিভিন্ন অজুহাতে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে কালের কণ্ঠ’র কাছে অভিযোগ করেন হীরেন্দ্রর মেয়ে উজ্জ্বলা বাউল।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা