kalerkantho


‘আংকেল, ওভারব্রিজ ব্যবহার করুন’

ওমর ফারুক   

১৯ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



‘আংকেল, ওভারব্রিজ ব্যবহার করুন’

ফুট ওভারব্রিজ বা জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করার জন্য পথচারীদের বোঝানোর চেষ্টা করছে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘আংকেল রাস্তা নয়, ওভারব্রিজ ব্যবহার করুন।’ রাজধানীর বাংলামোটরে দায়িত্ব পালনকালে এ কথা বারবার বলতে হচ্ছিল স্বেচ্ছাসেবক হাসি আক্তারকে। তাঁর মতো অনেকেই গতকালও সকাল থেকে পুলিশকে সহযোগিতা করার জন্য রাস্তায় নেমেছিলেন। ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার না করা মানুষ পড়েছিল তাঁদের বাধার মুখে। পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের বাধায় ওভারব্রিজ ব্যবহারে বাধ্য হতে দেখা গেছে তাদের।

নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে রাজধানী ঢাকার সাধারণ মানুষ। চিরাচরিত অভ্যাসে রাস্তা পেরোতে গিয়ে এবার তাদের বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। রাস্তা পেরোনোর জন্য ডিভাইডার পর্যন্ত চলে আসার পর তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ফুট ওভারব্রিজ, আন্ডারপাস বা জেব্রাক্রসিং দিয়ে পার হওয়ার জন্য। এমন ফিরিয়ে দেওয়ায় কাউকে কাউকে লজ্জামুখে বিষয়টি মেনে নিতে দেখা গেলেও বেশির ভাগকে বিরক্ত হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া যে শিক্ষার্থীরা কয়েক দিন আগে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তাদের অনেককেও ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে চলতে দেখা গেছে। পুলিশের সঙ্গে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পক্ষ থেকে পাঠানো স্বেচ্ছাসেবকদের কাজটি উৎসাহ নিয়ে করতে দেখা গেছে। গতকাল শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারা মোড়ে চারজন স্বেচ্ছাসেবককে দেখা যায়। তাঁরা পুলিশকে সহযোগিতা করছিলেন। বিকেল সোয়া ৩টায় দেখা গেল, ফার্মগেট থেকে বাংলামোটরের দিকে যাওয়া গাড়ি সিগন্যালে আটকে দিয়ে পান্থপথের দিক থেকে হাতিরঝিলের দিকে যাওয়া রাস্তাটি যেই খুলল পুলিশ, অমনি ১৫-২০ জন লোক একুশে টেলিভিশন ভবনের দিক থেকে উল্টো দিকে যেতে থাকে। মাঝামাঝি পৌঁছতেই পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের আটকে দিয়ে জেব্রাক্রসিংয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানায়। এ সময় দুজনকে উত্তেজিত দেখা যায়। তবে শেষ পর্যন্ত তারাও অন্যদের মতো জেব্রাক্রসিংয়ের দিকে যেতে বাধ্য হয়। তাদের একজন ব্যবসায়ী আবদুল আলিম। কালের কণ্ঠ’র প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাকে আটকে দেওয়ার কারণে আমি মোটেও কষ্ট পাইনি। বরং আনন্দিত হয়েছি। কয়েক দিন আগেই যে আন্দোলন হয়েছে আমি সেটা মনে রাখিনি। আজ বাধা পেয়ে আবার মনে পড়ল। আসলে আমাদের বদ-অভ্যাস হয়ে গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘একটু কষ্ট করে একটু দূরের আন্ডারপাস দিয়ে আমি যেতে পারতাম। কিন্তু অভ্যাসের কারণে সেদিক দিয়ে না গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছি। আমি লজ্জিত।’

কথা হয় স্বেচ্ছাসেবক জুম্মন হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, তানভীর, আফরিদা আক্তারসহ তাঁরা চারজন দায়িত্ব পালন করছেন। সকাল থেকে শুরু করেছেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যারাই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে যাচ্ছে তাদেরকেই আমরা ফিরিয়ে দিচ্ছি। তাদের অনুরোধ জানাচ্ছি জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করার জন্য। কোনো কোনো লোক খারাপ ব্যবহার করে। আজ (শনিবার) সকালে এক লোক আমাদের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে। ধমক দিয়েছে। বিষয়টি দেখে পুলিশ কর্মকর্তারা এসে তাকে আটক করে নিয়ে যান। এ ছাড়া অন্যান্য মানুষ বিষয়টি সহজভাবে নিয়েই আমাদের কথামতো জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করে।’

এর আগে দুপুর ১টার দিকে বাংলামোটরে ওভারব্রিজের নিচে দেখা যায়, যারা ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে রাস্তা দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করছে তাদের আটকে দিচ্ছে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকরা। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বাগিবতণ্ডাও হতে দেখা যায়। তবে পুলিশ অবিচল থেকে তাদের ওভারব্রিজ দিয়ে যেতে বাধ্য করছে। সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন কনস্টেবল পলাশ। তাঁর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি আমরা। রাস্তা দিয়ে পারাপার হতে না দেওয়ায় অনেকে অসন্তুষ্ট হয়। এর পরও আমরা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে দিচ্ছি না।’ পাশেই দায়িত্ব পালন করছিলেন স্বেচ্ছাসেবক হাসি আক্তার। কলেজ ছাত্রী হাসি একজনকে আটকে দিয়ে বলেন, ‘আংকেল রাস্তা দিয়ে নয়, ওভারব্রিজ ব্যবহার করুন।’ লজ্জা পেয়ে ওই লোককে ফিরে যেতে দেখা যায়। হাসি জানান, যারা ভদ্র টাইপের লোক তারা অজুহাত দাঁড় করায়, পায়ে ব্যথা এ কারণে ওভারব্রিজ দিয়ে যেতে পারছে না। হাসি বলেন, ‘সকাল থেকে এ পর্যন্ত কত যে পায়ে ব্যথার লোক পেয়েছি সেটা গুনে শেষ করা যাবে না।’ পাশেই দাঁড়ানো এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘যে শিক্ষার্থীরা কয়েক দিন আগে নিরাপদ সড়কের আন্দোলন করেছে তাদের অনেককেই দেখলাম স্কুল-কলেজের ড্রেসে ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু সচেতন করার কাজটি করছি। কেউ রাস্তা দিয়ে পার হতে চাইলে তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। এর বাইরে আমাদের কিছু করণীয় নেই। যদি ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকতেন তাহলে শাস্তি দিতে পারতেন।’ সেখানে দাঁড়িয়ে হাসির সঙ্গে কথা বলার সময় দেখা যায় এক যুবক রাস্তা পেরোনোর জন্য পা ফেলেছেন। সঙ্গে সঙ্গে হাসি গিয়ে তার সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়ান। যুবকটি কারণ বুঝতে পেরে লজ্জা পেয়ে যান। তিনি তখন ওভারব্রিজের দিকে যেতে থাকেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি অনাগ্রহ দেখান।

সকাল ১১টার দিকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের পাশের ওভারব্রিজের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে দেখা গেছে কেউ রাস্তা দিয়ে পার হচ্ছে না। সবাই ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করছে। সেখানে পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবকও নেই। দুই দিন আগেই দেখা গেছে ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে লোকজন রাস্তা ব্যবহার করছে। পরে দেখা গেল পল্টন থেকে দৈনিক বংলার কাছাকাছি রাস্তার ডিভাইডারের ওপর লোহার বেড়া রয়েছে। ওভারব্রিজের নিচে কয়েকটি স্থানে এই বেড়া ভাঙা ছিল। ভাঙা অংশ দিয়েই লোকজন ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতো। গতকাল দেখা গেছে ওই ভাঙা জায়গাগুলো বাঁশ দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। ফলে লোকজন রাস্তা দিয়ে চলাচলের কোনো সুযোগ না থাকায় ওভারব্রিজ ব্যবহার করছে।

অন্যদিকে প্রেস ক্লাবের সামনের ওভারব্রিজের নিচে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানেও ডিভাইডারের ওপর বেড়া থাকলেও অনেক জায়গায় তা ভাঙা। লোকজন ঝুঁকি নিয়ে সেই ভাঙা বেড়া দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করছে।



মন্তব্য