kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

ধার করা ক্যাডারে মান বাড়েনি প্রাথমিক শিক্ষার

►ক্যাডার পদ না থাকায় আসছেন না মেধাবীরা
►বিসিএসের নন-ক্যাডার থেকে নিয়োগপ্রাপ্তরাও চলে যাচ্ছেন
► পদোন্নতি ছাড়াই চাকরি শেষ করতে হচ্ছে প্রধান শিক্ষকদের

শরীফুল আলম সুমন   

২১ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ধার করা ক্যাডারে মান বাড়েনি প্রাথমিক শিক্ষার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা একজন শিক্ষার্থী ৩৪তম বিসিএসের ক্যাডার পদে উত্তীর্ণ না হয়ে নন-ক্যাডার দ্বিতীয় শ্রেণিতে গাইবান্ধার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি মনপ্রাণ দিয়ে কাজ শুরু করলেন। স্কুলের উন্নতি চোখে পড়ল সবার কাছে। কিন্তু ছয় মাস পর জানতে পারলেন, তিনি যে পদে যোগদান করেছেন, এ পদেই তাঁর চাকরি শেষ করতে হবে। সব উদ্যম হারিয়ে চুপসে গেলেন মানসিকভাবে, চারদিক তাঁর হতাশায় ছেয়ে গেল। এভাবে এক বছর পাঁচ মাস পার করে চাকরিটা ছেড়ে দেন তিনি। যদিও তিনি এখন একটি সরকারি ব্যাংকের দ্বিতীয় শ্রেণির পদে যোগদান করেছেন। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চেয়ে তিনি এ পদেই বেশি সন্তুষ্ট। শুধু তিনি নন, ৩৪তম ও ৩৬তম নন-ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া শতাধিক মেধাবী শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

সূত্র মতে, দেশে এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা সোয়া চার লাখ। প্রায় আট লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য ২৭টি ক্যাডার সার্ভিস থাকলেও সোয়া চার লাখ শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য কোনো ক্যাডার সার্ভিস নেই। আর ক্যাডার পদ না থাকায় তেমন কোনো পদোন্নতিরও সুযোগ নেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষায় আসছেন না। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ আর সামাজিক সচেতনতার ফলে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ক্রমে বাড়লেও শিক্ষার মানের উন্নয়ন হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গরু-ছাগলসহ পশুপাখির উন্নয়নের জন্য প্রাণিসম্পদ ক্যাডার আছে, মাছের জন্য মৎস্য ক্যাডার আছে, কৃষির জন্য কৃষি ক্যাডার আছে। প্রতি উপজেলায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার, উপজেলা মৎস্য অফিসার ও উপজেলা কৃষি অফিসার আছেন। তাঁরা নবম গ্রেডে চাকরি শুরু করলেও কিছুদিনের মধ্যেই ষষ্ঠ গ্রেডে চলে যান। অথচ মানবসম্পদ অর্থাৎ যাঁরা শিশুদের পড়ালেখার দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁদের জন্য কোনো ক্যাডার সার্ভিস নেই।

সূত্র জানায়, প্রাথমিক শিক্ষায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার, ইনস্ট্রাক্টর ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরি করেন। আর সহকারী শিক্ষকরা এখনো তৃতীয় শ্রেণির। তবে প্রধান শিক্ষকরা দ্বিতীয় শ্রেণির হলেও তাঁরা এখনো ১১তম গ্রেডে চাকরি করেন। সরকারি প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই।

জানা যায়, ১৯৮৯ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার পদের কম্পোজিশন পুনর্বিন্যাস করে। এতে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের আওতায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরাধীন কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের মোট ৩১৮টি পদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে এ পদগুলোর জন্য বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা-১৯৮১ সংশোধন করে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে ওই বছরই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে ২৩টি পদ, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমিতে ৩৭টি পদ এবং মাঠপর্যায়ের জন্য ২০৯টি পদ রাখা হয়।

এভাবে কয়েক বছর চলার পর ২০০০ সালে বিসিএস প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার সৃষ্টির জন্য পদক্ষেপ শুরু হয়। এরপর ২০০৩ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন প্রাথমিকে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব জনবল হিসেবে ধরা হয়। তখন থেকে আর প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার গঠনের কাজ এগোয়নি। আর যেহেতু বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন নিয়োগ হয়, তাই প্রাথমিকে আর কোনো বিসিএস ক্যাডার নিয়োগ হয়নি। বিভিন্ন ক্যাডার, বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডার থেকে ধার করা কর্মকর্তাদের দিয়েই প্রাথমিক শিক্ষার উচ্চ পদগুলো পূরণ করা হচ্ছে। বর্তমানে মধ্যম পর্যায়ের উপপরিচালকের মতো পদগুলোও অধিদপ্তরের নিজস্ব কর্মকর্তাদের না দিয়ে প্রশাসন ক্যাডার থেকে পূরণ করা হচ্ছে।

এসব বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম-আল-হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯৮৫ সালের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন করা প্রয়োজন। এরই মধ্যে আমরা কাজও শুরু করেছি। আমাদের শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুটি নিয়োগ বিধিমালা ভেঙে একটি করার জন্য কাজ করছি। বিষয়টি আমি সচিব কমিটিতেও উত্থাপন করেছি। সেখান থেকে সার্চ কমিটি করতে বলা হয়েছে। সবার জন্য একটি নিয়োগ বিধিমালা হলে শিক্ষকরাও মহাপরিচালক হতে পারবেন। সবাই পদোন্নতি পাবেন।’

প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডারের ব্যাপারে সচিব বলেন, ‘আগে আমরা নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন করতে চাই। এরপর দেখব, সরকার প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার চায় কি না? যদি চায়, তাহলে আমরা সেটা নিয়েও কাজ শুরু করব।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিসিএস প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। অন্য ক্যাডার থেকে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনায় আসায় তাঁরা তাঁদের নিজস্ব ক্যাডারের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও অর্জিত অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করতে পারেন না। এ ছাড়া তাঁরা বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণ পেলেও দেখা যায়, কিছুদিন পরই তাঁদের নিজস্ব ক্যাডারে ফিরে যেতে হয়। ফলে সেই জ্ঞানও কাজে লাগাতে পারেন না। এ ছাড়া বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা কোনো ক্যাডারের সদস্য না হওয়ায় তাঁদের সুনির্দিষ্ট ক্যারিয়ার পাথ নেই। তাঁদের বেশির ভাগই যে পদে চাকরি শুরু করেন, সে পদ থেকেই অবসর গ্রহণ করেন। ফলে তাঁরা হতাশাগ্রস্ত থাকেন এবং সামর্থ্য অনুসারে সেবা প্রদান করেন না।

জানা যায়, বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় দুটি নিয়োগ বিধিমালা রয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য একটি নিয়োগ বিধিমালা। আর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা পদে নিয়োগের জন্য একটি নিয়োগ বিধিমালা। তবে ১৯৮৫ সালের নিয়োগ বিধিমালায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা পদোন্নতির সুযোগ পেতেন। কিন্তু ১৯৯৪ সালে এই বিধিমালা সংশোধন করে তা রদ করা হয়। ফলে প্রধান শিক্ষকদের এখন পদোন্নতি ছাড়াই চাকরিজীবন শেষ করতে হচ্ছে।

রাজধানীর হাজারীবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম ছায়িদ উল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য কর্মজীবন উন্নয়ন পরিকল্পনা না থাকায় মেধাবীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশোধিত নিয়োগ বিধিমালায় প্রধান শিক্ষক হতে ওপরের পদে শতভাগ সরাসরি নিয়োগের বিধান করে পদোন্নতি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এসব জেনেও কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী কি প্রাথমিকে আসবেন?’

 

মন্তব্য